এই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী সৌমেন চক্রবর্তী। রবীন্দ্রনাথ, আধুনিক বাংলা গান, শিল্পীর নিজের গান নিয়ে আলাপচারিতায় বাসব মৈত্র। আজ প্রথম পর্ব।
১) প্রথমেই জানতে চাইব,সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ কবে থেকে? কীভাবে? আপনার বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গীত কীভাবে মিশেছিল?
পারিবারিক পরিসরেই। বাড়িতে সঙ্গীত-নাটক ইত্যাদির চর্চা জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই উপলব্ধি করেছি। বাবা ডাক্তার হীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্ত্তী— ছিলেন নাটকের মানুষ। বড়দি হাওয়াইন গীটার বাজাতেন। ছোড়দি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। মেজদা তবলা, ছোড়দা গান-নাটক পছন্দ করত। এই পরিবেশেই বেড়ে উঠতে উঠতেই, বাবা মায়ের প্রচ্ছন্ন মদতে সঙ্গীতের প্রতি আকৃষ্ট হই।।
২) কবিপক্ষ চলছে।সাম্প্রতিক কালে রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে যে চর্চা, যে নিরীক্ষা চলছে আপনি কীভাবে তার মূল্যায়ন করেন?
বর্তমান সময়ের রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চ্চা সঠিক পথে এগোচ্ছে না। যারা গাইছেন তাদের অনেকেরই কবিগুরুর গান সম্বন্ধে কোনো শিক্ষা-বোধ বা আবেগ নেই।। আর যাই হোক গান শুনে তুলে নিয়ে গেয়ে দিলাম ব্যাপারটা এত সহজ নয়।। অনেকেই রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট করছেন— যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রবীন্দ্র অনুরাগী শ্রোতার মন পাওয়ার অযোগ্য।।
৩) সঙ্গীত ও আধ্যাত্মিকতা কীভাবে মেলান?
সঙ্গীত হচ্ছে মনপ্রাণ এক করে পরমপ্রভুর পায়ে অঞ্জলি দেওয়া। বোধ-আবেগ-গীতিরূপ, সুর আর তাল-ছন্দের সহযোগে ঈশ্বরের পায়ে মগ্নতার সঙ্গে অর্পণ করলেই পূর্ণতা।
৪) একজন সঙ্গীত শিল্পীর প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর কতটা রেওয়াজ করা উচিত বলে মনে করেন?
রেওয়াজ না করলে যেমন সঙ্গীতে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়, ঠিক তেমনি প্রতিষ্ঠা পেলেও রেওয়াজের খামতি রাখলে চলবে না। সারাজীবন রেওয়াজ করতেই হবে— এটাই সত্য।।
৫) একজন বাংলা আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে বাংলা গানের স্বর্ণযুগকে কোন কোন বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত করেন?
বাংলা গানের স্বর্ণযুগ একটা অবিস্মরণীয় সঙ্গীত সরণী। পৃথিবী যতদিন থাকবে ততদিন স্বর্ণযুগ থাকবে।। কার কথা ছেড়ে কার কথা বলব!! কন্ঠসঙ্গীত শিল্পী- গীতিকার-সুরকার… সবাই কিংবদন্তী। গীতিকার গান লিখছেন— সুরকার সুর করছেন, শিল্পীকে দেখে। কী অসাধারণ অধ্যাবসায়। সুরকারের গায়কের গায়কী সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে ওই মানের সৃষ্টি সম্ভব হতো না। সেই সময়ের রেকর্ডিং স্টুডিও আজকের মতন উন্নত ছিল না- কিন্তু পরিশ্রম আর ডেডিকেশন দিয়ে শিল্পীরা সবকিছুই অতিক্রম করেছেন। ওঁদের প্রণাম।
৬) নব্বই দশকের জীবনমুখী গান— অনেকেই এই ট্যাগ মানতে চান না।আপনি মানেন? নব্বই দশকের বাংলা গানে দৈনন্দিন জীবনের যে ছাপ মানুষ তাকে স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত করলেন না। এর কারণ কী মনে হয়?
হ্যাঁ- অবশ্যই। নব্বই দশকের শুরুতেই জীবনমুখী গানের সূচনা সুমন চট্টোপাধ্যায়ের(কবীর সুমন) হাত ধরে।।তারপর অঞ্জন দত্ত, নচিকেতা-সহ অনেকেই এসেছেন। দৈনন্দিন জীবনের কথা তাদের গানের প্রধান উৎস। কিন্তু স্বর্ণযুগের গান…যা আমরা সেই ১৯৪৫-৫০ থেকেই তারপরের ৬০-৭০ বছরের বেশি সময় ধরে শুনছি, যা এক সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছিল। যেখানে কণ্ঠসঙ্গীত শিল্পীদের সঙ্গেই গীতিকার-সুরকার ও যন্ত্রাণুষঙ্গ শিল্পীদের সমান পরিশ্রম ও ডেডিকেশন ছিল। আজকের রিয়েলিটি শোয়ে সেই সময়ের গানই বেশি শুনবেন নতুনদের কণ্ঠে।। জীবনমুখী গানের পদার্পণ একটা বিরাট সময় সাড়া ফেলেছে সমসাময়িক সঙ্গীতের ক্ষেত্রেই কিন্তু অনেকটাই ভেরিয়েশনের অভাব। কবীর সুমন এবং নচিকেতার গানে অনেক কিছুই পরীক্ষামূলকভাবে এসেছে— শ্রোতাদের মনে রঙও ধরিয়েছে কিন্তু বাকিদের ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ।
৭) আপনি বহু গুণী মানুষের কাছে গান শিখেছেন। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের ছাত্র ছিলেন।সেই অভিজ্ঞতা একটু বিশদে শুনতে চাইব? তাঁর শেখানোর ধরন, তাঁর ছাত্রদের প্রতি স্নেহ?, তাঁর সমকালীন প্রিয় শিল্পী, এবং বিশেষ কোনো ঘটনা,যা আজও আপনাকে অনুপ্রাণিত করে।
প্রথমেই শ্রদ্ধেয় সমস্ত গুরুজীর প্রতি আমার বিনম্র প্রণাম জানাই। প্রথমে শিক্ষা লাভ করি স্বর্গীয় বলাই বসু, তারপর ওঁর সুযোগ্য পুত্র সজল বসু এবং তারপর দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের কাছে। কিছুদিন কমলা বসুর কাছে শেখার সুযোগ পেয়েছি। ১৯৯৭সালে রবীন্দ্রসঙ্গীতে রাষ্ট্রীয় বৃত্তি লাভ করি।সেই সময় দ্বিজেনদার আদেশেই মেদিনীপুরে জয়ন্ত সাহা-র প্রশিক্ষণে প্রজেক্ট পূর্ণ করি।। আজও তার সঙ্গেই আমার যোগাযোগ ও শেখা চলছে।
দ্বিজেনদা অসাধারণ মানুষ ছিলেন। আমার মতন মফস্বলের এক ছাত্র ওঁর কাছে যে ভালোবাসা পেয়েছে, তা বলার নয়। প্রতি মুহুর্তে গাইড করেছেন। সবাইকেই স্নেহ করতেন তবে সময় জ্ঞান-নিয়মানুবর্তিতা-সঙ্গীতের প্রতি ডেডিকেশনকে গুরুত্ব দিতেন। আমার সময়ানুবর্তিতাকে উনি পছন্দ করতেন- বুঝতে পারতাম।। নিঁখুতভাবে গানের প্রতি ক্ষেত্র বুঝিয়ে দিতেন শেখানোর সময়। কথা-সুর-তাল ছন্দের গুরুত্ব। পরিবেশনের পদ্ধতি-গায়কী-এমনকি মাইক্রোফোনের ব্যবহার পর্যন্ত। খুব কষ্ট করেই ওঁর কাছে যেতাম— ওঁর স্নেহ ও ভালোবাসা, সব ভুলিয়ে দিত। নতুন উদ্যম পেতাম।। ওঁর সমকালীন অনেক শিল্পীই খুব প্রিয় ছিলেন। সুচিত্রা মিত্র, সলিল চৌধুরী, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়,শ্যামল মিত্র, তরুণ বন্দোপাধ্যায়, সাগর সেন, সুশীল মল্লিক, ধীরেন বসু, অধীর বাগচী প্রমুখ। দ্বিজেনদার জন্যই সঙ্গীত জগতের কিংবদন্তী সলিল চৌধুরীর সঙ্গে সময় কাটানোর সৌভাগ্য হয়েছিল।। তখন আমি শিখছি এবং সবে ওঁর সংগঠন উত্তরায়ণীতে যুক্ত হয়েছি। কয়েক মাস পরেই বার্ষিক অনুষ্ঠান রবীন্দ্র সদনে। সবাই রিহার্সাল দিচ্ছেন ওঁর নির্দেশনায় শ্যামা নৃত্যনাট্যের। বসে শুনতে শুনতে পুরোটাই আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। সম্পূর্ণ রিহার্সাল হলেই খড়্গপুর (বাড়ি) ফিরতাম— তা সে যত রাত্রিই হোক। অনুষ্ঠানের কয়েক দিন আগেই আমাদের এক বন্ধু কোনো খবর ছাড়াই কামাই করতে শুরু করল। রিহার্সালে অন্য কেউ প্রক্সি দিত। অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ খানিক আগে সে উপস্থিত হল রিহার্সালে। ওকে দ্বিজেনদা না আসার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। এবং খবর ছাড়া রিহার্সালে না আসার জন্য ভর্ৎসনা করলেন। রিহার্সাল শুরুর মুখেই উনি হঠাৎই আমাকে বললেন— “সৌমেন… বন্ধুর গান তৈরি আছে… গাইতে পারবে? আমি বললাম- হ্যাঁ। রিহার্সাল শুরু হল। আমি গাইলাম বন্ধুর গান।। যেদিন স্টেজ- রবীন্দ্র সদনে উনি ছন্দ দেবেন আর সমীরণদা হারমোনিয়ামে। আমাকে ডেকে বললেন— বন্ধুর গানেই শ্যামা নৃত্যনাট্যের উত্তরণ। বন্ধুর গান যে ছন্দ ও লয় বাঁধবে— শ্যামা সেই বৃত্তেই সম্পূর্ণতা লাভ করবে। ওঁর মতন এক পথিকৃত শিল্পীর এই কথায় চার্জড হয়ে গাইলাম— মনপ্রাণ এক করে।(উনি জানতেন ছোট পরিসরের পারফরম্যান্স এর জন্য নবীন শিল্পীর দুঃখ হতে পারে)। অনুষ্ঠান শেষে মাথায় হাত রেখে বললেন— খুব ভালো গেয়েছ। ওহ…. কী আনন্দ বলে বোঝানোর ক্ষমতা ছিল না। আজও কোয়ালিটিকেই প্রাধান্য দিই— কোয়ান্টিটিকে নয়।
৮) অনেকে বলেন রবীন্দ্রনাথের পর গানের স্রষ্টা হিসেবে কবীর সুমনের কথা।সলিল চৌধুরীকে বাদ দিয়ে দেন অনেকেই।কী ভাবে দেখেন বিষয়টা?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক মহাসাগরের নাম। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কারোরই তুলনা চলে না । মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষণ- রবীন্দ্রনাথের সাঙ্গীতিক রচনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। জীবনের জন্ম থেকে মৃত্যু- রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পেয়েছে।। বিভিন্ন পর্যায়— উপ পর্যায়, বিভিন্ন অঙ্গ-উপ অঙ্গ, শাস্ত্রীয় তাল— নিজ সৃষ্ট তাল, ছন্দের প্রকরণ ওঁর সৃষ্টিতে এসেছে। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের গান— লোকগান, বিদেশি সুর রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করেছে।। সবকিছুই নিজের সৃষ্টির প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন কিন্তু নিজস্বতার আঙ্গিকে। তা শুধুই রবীন্দ্রসঙ্গীত।। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর এতো বিস্তারিত ভাবে সঙ্গীতের আঙিনায় ঘোরাফেরা করেছেন একমাত্র সলিল চৌধুরী।। উপরোক্ত সব কিছুর সহ্গেই যোগ হয়েছিল সলিলবাবুর যন্ত্রাণুষঙ্গ নিয়ে অসাধারণ জ্ঞান ও বাজানোর দক্ষতা। অনায়াস বিচরণ ছিল বিভিন্ন যন্ত্রে। অসাধারণ বাঁশি-মাউথ অরগান; অরগান-পিয়ানো- সিন্থেসাইজার; হারমোনিয়াম ও তবলা-পারকাশন এবং সর্বোপরি সেতার বাজাতেন। He was a VERSATILE GENIUS. কবীর সুমন অসাধারণ সাঙ্গীতিক দক্ষতা ও জ্ঞানের ভাণ্ডার। সারা বিশ্বের বিভিন্ন ধরনের ক্লাসিকাল ও লোকসঙ্গীত, বিভিন্ন যন্ত্রাণুষঙ্গে, লেখার দক্ষতায় এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওঁর অনবদ্য ব্যারিটোন কণ্ঠ ও সাঙ্গীতিক কথা বলার দক্ষতা। নব্বইয়ের দশকে কবীর সুমনের হাত ধরেই জীবনমুখী গানের পদার্পণ বাংলার সঙ্গীত আঙিনায়। ওঁর কবিতার গীতিরুপ, স্বকৃত মিউজিক এক প্রচ্ছন্ন নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছে নতুন প্রজন্মের শিল্পী ও শ্রোতাদের। কিন্তু ভেরিয়েশনের অভাব পরে প্রকট হয়েছে- বেশ কিছুটাই মনোটোনাস হয়ে পড়েছে।। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যাপ্তির পর সলিল চৌধুরীই তার যথার্থ উত্তরসূরী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সলিল চৌধুরী ও কবীর সুমনদা-কে আমার অনেক শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানাই।।
৯) নিজের নতুন গান তৈরি করতে গিয়ে কোন কোন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন?
নিজের একক গান নানা কারণেই শুধুমাত্র একটিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে এখন অবধি। জানিনা আগামীতে কিছু অপেক্ষা করছে কিনা!!! বিশিষ্ট বন্ধু আশুতোষ চক্রবর্ত্তী-র কথায় আমার ছোটবেলার বন্ধু শুভময় ভট্টাচার্যের সুরারোপ ও আরেক বন্ধু গৌরব গাঙ্গুলীর সঙ্গীত আয়োজনে যা ডিজিটালি রেকর্ড ও রিলিজ হয়েছিল।। সম্পূর্ণ সহযোগিতাই পেয়েছি ।
১০) জনপ্রিয়তা না সঙ্গীতের সাধনা কোন বিষয়ে বেশি আগ্রহী এবং কেন?
জনপ্রিয়তা এমন একটা অধ্যায় যা চাইলেই পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যারা জনপ্রিয়তা পেয়েছেন বা শিখরে রয়েছেন; তাদের কোয়ালিটি খুব একটা উচ্চ পর্যায়ের নয় অথচ অনেক বেশিই কোয়ালিটির শিল্পী জনপ্রিয়তার ধারে কাছেও নেই।। আসলে অনেকটাই হয়তো কপালের ফের- লাক ফ্যাক্টর। আমার ব্যক্তিগত মতামত সঙ্গীতের সাধনাতেই মনঃসংযোগ করাই উচিত। সাধনা থাকলে সব কিছুই সইবার ক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু সাধনা না থাকলে- জনপ্রিয়তা থেকেও অনেক সময় নেগেটিভিটি তৈরি হয়। তখন সঠিক মার্গ দর্শন নাহলে— কঠিন সময় পার করা মুশকিল হয়।।
১১) নিজেকে সঙ্গীতের কোন ঘরানার শিল্পী হিসেবে দেখতে চান?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর গান আমার জীবন। আমার সবকিছুই রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে আবর্ত করেই। ঘরানার তর্কে না গিয়েই বলি- রবীন্দ্রনাথ যেহেতু বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন, ঐ ঘরানার পণ্ডিত সকলের কাছে সঙ্গীত শিক্ষা লাভ করেছিলেন; তাই আমি নিজেকেও বিষ্ণুপুর ঘরানার শিল্পী ভাবতেই ভালোবাসি।