চিঠির পাতায় ভারতবর্ষ

নন্দিতা দত্ত

একজন বাবা তাঁর মেয়েকে চিঠি লিখছেন। চিঠিতে নেই শুধু বাবার স্নেহ, নেই কেবল ব্যক্তিগত কথা কিংবা জীবনের উপদেশ। সেই চিঠির প্রতিটি পাতায় ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে একটি বিশাল দেশ—তার হাজার বছরের ইতিহাস, সভ্যতার উত্থান-পতন, নানা ভাষা, নানা ধর্ম, উৎসব, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন আর মানুষের জীবনযাপনের গল্প।
বাবা মেয়েকে বলছেন না, ‘এমন হও’, ‘এটা করো’, ‘ওটা কোরো না’। বরং প্রশ্ন করতে শেখাচ্ছেন, জানতে শেখাচ্ছেন, অতীতের সঙ্গে বর্তমানকে মিলিয়ে দেখতে শেখাচ্ছেন। পৃথিবীর ইতিহাসের পথ ধরে মেয়েটি যেন একদিন নিজের দেশটাকেও নতুন করে আবিষ্কার করতে পারে—এই ছিল সেই চিঠির উদ্দেশ্য।
ব্যক্তিগত চিঠি হয়েও তাই সেই লেখা একসময় ছাপিয়ে যায় ঘরের চার দেওয়াল। বাবা-মেয়ের কথোপকথন হয়ে ওঠে একটি দেশকে জানার পাঠ। ভারতের ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও বহুত্বকে চিনতে এক কন্যার হাতে তুলে দেওয়া হয় ইতিহাসের এক দীর্ঘ দরজা—চিঠির পাতায় পাতায় যার খুলে যায় নতুন নতুন জানালা।

বিশ্ব চিঠি লেখা দিবসে ব্যাক্তিগত ভাবে একজন ভারতীয় হিসেবে মনে করি এই চিঠি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভারতআত্মাকে জানার এক সোপান।

প্রিয় ইন্দিরা,
আজ তোমাকে কোনও বিশেষ মানুষের গল্প লিখব না। আজ তোমাকে লিখব সেই পৃথিবীর গল্প, যার তুমি একটি ছোট্ট অংশ—আর যে পৃথিবীকে বুঝতে গেলে শুধু নিজের ঘর, নিজের দেশ, নিজের সময়কে জানলেই হয় না; পিছনে ফিরে তাকাতে হয় কোটি কোটি বছরের দিকে।ভাবো তো, একদিন কিছুই ছিল না—অথবা অন্তত মানুষ ছিল না, মানুষের ভাষা ছিল না, কোনও শহর ছিল না, কোনও রাজা ছিল না, কোনও ধর্মগ্রন্থ ছিল না, এমনকি ‘আমি’ আর ‘তুমি’ বলার মতো কোনও মানুষও ছিল না।তারপর পৃথিবী তৈরি হল।পৃথিবীর বুকের কোথাও একদিন প্রাণের ক্ষীণতম স্পন্দন দেখা দিল। সেই ক্ষুদ্র প্রাণ থেকে কত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে একদিন মানুষ এসে দাঁড়াল পৃথিবীর মঞ্চে!
এই ইতিহাসের দিকে তাকালে মানুষের অহংকার একটু ছোট হয়ে আসে।আমরা নিজেদের পৃথিবীর কেন্দ্র বলে ভাবি। অথচ পৃথিবী আমাদের জন্য অপেক্ষা করে ছিল না। মানুষ পৃথিবীর ইতিহাসের শুরু নয়; সে তার অনেক পরের এক অধ্যায়।
এই কথাটা মনে রেখো।#নিজেকে পৃথিবীর মালিক ভাববে না। নিজেকে পৃথিবীর দীর্ঘ ইতিহাসের একজন উত্তরসূরি ভাববে।
মানুষ যখন প্রথম পৃথিবীতে হাঁটতে শিখল, তখন তার হাতে রাজদণ্ড ছিল না, ছিল না প্রাসাদ, ছিল না আইনসভা। ছিল ক্ষুধা, ভয়, কৌতূহল এবং বেঁচে থাকার তাগিদ।সে আগুনকে চিনল।পাথরকে ব্যবহার করতে শিখল।
শিকার করতে শিখল।তারপর একদিন সে বুঝল—একসঙ্গে থাকলে বাঁচা সহজ।সেখান থেকেই হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলির একটি শুরু হল—সমাজ।
মানুষ একা শক্তিশালী ছিল না। দলবদ্ধ হয়ে সে শক্তিশালী হল।
কিন্তু দলবদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন সমস্যাও এল।কে নেতৃত্ব দেবে?কে খাবার ভাগ করবে?কার জমি?কার কাজ?কার অধিকার?কার শাস্তি?এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই মানুষের সমাজ বদলাতে লাগল।কৃষির আবিষ্কার মানুষের জীবনকে আরও গভীরভাবে বদলে দিল। মানুষ ঘুরে বেড়ানো কমিয়ে এক জায়গায় বসতি স্থাপন করল। বীজ বুনল, ফসলের অপেক্ষা করল, জমিকে নিজের বলে ভাবতে শুরু করল।
আর জমির সঙ্গে এল সম্পত্তির ধারণা।সম্পত্তির সঙ্গে এল ক্ষমতা।ক্ষমতার সঙ্গে এল শ্রেণিবিভাগ।আর সেই পথ ধরেই কোথাও কোথাও জন্ম নিল রাজতন্ত্র।একজন রাজা।তার প্রজা।
তার সেনা।তার প্রাসাদ।তার আইন।মানুষ সভ্য হল—কিন্তু সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্যও জন্ম নিল।এখানেই ইতিহাস আমাদের অস্বস্তিকর একটি শিক্ষা দেয়—সভ্যতা মানেই শুধু উন্নতি নয়। সভ্যতার ছায়াও আছে।শহর তৈরি হয়েছে, কিন্তু তার পাশে দরিদ্র মানুষের কুঁড়েঘরও তৈরি হয়েছে।রাজপ্রাসাদ উঠেছে, কিন্তু সেই প্রাসাদ তৈরির শ্রম দিয়েছে অসংখ্য নামহীন মানুষ।ধর্ম মানুষকে নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও অর্থের সন্ধান দিয়েছে; আবার ইতিহাসের কোনও কোনও সময়ে ধর্মের নামেও বিভাজন তৈরি হয়েছে।তাই ইতিহাসকে শুধু গৌরবের চোখে দেখো না।প্রশ্নের চোখেও দেখো।মানুষ কেন ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে শুরু করল?মৃত্যুর রহস্য তাকে কী ভাবিয়েছিল?
প্রকৃতির শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে তার মনে কী ভয় জন্মেছিল?
আর সেই ভয় থেকেই কি দেবতার ধারণা?নাকি মানুষের ভিতরের নৈতিক প্রশ্ন থেকেই ধর্মের জন্ম?হয়তো সবকিছুর উত্তর এক নয়।কিন্তু প্রশ্ন করাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ইতিহাস আমাদের শুধু বলে না—কী ঘটেছিল।
ইতিহাস আমাদের জিজ্ঞেস করে—কেন ঘটেছিল?তারপর মানুষ ভাষা তৈরি করল।এটি ছিল তার আর একটি বিপ্লব।
