ভারতের অন্তর্লীন অস্থিরতা!!

পৃথিবীর মানচিত্রে দূরত্ব যতই হোক, অর্থনীতির জগতে আজ কোনও অঞ্চলই বিচ্ছিন্ন নয়। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত তাই কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডের সীমায় আবদ্ধ নেই; তার প্রতিধ্বনি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে ভারতের বাজারে, সংসারে, নীতিনির্ধারণে। যুদ্ধের আগুন এখানে এসে পৌঁছচ্ছে মূল্যবৃদ্ধির ধোঁয়া হয়ে, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা হয়ে, আর এক অদৃশ্য অর্থনৈতিক চাপ হয়ে। সম্মিলিত জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির সাম্প্রতিক মূল্যায়ন এই বাস্তবতাকে কঠিন ভাষায় তুলে ধরেছে- প্রায় ২৫ লক্ষ ভারতীয় নতুন করে দারিদ্র্যের মুখে পড়তে পারেন। এটি নিছক পরিসংখ্যান নয়; এটি উন্নয়নের সেই সূক্ষ্ম রেখা, যেখানে সামান্য ধাক্কাতেই লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন পিছিয়ে যায় কয়েক ধাপ।

ভারতের অর্থনীতির ভিত যতই মজবুত বলে মনে হোক, তার এক বড় দুর্বলতা জ্বালানি নির্ভরতা। পশ্চিম এশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস আমদানির উপর নির্ভরশীলতা এই সংঘাতকে সরাসরি দেশের অর্থনীতির কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে পরিবহণ, উৎপাদন এবং শেষ পর্যন্ত খুচরো বাজারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ে, ক্রয়ক্ষমতা কমে, আর সাধারণ মানুষের জীবন আরও চাপে পড়ে।

এই চাপ শুধু ভোক্তার পকেটেই সীমাবদ্ধ নয়; উৎপাদন ও রপ্তানির উপরও তার প্রভাব গভীর। পশ্চিম এশিয়া ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার- প্রায় ১৪ শতাংশ রপ্তানি এবং ২০ শতাংশের বেশি আমদানি এই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত।

চা,বাসমতি চাল, রত্ন ও গয়না কিংবা বস্ত্রশিল্প- এই সব ক্ষেত্রেই সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, টেক্সটাইল শিল্পে উৎপাদন কমে এসেছে, এমনকী কর্মদিবসও কমাতে হয়েছে। এর অর্থ স্পষ্ট- অর্থনীতির ধাক্কা সরাসরি এসে লাগছে শ্রমবাজারে।

পরিস্থিতির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রেমিট্যান্স। উপসাগরীয় দেশগুলিতে প্রায় ৯ মিলিয়নের বেশি ভারতীয় কর্মরত, এবং তাঁদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক আয়ের একটি বড় উৎস। এই প্রবাহে কোনও বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব পড়বে গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শহুরে মধ্যবিত্ত- সব স্তরেই।

এদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিও সতর্কবার্তা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা জানিয়েছে, এই সংঘাতের জেরে এশিয়ার অর্থনীতি বিশেষভাবে জ্বালানি-ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং প্রবৃদ্ধি কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকও ইঙ্গিত দিয়েছে, ভারতের প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলেও জ্বালানি ও মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ছে।

এখানেই শেষ নয়। কৃষিক্ষেত্রে সারের সরবরাহ বিঘ্নিত হলে খাদ্য উৎপাদন কমার আশঙ্কা তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি। স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও ওষুধের কাঁচামালের দাম বাড়লে চিকিৎসা আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ এই সংকট বহুমাত্রিক- এটি অর্থনীতি,সমাজ এবং মানব উন্নয়নের প্রতিটি স্তরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন হল, ভারতের প্রস্তুতি কতটা?
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভর্তুকি বা মূল্যনিয়ন্ত্রণ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন। জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, কৃষি ও শিল্পে আত্মনির্ভরতা গড়ে তোলা- এই পথই স্থায়ী সমাধানের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যেই নীতিনির্ধারণের স্তরে আত্মনির্ভরতার উপর জোর বাড়ানোর ইঙ্গিত মিলছে।

সবশেষে, এই সংঘাত আমাদের একটি মৌলিক সত্য আবার মনে করিয়ে দেয়- গ্লোবালাইজেশনের যুগে কোনও দেশই আলাদা দ্বীপ নয়। দূরের যুদ্ধও কাছের জীবনে আঘাত হানে। ভারতের সামনে তাই এই মুহূর্তে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ- একদিকে সংকট সামলানো, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে আরও প্রস্তুত করা।

অদৃশ্য ঝড় বইছেই। প্রশ্ন একটাই- ভারত কি তার ভিত এতটাই মজবুত করতে পারবে, যাতে পরবর্তী ঝড়ে আর কাঁপতে না হয়?

Dainik Digital: