মাথা ও গলার ক্যানসার নিয়ে লিখেছেন কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ইএনটি হেড অ্যান্ড নেক সার্জন ডাঃ মনোজেন্দ্র নারায়ণ ভট্টাচার্য।
মাথা ও গলার ক্যানসার আসলে কী?
মাথা ও গলার ক্যানসার বলতে উপরের শ্বাসনালী ও খাদ্যনালীর অংশে সৃষ্ট বিভিন্ন ধরনের ম্যালিগন্যান্সিকে বোঝায়। এর মধ্যে রয়েছে—
মুখগহ্বরের ক্যানসার (জিহ্বা, মাড়ি, গালের ভেতরের অংশ, মুখের তলদেশ)
ওরোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যানসার
হাইপোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যানসার
ল্যারিঞ্জিয়াল ক্যানসার
নাসারন্ধ্র, প্যারানাসাল সাইনাস ও লালাগ্রন্থির ম্যালিগন্যান্সি
এদের মধ্যে মুখগহ্বরের ক্যানসার ভারতে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, যা সাধারণত তামাক ও সুপারি ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত।
প্যাথলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে, স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যা মুখ ও গলার আবরণী কোষ থেকে উৎপন্ন হয়। এছাড়াও অ্যাডেনোকার্সিনোমা (সাধারণত লালাগ্রন্থিতে), লিম্ফোমা এবং বিরল সারকোমাও দেখা যায়।
থাইরয়েড ক্যানসারও কি সমানতালে বাড়ছে?
থাইরয়েড গ্রন্থির ক্যানসারও মাথা ও গলার অনকোলজির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর শনাক্তকরণ ক্রমশ বাড়ছে। এর পেছনে রয়েছে—
পূর্ববর্তী রেডিয়েশন এক্সপোজার
জিনগত প্রবণতা
আয়োডিনের ভারসাম্যহীনতা
উল্লেখযোগ্যভাবে, শুধুমাত্র টিউমারের আকার সবসময় এর তীব্রতা নির্ধারণ করে না। ছোট নডিউলগুলিকেও সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন হতে পারে।
ভারতে কেন এত বেশি?
বিশ্বব্যাপী মাথা ও গলার ক্যানসারের অন্যতম সর্বোচ্চ বোঝা বহন করছে ভারত। দেশের মোট ক্যানসারের প্রায় ৩০–৪০ শতাংশ এই শ্রেণিভুক্ত। পুরুষদের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ এবং মহিলাদের মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশ ক্যানসার এই ধরনের। বিশেষত উত্তর-পূর্ব ভারতে পুরুষদের মধ্যে এই ক্যানসারের হার দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ, যা জীবনযাত্রা ও অভ্যাসের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ককে প্রতিফলিত করে।
প্রধান ঝুঁকির কারণ?
এই রোগের অধিকাংশ ঝুঁকির কারণই প্রতিরোধযোগ্য। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
ধূমপান
ধোঁয়াবিহীন তামাক (গুটখা, পান-সুপারি)
অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন
মুখের অপরিচ্ছন্নতা
পুষ্টির ঘাটতি
HPV (Human Papillomavirus) সংক্রমণ
মুখের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালা বা আঘাত
সঠিকভাবে না বসা ডেনচার এবং ধারালো বা ভাঙা দাঁতের অংশ মুখের ভেতরের আবরণে বারবার আঘাত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই স্থায়ী আঘাত ক্যানসারজনিত পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।
প্রাথমিক শনাক্তকরণ কেন জরুরি?
মাথা ও গলার ক্যানসারে দ্রুত রোগনির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর বিস্তারিত চিকিৎসা-ইতিহাস—যেমন তামাক বা অ্যালকোহল ব্যবহারের অভ্যাস, খাদ্যাভ্যাস ও পারিবারিক ইতিহাস—উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
এরপর করা হয় বিভিন্ন পরীক্ষা—
গুরুত্বপূর্ণ রোগনির্ণয় পদ্ধতি কী?
এন্ডোস্কোপি: ক্যামেরার সাহায্যে গলা ও স্বরযন্ত্র পরীক্ষা
CT স্ক্যান: রোগ কতটা ছড়িয়েছে তা মূল্যায়ন
FNAC (Fine Needle Aspiration Cytology): গলা বা থাইরয়েডের গাঁট বা ফোলাভাব পরীক্ষা
এই পরীক্ষাগুলি দ্রুত ও নির্ভুল রোগনির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
চিকিৎসা কীভাবে হয়?
মাথা ও গলার ক্যানসারের চিকিৎসা নির্ভর করে ক্যানসারের ধরন, অবস্থান ও পর্যায়ের ওপর। চিকিৎসায় প্রায়ই একাধিক পদ্ধতির সমন্বয় প্রয়োজন হয়।
প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি
সার্জারি
রেডিয়েশন থেরাপি
কেমোথেরাপি
বিশেষত মুখগহ্বরের ক্যানসারে টিউমার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণই প্রধান চিকিৎসা। যখন ক্যানসার গলার লিম্ফ নোডে ছড়িয়ে পড়ে, তখন আক্রান্ত নোড অপসারণের জন্য “নেক ডিসেকশন” অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপির মতো আধুনিক চিকিৎসা কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ভালো ফল দিচ্ছে।
থাইরয়েড ক্যানসারের চিকিৎসা কীভাবে সম্ভব?
থাইরয়েড ক্যানসারের চিকিৎসায় সাধারণত থাইরয়েডেক্টমি (থাইরয়েড গ্রন্থি অপসারণের অস্ত্রোপচার) করা হয়। কখনও কখনও এর পরে রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন থেরাপি ও আজীবন হরমোন রিপ্লেসমেন্টের প্রয়োজন হতে পারে। যথাযথ চিকিৎসা হলে থাইরয়েড ক্যানসারের রোগীদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সাধারণত অত্যন্ত ভালো।
উন্নত চিকিৎসা এখন আরও সহজলভ্য কীভাবে?
Peerless Hospital-এর মতো স্বাস্থ্যসেবাপ্রতিষ্ঠানগুলি মুখগহ্বর ও থাইরয়েড ক্যানসার-সহ মাথা ও গলার ক্যানসারের জন্য সমন্বিত পরিষেবা গড়ে তুলেছে। উন্নত রোগনির্ণয় ব্যবস্থা, FNAC ও CT ইমেজিং, জটিল রিসেকশন ও নেক ডিসেকশনের মতো সার্জিক্যাল দক্ষতা এবং সমন্বিত অনকোলজি পরিষেবার মাধ্যমে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের রোগীদের তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী খরচে উচ্চমানের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বাঁচার সম্ভাবনা কতটা?
মাথা ও গলার ক্যানসারের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করে রোগ কোন পর্যায়ে শনাক্ত হয়েছে তার ওপর।
প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে নিরাময়ের হার ৭০–৮০ শতাংশেরও বেশি হতে পারে।
কিন্তু ভারতে বহু রোগী উন্নত পর্যায়ে চিকিৎসার জন্য আসেন, ফলে ফলাফল খারাপ হয়।
বিপরীতে, থাইরয়েড ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে সাধারণত অত্যন্ত উচ্চ বেঁচে থাকার হার দেখা যায়।
এই রোগ প্রতিরোধের জন্য কী কী করণীয়?
তামাক ও সুপারি ব্যবহার বন্ধ করুন
মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন
ভাঙা বা ধারালো দাঁতের সমস্যা দ্রুত ঠিক করুন
সঠিকভাবে না বসা ডেনচার বদলান
দীর্ঘদিনের মুখের ঘা, গলায় গাঁট বা দীর্ঘস্থায়ী স্বরভঙ্গ হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
মাথা ও গলার ক্যানসার অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে প্রায়ই নিরাময়যোগ্য। এই নীরব মহামারী মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ—স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার প্রসার, দ্রুত রোগনির্ণয় নিশ্চিত করা এবং বিশেষত উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে সমন্বিত ও সাশ্রয়ী ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো।
যোগাযোগ : ৯৯০৩৩৬৪৫৬২