ভাষা না থাকলে মানুষ তার স্মৃতি অন্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারত না। একটি প্রজন্ম যা জানল, পরের প্রজন্মকে তা শেখানোর ক্ষমতা তৈরি হল ভাষার মাধ্যমে।একটি শব্দ শুধু একটি শব্দ নয়।তার মধ্যে থাকে একটি জাতির অভিজ্ঞতা।
একটি নদীর নামের মধ্যে থাকতে পারে হাজার বছরের স্মৃতি।
একটি লোককথার মধ্যে থাকতে পারে কোনও হারিয়ে যাওয়া সমাজের জীবনযাত্রা।একটি ভাষার মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে একটি জনগোষ্ঠীর হাসি, কান্না, যুদ্ধ, প্রেম, ক্ষুধা, স্বপ্ন।
তাই কোনও ভাষাকে ছোট কোরো না।কোনও মানুষের ভাষাকে তুচ্ছ কোরো না।কারণ একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু কিছু শব্দ হারিয়ে যাওয়া নয়; একটি মানুষের পৃথিবী দেখার একটি পদ্ধতি হারিয়ে যাওয়া।মানুষ যখন ভাষা পেল, তখন সে শুধু কথা বলল না—সে গল্প বলতে শুরু করল।তারপর এল লেখা।আর লেখা এলেই মানুষের স্মৃতি আর শুধু মানুষের মস্তিষ্কে বন্দি থাকল না।পাথরে লেখা হল।মাটির ফলকে লেখা হল।পাতায় লেখা হল।পাণ্ডুলিপিতে লেখা হল।তারপর একদিন চিঠিতে লেখা হল।এইখানেই এসে মানুষের ইতিহাস আর ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে একটি আশ্চর্য সেতু তৈরি হল।
একজন মানুষ আর একজন মানুষকে বলল—“আমি এখানে আছি। তুমি সেখানে আছ। কিন্তু এই শব্দগুলির মাধ্যমে আমরা একই মুহূর্তে একসঙ্গে থাকতে পারি।”চিঠির জন্ম যেন সেখান থেকেই।চিঠি তাই শুধু যোগাযোগ নয়।চিঠি মানুষের অনুপস্থিতিকে উপস্থিত করার প্রযুক্তি।তুমি দূরে, আমি এখানে।
কিন্তু তোমার হাতে পৌঁছনোর মুহূর্তে আমার চিন্তা তোমার ঘরে ঢুকে পড়ল।কত আশ্চর্য, তাই না?মানুষ পৃথিবী জয় করার আগে দূরত্ব জয় করতে শিখেছিল।আর সেই জয়ের একটি কোমলতম মাধ্যম ছিল চিঠি।প্রাচীন ভারতেও মানুষ এই দীর্ঘ যাত্রার অংশ ছিল।সিন্ধু সভ্যতার নগরজীবন, বৈদিক যুগের সমাজ, মহাকাব্যের কাহিনি, বৌদ্ধ ও জৈন চিন্তার উত্থান, মৌর্য ও গুপ্ত যুগের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ—সব মিলিয়ে ভারত কোনও একরৈখিক গল্প নয়।এটি বহু স্রোতের মিলন।
কেউ এসেছে, কেউ মিশেছে, কেউ বিরোধ করেছে, কেউ নতুন কিছু সৃষ্টি করেছে।একটি সভ্যতা অন্য সভ্যতার সঙ্গে কথা বলেছে।বাণিজ্য হয়েছে।ভাষা বদলেছে।চিন্তা বদলেছে।
মানুষ বদলেছে।এই কারণেই ভারতকে বোঝার জন্য শুধু তার একটি অতীতকে জানা যথেষ্ট নয়।ভারতকে বুঝতে হলে তার বহুত্বকে বুঝতে হয়।এবং এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—মানুষ কখনও একা ইতিহাস তৈরি করে না।
একটি সভ্যতা অন্য সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়।একটি ভাষা অন্য ভাষার সংস্পর্শে বদলে যায়।
একটি সংস্কৃতি অন্য সংস্কৃতির কাছ থেকে গ্রহণ করে, প্রত্যাখ্যান করে, আবার নতুন কিছু সৃষ্টি করে।তাই কোনও জাতির ইতিহাসকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখলে ইতিহাসের অর্ধেকই দেখা হয়।আজ তুমি যে পৃথিবীতে বাস করছ, সেটিও সেই দীর্ঘ যাত্রার ফল।তোমার হাতে যে বই, তার পিছনে আছে লেখার ইতিহাস।তোমার শহরের পিছনে আছে কৃষির ইতিহাস।
তোমার রাষ্ট্রের পিছনে আছে রাজনৈতিক সংগঠনের ইতিহাস।
তোমার ভাষার পিছনে আছে হাজার বছরের মানুষের মুখের উচ্চারণ।তোমার বিশ্বাসের পিছনে আছে মানুষের দীর্ঘ আত্মঅনুসন্ধান।আর তোমার হাতে যদি একটি চিঠি থাকে, তার পিছনেও আছে মানুষের হাজার বছরের একাকিত্ব জয় করার চেষ্টা।তাই একটি চিঠিকে ছোট করে দেখো না।একটি চিঠি কখনও কেবল বলে না—আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
সে আরও অনেক কিছু বলে।“আমি তোমাকে মনে রেখেছি।”
“আমি আমার সময়ের কথা তোমার কাছে রেখে যেতে চাই।”
“আমার দেখা পৃথিবী তুমি যেন আমার পরে দেখতে পাও।”
“আমি যা বুঝেছি, তুমি তা নিয়ে আবার প্রশ্ন করো।”
এই জন্যই হয়তো একটি চিঠি একটি মানুষের জীবন পেরিয়ে যেতে পারে।একজন বাবা মেয়েকে পৃথিবীর কথা লিখলেন।
মেয়েটি বড় হল।চিঠিগুলি রয়ে গেল।তারপর অন্য প্রজন্ম সেই চিঠি পড়ল।একটি ব্যক্তিগত চিঠি হয়ে গেল ইতিহাসের দলিল।
আর ইতিহাসের দলিল হয়ে গেল ভবিষ্যতের সঙ্গে কথোপকথন।
এই তো চিঠির দীর্ঘ যাত্রা।পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে প্রাণের জন্ম।
প্রাণ থেকে মানুষ।মানুষ থেকে সমাজ।সমাজ থেকে সভ্যতা।
সভ্যতা থেকে ভাষা।ভাষা থেকে লেখা।লেখা থেকে চিঠি।
আর চিঠি থেকে—এক মানুষের হৃদয় অন্য মানুষের হৃদয়ে পৌঁছনোর এক দীর্ঘ পথ।এই পথের শেষ কোথায়, তা আমরা জানি না।হয়তো কোনওদিন শেষও হবে না।কারণ মানুষ যতদিন অন্য একজন মানুষকে কিছু বলতে চাইবে, যতদিন দূরত্ব থাকবে, যতদিন স্মৃতি থাকবে, যতদিন ভালোবাসা থাকবে, যতদিন প্রশ্ন থাকবে—ততদিন চিঠিও থাকবে।
হয়তো কাগজে নয়।হয়তো অন্য কোনও মাধ্যমে।
কিন্তু তার আত্মা থাকবে।আর সেই আত্মা আমাদের মনে করিয়ে দেবে—মানুষের সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রাগুলি অনেক সময় শুরু হয়েছিল খুব ছোট্ট একটি বাক্য দিয়ে।
“প্রিয়…”তারপর একটি চিঠি।তারপর একটি মানুষ।তারপর একটি পৃথিবী।
আজ বিশ্ব চিঠি লেখা দিবস।আজকের দিনে জওহরলাল নেহেরুর কন্যা ইন্দিরাকে লেখা চিঠির চেয়ে প্রাসঙ্গিক চিঠি কী হয় পারে? ভারত শুধু দেশ নয় ভারত এক গভীর বিশ্বাসের নাম। এবং ঠিক এই জায়গাটিই নেহরুর চিঠিগুলি সাধারণ বাবা-মেয়ের ব্যক্তিগত চিঠি থেকে আলাদা । তিনি ইন্দিরাকে “ভারত সম্পর্কে জ্ঞান” দিতে চাননি শুধু; বরং নিজে প্রশ্ন করে, অনুসন্ধান করে ভারত ও পৃথিবীকে চিনতে শেখাতে চেয়েছিলেন।একটি বিষয় অবশ্যই আলাদা করে রাখা দরকার: ১৯২৮-এর Letters from a Father to His Daughter-এর ৩০টি চিঠিতে নেহরু মূলত পৃথিবী ও মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসকে ইন্দিরার সামনে খুলে ধরেছিলেন। আর পরে জেল থেকে লেখা Glimpses of World History-এর চিঠিগুলিতে সেই পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। তাই “ইন্দিরাকে ভারত চেনানো” বলতে একেবারে সরাসরি ভারত-ইতিহাসের পাঠ দেওয়া নয়; বিশ্বের ইতিহাসের ভিতর দিয়ে ভারতকে এবং ভারতকে বিশ্বের ভিতর দিয়ে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা—এটাই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ।

নেহরুর চিঠিগুলির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এখানেই—তিনি তাঁর মেয়েকে ভারত সম্পর্কে বলে যেতে চাননি; ভারতকে নিজে চিনে নেওয়ার কৌতূহলটি তার মধ্যে জাগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।এটি কোনও বাবার ধারাবাহিক উপদেশের চিঠি নয়।এখানে নেই—“এটা করো”, “ওটা কোরো না”, “এভাবে জীবন কাটাবে।”নেই পরীক্ষার প্রস্তুতির মতো ইতিহাসের তারিখ।নেই বাবার কর্তৃত্বের স্বর।আছে একটি শিশুর কৌতূহলকে সম্মান করার চেষ্টা।নেহরু জানতেন, একটি শিশুকে যদি বলা হয়—“এটাই সত্য”, তবে সে হয়তো সেটি মনে রাখবে। কিন্তু তাকে যদি বলা হয়—“এসো, আমরা একসঙ্গে খুঁজে দেখি সত্যিটা কোথায়”, তাহলে তার ভিতরে তৈরি হয় অনুসন্ধানের অভ্যাস।তাই তিনি ইন্দিরাকে পৃথিবীর একেবারে শুরুতে নিয়ে যান।পৃথিবী কীভাবে তৈরি হল?প্রাণের শুরু কীভাবে?মানুষ কোথা থেকে এল?
মানুষ কেন দলবদ্ধ হল?কীভাবে সমাজ তৈরি হল?
কেন কৃষির আবিষ্কার মানুষের জীবন বদলে দিল?
কেন সম্পত্তির ধারণা এল?কীভাবে রাজা ও রাষ্ট্রের জন্ম হল?
মানুষ কেন ধর্মের আশ্রয় নিল?ভাষা কীভাবে তৈরি হল?
সভ্যতা কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে মিশল?
এই প্রশ্নগুলি দেখতে ইতিহাসের প্রশ্ন মনে হলেও আসলে এগুলি মানুষের নিজের পরিচয়ের প্রশ্ন।
“আমি কে?”—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আগে জানতে হয়, “আমরা কোথা থেকে এলাম?”
নেহরু সেই পথটাই ইন্দিরার সামনে খুলে দিয়েছিলেন।
তিনি ইতিহাসকে কোনও সমাপ্ত গল্প হিসেবে দেননি।
বরং ইতিহাসকে দিয়েছেন একটি চলমান অনুসন্ধান হিসেবে।
এখানেই তাঁর চিঠির শিক্ষাদর্শ।
তিনি ইন্দিরাকে বলেননি—“ভারত মহান, তাই ভারতকে ভালোবাসো।”তিনি যেন তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন আরও কঠিন একটি প্রশ্নের দিকে—“ভারতকে ভালোবাসার আগে ভারতকে কি আমরা সত্যিই চিনি?”
একটি দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি হয় শুধু তার গৌরবের গল্প শুনে নয়। তার জটিলতা, বৈপরীত্য, ভুল, সাফল্য, সংঘাত, মিলন—সবকিছুকে বুঝতে শেখার মধ্য দিয়ে।
তাই ভারতকে চিনতে হলে শুধু রাজাদের জানতে হবে না।
জানতে হবে কৃষককে।শ্রমজীবী মানুষকে।নদীকে।শহরকে।
গ্রামকে।ভাষাকে।লোককথাকে।ধর্মকে।বাণিজ্যকে।বিজ্ঞানকে।
শিল্পকে।সংঘাতকে।মানুষের স্বপ্ন ও ভয়কে।নেহরুর কাছে ইতিহাস ছিল মানুষের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার একটি নদী। সেই নদীর একটি ধারার নাম ভারত।কিন্তু নদীকে বোঝা যায় না শুধু নিজের ঘাটে দাঁড়িয়ে।তার উৎসও দেখতে হয়।
তার অন্য শাখাগুলিও দেখতে হয়।কোথায় অন্য নদীর সঙ্গে তার মিলন হয়েছে, কোথায় তার গতিপথ বদলেছে, কোথায় সে শুকিয়েছে, কোথায় আবার নতুন স্রোত পেয়েছে—সব জানতে হয়।এই কারণেই নেহরু ইন্দিরাকে শুধু ভারত দেখাননি; ভারতকে পৃথিবীর মানচিত্রের মধ্যে বসিয়ে দেখেছিলেন।এটি আসলে একটি গভীর রাজনৈতিক ও মানবিক শিক্ষা।
তুমি যে ভারতকে দেখছ, সে একা তৈরি হয়নি।তার মধ্যে বহু শতাব্দীর মানুষের চলাচল আছে।বিভিন্ন ভাষার সুর আছে।
বিভিন্ন ধর্মের চিন্তা আছে।বিভিন্ন সংস্কৃতির বিনিময় আছে।
সংঘাত আছে, আবার সহাবস্থানও আছে।গ্রহণ আছে, প্রত্যাখ্যান আছে, নতুন করে সৃষ্টি করার ক্ষমতাও আছে।
অর্থাৎ ভারত কোনও বন্ধ বাক্স নয়।ভারত একটি চলমান অভিজ্ঞতা।আর ইন্দিরার জন্য লেখা চিঠিগুলির মধ্যে নেহরু সম্ভবত সবচেয়ে মূল্যবান যে জিনিসটি রেখে গিয়েছিলেন, তা কোনও নির্দিষ্ট তথ্য নয়—একটি দৃষ্টিভঙ্গি।কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়।কীভাবে কোনও বিষয়কে একমাত্রিকভাবে না দেখে তার বহু দিক দেখতে হয়।কীভাবে ইতিহাসকে শুধু গৌরবের গল্প না বানিয়ে মানুষের অভিজ্ঞতা হিসেবে পড়তে হয়।
কীভাবে নিজের দেশকে ভালোবেসেও তার সমালোচনা করা যায়।কীভাবে অন্য সভ্যতাকে জানতে গিয়ে নিজের সভ্যতাকেও নতুন করে আবিষ্কার করা যায়।এখানে বাবা তাঁর মেয়ের শিক্ষক নন শুধু।তিনি যেন তাঁর সঙ্গে হাঁটা একজন সহযাত্রী।
একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেন।তারপর আরেকটি দরজা খুলে দেন।
তারপর বলেন—এসো, এবার তুমি নিজেই দেখো।
এই “নিজে দেখার” স্বাধীনতাটাই হয়তো চিঠিগুলির সবচেয়ে বড় উপহার।কারণ জ্ঞান চাপিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু কৌতূহল চাপিয়ে দেওয়া যায় না।কৌতূহল জাগাতে হয়।
আর নেহরুর চিঠির ভাষা সেই কাজটাই করেছিল।
তাঁর মেয়েকে তিনি শুধু একটি দেশের ইতিহাসের উত্তরাধিকারী করতে চাননি; তিনি তাকে এমন একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যে নিজের চোখে পৃথিবীকে দেখবে, প্রশ্ন করবে, বুঝবে এবং তারপর নিজের সিদ্ধান্ত নেবে।
এই কারণেই সেই চিঠিগুলি আজও প্রাসঙ্গিক।কারণ আজ আমরা তথ্যের অভাবে ভুগছি না।আমাদের চারপাশে তথ্যের বিস্ফোরণ।কিন্তু তথ্যের চেয়েও দুর্লভ হয়ে উঠছে প্রশ্ন করার ক্ষমতা।নেহরুর চিঠি তাই আজ পড়লে মনে হয়, তিনি যেন ইন্দিরাকে বলছেন—আমি তোমাকে উত্তর দিয়ে যেতে চাই না।
আমি চাই, তুমি প্রশ্ন করতে শেখো।”আর হয়তো এই কারণেই একটি বাবার ব্যক্তিগত চিঠি একদিন ব্যক্তিগত সীমানা পেরিয়ে একটি প্রজন্মের পাঠ হয়ে উঠেছিল।কারণ তিনি মেয়েকে শুধু বলেননি—এই হল ভারত।তিনি যেন বলেছিলেন—এসো, আমরা ভারতকে খুঁজে দেখি।আর একটি দেশকে চিনতে শুরু করার জন্য এর চেয়ে বড় আহ্বান আর কী হতে পারে?

Sumit Chakraborty: