দহনদগ্ধ দেশ, তাপপ্রবাহে পুড়ছে মানুষ!!

দৈনিক সংবাদ অনলাইন প্রতিনিধি:-চৈত্র শেষে বৈশাখের শুরুতেই আকাশ থেকে আগুন ঝরছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। কার্যত গ্রীষ্মের শুরুতেই মানুষের দফারফা অবস্থা। গ্রীষ্ম এলে বাংলার ভাষা নিজেই যেন বদলে যায় – শব্দে শব্দে ঘাম ঝরে, বাক্যে বাক্যে তাপের ঢেউ লাগে। এ বছর সেই গরম যেন আর পাঁচটা বছরের মতো নয়; যেন সূর্য নিজের দায়িত্ব একটু বেশিই গুরুত্ব দিয়ে পালন করছে। দেশের রাজধানী দিল্লি মাঝ এপ্রিলেই ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়ে ফেলেছে – এ এক প্রখরতার নতুন অভিধান, যেখানে ‘গরম’ শব্দটা যথেষ্ট নয়, বরং ‘দহন’ই বেশি মানানসই। শুধু একা দিল্লি নয়, গোটা উত্তর ভারতসহ পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, এমনকী উত্তর-পূর্বাঞ্চল জুড়ে এখন প্রকৃতির গনগনে আগুন।

গরম নিয়ে বাঙালির সাহিত্যিকদের স্মৃতি কম নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “ঘন ঘোর বরিষা”-র মতোই গ্রীষ্মেরও নিজস্ব রূপ আছে -কিন্তু সেই রূপে যেমন আছে কাঁঠালের গন্ধ, তেমনই আছে পুড়ে যাওয়া মাটির দীর্ঘশ্বাস। আজকের এই প্রখর গরমে সেই দীর্ঘশ্বাস যেন আরও স্পষ্ট শোনা যায়। রাস্তাঘাট ফাঁকা, গাছের পাতা নিস্তেজ, আর মানুষ যেন এক অদৃশ্য আগুনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত বোঝাপড়া করছে।

দেশের আবহাওয়া দপ্তর সতর্ক করছে – এ শুধু এক দিনের অস্বস্তি নয়, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের ইঙ্গিত। উত্তর-পশ্চিম থেকে মধ্য ও পূর্ব ভারত – সবখানেই ‘লু’-এর দাপট বাড়ছে।

রাজস্থানের মরুভূমি থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের আর্দ্র উপত্যকা – সব জায়গাতেই গরম যেন এক নতুন ভাষায় কথা বলছে। এই ভাষা অস্বস্তির, ক্লান্তির, কখনও বা বিপদের। ত্রিপুরার আবহাওয়া দপ্তর আগামী দুই-তিন দিনের জন্য কোনো আশার কথাও শোনাতে পারেনি। বরং আজ দিনের যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সেটাই আসন্ন দিনগুলোর জন্য অশনি বার্তা বয়ে আনতে চলেছে – তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। বাতাসে আর্দ্রতা ৯৭ শতাংশ। কিন্তু প্রশ্ন হল- এই গরম কি শুধুই প্রকৃতির খেয়াল? নাকি এর পেছনে আমাদের নিজেদেরই তৈরি করা এক দীর্ঘ ছায়া আছে? নগরায়ণ, বৃক্ষনিধন, দূষণ – সব মিলিয়ে আমরা যেন নিজেরাই এক ‘তাপের ফাঁদ’ তৈরি করেছি। শহরগুলো কংক্রিটের চাদরে ঢেকে গিয়ে ‘হিট আইল্যান্ড’-এ পরিণত হয়েছে, যেখানে রাতের অন্ধকারও তাপ কমাতে পারে না। প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় না সে কেবল প্রতিক্রিয়া জানায়। আর সেই প্রতিক্রিয়ার ভাষাই আজকের এই দহন।

তবু গরমের মধ্যেও বিপন্ন মানুষ তার রস খুঁজে নেয়। ঠান্ডা তালের শরবত, কাঁচা আমের টক ডাল, কিংবা গ্রামের পুকুরে ঝাঁপ এই সবই যেন গরমের বিরুদ্ধে ছোট ছোট বিদ্রোহ। সাহিত্যেও সেই বিদ্রোহের ছাপ আছে – প্রখর রোদের মধ্যেও মানুষ খুঁজে নেয় ছায়া, ক্লান্তির মধ্যেও খুঁজে নেয় গল্প।

কিন্তু রসিকতা আর রোমান্টিকতার আড়ালে বাস্তবটা কঠিন। তাপপ্রবাহ এখন শুধু অস্বস্তি নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। হিটস্ট্রোক, জলশূন্যতা, বিদ্যুৎ সংকট সব মিলিয়ে গরম এখন এক নীরব সংকট। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষদের জন্য, যাদের রোজগার থেমে থাকে না রোদের তাপে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি – একদিকে তাৎক্ষণিক সতর্কতা ও সুরক্ষা, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পরিকল্পনা। গাছ লাগানো, শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ, জল সংরক্ষণ – এসব আর বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন। শেষমেশ, গ্রীষ্মকে আমরা থামাতে পারব না, কিন্তু তাকে বুঝতে পারি। সাহিত্যের ভাষায় তাকে রূপ দিতে পারি, বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে মোকাবিলা করতে পারি। কারণ গরম যতই প্রখর হোক, মানুষের অভিযোজনের ক্ষমতা তার চেয়েও বেশি- এই বিশ্বাসেই হয়তো আমরা প্রতিটি দহন পেরিয়ে আবার বর্ষার প্রতীক্ষায় থাকি।

Dainik Digital: