দীপ্র ভট্টাচার্য
আজকের গৃহবধূরা প্রতিদিন সকালে রান্নার ফাঁকে গুগলে বলেন—“আজকের আবহাওয়া কেমন?”, “পেঁয়াজের দাম কত?”, কিংবা “ছেলে কোন টিউশনে যাবে?” তাদের মোবাইল ফোনটি ‘স্মার্ট’, কিন্তু তারা জানেন না, তাদের এই দৈনন্দিন প্রশ্নোত্তর কোথাও না কোথাও রেকর্ড হচ্ছে। তাদের কণ্ঠস্বর, উচ্চারণ, ভাষার ধরন, এমনকি তাদের সার্চের ধরন—সবই কোথাও জমা হচ্ছে। কার কাছে, কী কারণে, তাদের কোনও ধারণাই নেই। জানেন না, ওনাদেরই মতো আরও কোটি কোটি ভারতীয়, যারা নিজেদের অজান্তেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নামক বিশাল যন্ত্রটিকে চালানোর জন্য প্রতিনিয়ত ‘তথ্য’ জোগান দিচ্ছেন। অথচ সেই তথ্যের ফসল আমরা নয়, ভোগ করছে অন্য কেউ—বিশ্ববাজারের বড় টেক কোম্পানিগুলি।
তথ্য এখন চালের মতোই জরুরি
“ডেটা ইজ দ্য নিউ অয়েল”—এই উক্তি প্রযুক্তি দুনিয়ায় বহুদিন ধরেই ঘুরছে। কিন্তু ভারতের প্রেক্ষিতে হয়তো আরও বেশি প্রাসঙ্গিক এক নতুন উপমা—“ডেটা ইজ দ্য নিউ রাইস।” চাল যেমন আমাদের খাদ্যাভ্যাসের মেরুদণ্ড, তেমনি তথ্য হয়ে উঠেছে ডিজিটাল জীবনের মূলে। আজকের ভারতে মোবাইল ফোন, স্মার্ট টিভি, ডিজিটাল পেমেন্ট, আধার, কোউইন, হেলথ আইডি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নাগরিক তথ্য প্রবাহ অবিরাম চলছে।
বর্তমানে প্রতি সেকেন্ডে বিশ্বজুড়ে ৭০০০০-এরও বেশি ইন্টারনেট সার্চ হচ্ছে, ভারতে এখন ৮০ কোটিরও বেশি সক্রিয় স্মার্টফোন ব্যবহারকারী রয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল পরিচয়পত্রের মতো প্রকল্পগুলি, যেগুলি প্রত্যেকেই একটি করে তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম। এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থাগুলোর জন্য এক বিপুল ডেটার উৎস হয়ে উঠেছে। তারা এই তথ্য বিশ্লেষণ করে বুঝতে শিখছে আমাদের ভাষা, মুখভঙ্গি, আচরণ এবং পছন্দের ধরন। এর ফলে তৈরি হচ্ছে এমন এআই, যা কেবল আমাদের অভ্যাস নয়, ভবিষ্যতে বাজারের গতিপথ ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলিকেও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তথ্য-উৎপাদক দেশ। প্রতি সেকেন্ডে এই যে লক্ষাধিক সার্চ হচ্ছে, ৮০ কোটিরও বেশি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর তৈরি করা এই তথ্যভাণ্ডার আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলির জন্য এক অমূল্য সম্পদ। কারণ ভারতীয় তথ্যের মধ্যে রয়েছে ভাষার বৈচিত্র্য, উচ্চারণের পার্থক্য, স্থানভেদে আচরণের ভিন্নতা—যা যেকোনও ভাষাভিত্তিক বা আচরণগত এআই তৈরিতে অপরিহার্য উপাদান।
অজান্তেই তথ্যদান, নাগরিক না তথ্যশ্রমিক?
বিনামূল্যের মোবাইল অ্যাপ বা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে আমরা যতটা স্বাধীন ভাবি নিজেকে, বাস্তবে ততটাই অসচেতন থাকি তথ্য প্রদানের বিষয়ে। হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, গুগলের মতো অ্যাপ প্রতিনিয়ত আমাদের অবস্থান, সার্চ হিস্টরি, কণ্ঠস্বর, এমনকি মুখাবয়ব পর্যন্ত সংরক্ষণ করে। এই সমস্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এআই শেখে কীভাবে বাংলা বলা হয়, কী ধরনের গল্প মানুষ পড়ে, কোন বিষয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি। এর মাধ্যমে তৈরি হয় এমন একটি ডেটা-চিত্র, যা আমরা নিজেরাই জানি না। অথচ এই ছবির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় এমন কনটেন্ট, এমন বিজ্ঞাপন, এমনকি এমন ‘চয়েস’, যা আমাদের পছন্দ বলেই ধরে নেওয়া হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল—এই তথ্য সংগ্রহ প্রায় কোনও স্বচ্ছ সম্মতির ভিত্তিতে হয় না। শর্তাবলীর দীর্ঘ তালিকা পড়ার সময় বা অ্যাপ ইনস্টল করার মুহূর্তে যে ‘আই এগ্রি’ বাটনে ক্লিক করি, তা কি সত্যিই যথাযথ সচেতন সম্মতির প্রতীক? এই প্রশ্ন আজকের ডিজিটাল নাগরিক সমাজে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আইনের অবস্থান: আমরা কতটা সুরক্ষিত?
২০২৩ সালে ভারতে পাস হয় বহু প্রতীক্ষিত ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট। এই আইন অনুযায়ী, নাগরিককে ‘ডেটা প্রিন্সিপাল’ বা তথ্যের মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তথ্য সংগ্রহকারীদের ‘ডেটা ফিডিউশিয়ারি’ বলা হয়েছে, যাঁদের উপর দায়িত্ব থাকবে নাগরিকের অনুমতি নিয়ে এবং নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে তথ্য ব্যবহার করার। আইনে বলা হয়েছে, কোনও সংস্থা যদি তথ্য অপব্যবহার করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
তবে এই আইনের মধ্যেই রয়েছে কিছু গুরুতর ফাঁকফোকর। যেমন, সরকারের অধীনস্থ সংস্থাগুলি—বিশেষত গোয়েন্দা বিভাগ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—তাদের কার্যক্রমে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ, সরকার চাইলে কোনও ব্যক্তির তথ্য অনুমতি ছাড়াই সংগ্রহ করতে পারে। এই ব্যতিক্রম আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বলে মনে করছেন ডিজিটাল অধিকারকর্মীরা।
এছাড়া, এই আইন অনুযায়ী ‘ডেটা প্রোটেকশন বোর্ড’ নামে একটি রেগুলেটরি সংস্থার গঠনের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সেই সংস্থাটি পুরোপুরি স্বায়ত্তশাসিত নয়। সরকারেরই নিয়োগকৃত সদস্যদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে এই সংস্থা, যা ‘স্বাধীন নজরদারি’ বা তথ্য রক্ষার বাস্তব প্রতিশ্রুতি কতটা রাখবে, সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। (তথ্যসূত্র: The Hindu, “DPDP Bill Passed Amid Privacy Concerns”, Aug 2023)
নাগরিক ডেটার আইনি সুরক্ষায় কি পদক্ষেপ দরকার?
ভারতে নাগরিকদের ডেটা আইনি ভাবে সুরক্ষিত করতে হলে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট, ২০২৩ এই ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও, এটিকে আরও কার্যকর ও সুসংহত করতে কিছু মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমত, আইনের বিভিন্ন অস্পষ্ট ধারা—বিশেষ করে “বৈধ ব্যবহার” এবং সরকারি সংস্থার জন্য দেওয়া ছাড়—আরও নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ করা উচিত, যাতে নাগরিকের গোপনীয়তা অযথা ক্ষুণ্ণ না হয়। একইসঙ্গে, আইনটিকে আন্তর্জাতিক মান, যেমন জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশন-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা দরকার, যাতে বিশ্বস্তরে ডেটা সুরক্ষার মান বজায় থাকে।
দ্বিতীয়ত, একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং ক্ষমতাসম্পন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য, যা ডেটা সুরক্ষা আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারে। এই সংস্থার কাজ হবে দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি, ডেটা লঙ্ঘনের তদন্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি প্রদান। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে এই সংস্থাকে কাজ করতে দিতে হবে, তবেই নাগরিকদের আস্থা তৈরি হবে।
তৃতীয়ত, বেসরকারি সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর উপর কঠোর দায়িত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। তাদের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা নীতি বাধ্যতামূলক করতে হবে, অর্থাৎ শুরু থেকেই ডেটা সুরক্ষার বিষয়টি প্রযুক্তিগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি, ডেটা মিনিমাইজেশন (যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই ডেটা সংগ্রহ), নিয়মিত অডিট এবং ডেটা ব্রিচ ঘটলে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তা জানানো—এসব বিধান কঠোরভাবে মানতে হবে। এতে কর্পোরেট দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি পাবে এবং ডেটা অপব্যবহার কমবে।
চতুর্থত, নাগরিকদের অধিকারকে আরও কার্যকর ও ব্যবহারবান্ধব করতে হবে। ডেটা অ্যাক্সেস, সংশোধন, মুছে ফেলা এবং অনুমতি প্রত্যাহারের মতো অধিকারগুলো সহজ পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা যায়, এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের মধ্যে ডেটা প্রাইভেসি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সরকার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, প্রযুক্তিগত সুরক্ষার দিকটি উপেক্ষা করা যাবে না। এনক্রিপশন, বেনামীকরণ এবং নিরাপদ সার্ভার ব্যবহারের মতো আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে ডেটা চুরি বা ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি কমে। একইসঙ্গে, আন্তর্জাতিক ডেটা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতি প্রণয়ন এবং বিশ্বস্ত দেশের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা প্রয়োজন।
সবশেষে, গোপনীয়তা ও স্বচ্ছতার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৫-এর মূল উদ্দেশ্য যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। জনস্বার্থ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মধ্যে সঠিক সমন্বয় স্থাপন করলেই একটি গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ ডেটা পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। সুতরাং, শক্তিশালী আইন, কার্যকর প্রয়োগ, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা এবং সচেতন নাগরিক—এই চারটির সমন্বিত প্রয়াসেই ভারতে নাগরিকদের ডেটা প্রকৃত অর্থে আইনি ভাবে সুরক্ষিত করা সম্ভব।
তথ্যও কি তাহলে শোষণের পণ্য?
একজন কৃষক মাঠে ঘাম ঝরিয়ে চাল ফলান, কিন্তু বাজারে সেই চালের লাভ যায় বড় ব্যবসায়ীর ঝুলিতে। একইভাবে, ভারতীয় নাগরিকরা প্রতিদিন কোটি কোটি তথ্য তৈরি করছেন, কিন্তু সেই তথ্যের উপর তাদের কোনও মালিকানা নেই। কেউ তাদের জিজ্ঞেস করছে না, অনুমতি নিচ্ছে না—কিন্তু তাদের কণ্ঠস্বর, মুখাবয়ব, ভাষাশৈলী দিয়েই বানানো হচ্ছে এআই, যা কোটি টাকার ব্যবসা তৈরি করছে। বাঙালির গর্ব—কবিতা, গান, নাটকে আজ এআই-ও বাংলায় কবিতা লিখছে—তবে তা কেমন করে সম্ভব হচ্ছে? আমাদেরই আওয়াজ, আমাদেরই ভাষার ছন্দ, আমাদেরই প্রাত্যহিক কথোপকথন এআই-কে শেখাচ্ছে ‘বাংলা লেখা’। অথচ সেই ‘সৃষ্টিতে’ আমাদের নাম থাকছে না, আমাদের সম্মতি তো দূরের কথা। এই প্রশ্ন শুধুই প্রযুক্তিগত নয়—এ এক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক সংকট।
শুধু তথ্যদাতা নয়, চাই অধিকার
ভারত ডিজিটাল হওয়ার পথে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। ডিজিটাল ইন্ডিয়া, স্মার্ট সিটি, এআই ইন এডুকেশন—এই সব প্রচেষ্টার পেছনে দরকার ডেটা। কিন্তু সেই ডেটা যারা দিচ্ছে, সেই নাগরিকদের যদি জানা না থাকে তারা কী দিচ্ছে, কেন দিচ্ছে, কে নিচ্ছে, তবে সেটি গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যকর চর্চা নয়। এই দৌড়ে নাগরিকরা যদি শুধু তথ্যদাতা হন, অধিকারবিহীন, তাহলে সেটি উন্নয়ন নয়, অদৃশ্য দাসত্ব।
আমরা কি জানি, কোন অ্যাপে ক্লিক করে কী তথ্য দিলাম? কোন ভিডিও দেখে আমাদের অভ্যাস পরিবর্তন হচ্ছে? কোন কোম্পানি আমাদের কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে নিজেদের এআই বানাচ্ছে? তথ্য, খাবারের মতোই প্রয়োজনীয়। কিন্তু খাবারের মতোই যদি তথ্যও কেবল শোষণের পণ্য হয়ে ওঠে, তবে আমরা পরিণত হব তথ্যে পরিপুষ্ট এক নিঃস্ব জনগোষ্ঠীতে। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি তথ্য হয় আমাদের নতুন খাদ্য, তবে আমাদের পাতে তার কতটুকু উঠছে?