ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে

ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।সোমবার দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে আয়োজিত ‘নারী শক্তি বন্দন সম্মেলন’-এ ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন,” ভারত একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে। আর এই সিদ্ধান্তটি নারী ক্ষমতায়নের প্রতি উৎসর্গীকৃত। তিনি আরও বলেছেন, ভারতের সংসদ একটি নতুন ইতিহাস রচনার দ্বারপ্রান্তে, যা অতীত ও ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে। প্রতিটি রাজ্যের বিধানসভা থেকে শুরু করে দেশের সংসদ পর্যন্ত, কয়েক দশকের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে চলতি মাসের (এপ্রিল) ১৬, ৭ এবং ১৮ তারিখ। ২০২৩ সালে নবনির্মিত সংসদ ভবনে সরকার নারীশক্তি বন্দন অধিনিয়মের প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে এটি সময়মতো বাস্তবায়ন করা যায়। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, এই পদক্ষেপ কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং দেশের নারীশক্তির সম্মান ও ক্ষমতায়নের এক নতুন অধ্যায়।” দীর্ঘ চার দশকের টালবাহানার পর এই বিলের বাস্তবায়নকে মোদি সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, “ভারত আজ ঐক্যবদ্ধ। ২০২৯ সালের মধ্যে এই বিল অবশ্যই কার্যকর করতে হবে।” তার মতে, নীতি নির্ধারণে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। প্রধানমন্ত্রী মোদি নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য সুযোগ প্রসারিত করতে সকলকে একত্রিত হওয়ার আহবান জানিয়েছেন।

এদিকে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন,এই বিলকে দ্রুত আইনে পরিণত করতে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সংসদের একটি বিশেষ অধিবেশন ডাকতে চলছে কেন্দ্র।সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুও এই বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে বিরোধীদের দাবি, নির্বাচনি বৈতরণী পার হতেই মোদি সরকার তড়িঘড়ি এই পদক্ষেপ নিচ্ছে। কেননা, চলতি মাসের ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ু, এই দুই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হবে। তার আগেই কেন্দ্রীয় সরকার সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে বিল পাস করতে চাইছে। ফলে নারী সংরক্ষণ বিলকে কেন্দ্র করে বর্তমানে নতুন করে সরগরম হয়ে উঠেছে জাতীয় রাজনীতি। ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনেই মহিলা আসন সংরক্ষণ আইন কার্যকর করার উদ্দেশ্যে আনা এই বিলের পোশাকি নাম হচ্ছে ‘নারীশক্তি বন্দন অধিনিয়ম’। তার আগে দিল্লিতে সোমবার নারীশক্তি বন্দন সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভাষণ রাখতে গিয়ে এই পদক্ষেপকে একুশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলে দাবি করে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। নারীদের শক্তি ও সম্মানের প্রতি উৎসর্গীকৃত এই বিল পাস করে সংসদ দেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় রচনার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে, মহিলা সংরক্ষণ সংক্রান্ত সংশোধনী বিল পাসের উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যে সংসদের বাজেট অধিবেশনের মেয়াদ বাড়িয়ে আগামী ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিল তিন দিনের বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়েছে। সেই অধিবেশনে মোদি সরকার এই বিল পাস করাবে। উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, লোকসভার প্রথম মহিলা স্পিকার তথা বিহারের কংগ্রেস নেত্রী মীরা কুমারও সোমবার হাজির ছিলেন দিল্লির নারীশক্তি বন্দন সম্মেলনে। সরকারি সূত্রের খবর, ২০২৩-এর সেপ্টেম্বরে মোদি সরকার যে ‘নারীশক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ বা সংবিধানের ১০৬তম সংশোধনী আইন জারি করেছিল, তাতে কিছু সংশোধন করে আগামী লোকসভা নির্বাচনেই এক-তৃতীয়াংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করতে চলেছে। ২০২৩-এর আইন অনুযায়ী চললে, মহিলা সংরক্ষণ ২০৩৪-এর লোকসভা ভোটে বাস্তবায়িত হত। কিন্তু নতুন সংশোধনী বিল অনুযায়ী, ২০২৭-এর জনগণনার অপেক্ষা না করেই ২০১১-র জনগণনার ভিত্তিতে লোকসভার আসন সংখ্যা বাড়ানো ও পুনর্বিন্যাস করা হবে। এতে লোকসভার মোট আসন সংখ্যা ও প্রতিটি রাজ্যের লোকসভা আসন সংখ্যা ৫০ শতাংশ করে বাড়বে। ফলে ৫৪৩ আসনের লোকসভা বেড়ে লোকসভার সাংসদ সংখ্যা ৮১৬-তে পৌঁছবে। তার তিন ভাগের এক ভাগ, অর্থাৎ ২৭২টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। ২০২৯ সালের লোকসভা ভোট থেকেই চালু হবে নতুন ব্যবস্থা।

কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, ওই আইনে সংশোধন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করানোর জন্য এই মুহুর্তে সরকারের কাছে যথেষ্ট সাংসদ নেই।তাই বিরোধী শিবিরের সমর্থনও চেয়েছে মোদি সরকার। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, মহিলা সংরক্ষণকে সমর্থন করলেও মোদি সরকারের এই আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে বিরোধী শিবিরের আপত্তি রয়েছে। তার উপরে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ুর ভোটের মুখে আদর্শ আচরণবিধি জারি থাকা সত্ত্বেও, বিজেপি মহিলা সংরক্ষণ নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে বলে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন। এই পরিস্থিতিতে এখন বিরোধীরাও চাপে পড়ে গিয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অভিমত। শেষ পর্যন্ত কি হয়?এখন সেটাই দেখার।

Dainik Digital: