ডু অর ডাই

ইংরেজিতে “ডু অর ডাই”, বাংলায় এর অর্থ হলো “করো অথবা মরো”। ইংরেজদের তাড়াতে মহাত্মা গান্ধী ১৯৪২ সালে এই স্লোগান তুলেছিলেন ঐতিহাসিক ভারত ছাড়ো আন্দোলনে। স্বাধীনতার ৭৮ বছর পর আবার সেই স্লোগান চর্চায় উঠে এলো পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এবার এই স্লোগান তুলেছে বিজেপি দল। দলের শীর্ষ নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে, গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ, বঙ্গে বিজেপির নির্বাচনি সহ-প্রভারি বিপ্লব কুমার দেব থেকে শুরু করে বঙ্গ বিজেপির নেতৃত্বরা এবং দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বরা একপ্রকার সকলকেই এই স্লোগান তুলে বঙ্গ নির্বাচনে প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গেছে। দলের একেবারে নিচু তলার কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও এই স্লোগানকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে বেশ কয়েকবার খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গলায়ও শোনা গেছে “হয় এসপার, নয় ওসপার” কথা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও বলে বেরিয়েছেন “বাংলাকে বাঁচাতে এটাই শেষ সুযোগ” বলে। দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনি সহ-প্রভারি বিপ্লব কুমার দেবও বারবার বলেছেন, “এবার নয়, তো কখনই নয়”। বিজেপি নেতাদের এই সবগুলো কথা এক জায়গায় করলে, এককথায় এর সারমর্ম হলো, “ডু অর ডাই”, “করো অথবা মরো”। পশ্চিমবঙ্গ থেকে তৃণমূলকে সরিয়ে বঙ্গ বিজয়ের এটাই শেষ সুযোগ বিজেপির কাছে। অঙ্গ (বিহার) এবং কলিঙ্গ (ওড়িশা) বিজয় সম্পন্ন হয়েছে। এবার বঙ্গ (পশ্চিমবঙ্গ) বিজয়ের পালা। প্রচার পর্বে এমনই “ন্যারেটিভ” ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বিজেপির পক্ষ থেকে। আর এসবের একটাই লক্ষ্য, বাংলায় প্রথমবার বিজেপির সরকার গঠন করা। দলের দাবি, এটা শুধু তাদের কাছে কোনও একটি রাজ্যে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, বরং এটি মতাদর্শগতভাবে দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জন্মভূমিতে দলের প্রতিষ্ঠার লড়াই। এখন সব থেকে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বাজিমাত করবে কে?

উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, বঙ্গে নির্বাচনের সাথে আরও চারটি রাজ্যের নির্বাচন হয়ে গেছে। বঙ্গে দুই দফায় ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু সবথেকে সাজো সাজো রব, আলোড়ন, সংঘাত, কেন্দ্রীয় বাহিনী, নির্বাচন কমিশন, প্রবল উত্তাপমাত্র একটি রাজ্য ঘিরে। আর সেটি হলো পশ্চিমবঙ্গ। তার আগে পশ্চিমবঙ্গসহ ১২ রাজ্যে এসআইআর হয়েছে। কবে কোন রাজ্যের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, কোন রাজ্য থেকে কতজন ভোটারের নাম বাদ পড়ে গেল, ট্রাইব্যুনালে আবেদন করার প্রক্রিয়া, এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ, এসব শোনা গেল না অন্য কোনও রাজ্যের ক্ষেত্রে। জানাও যায়নি। সবই নিঃশব্দে স্বাভাবিকভাবে হয়ে গেছে। কিন্তু ভোটকে কেন্দ্র করে যেন যুদ্ধক্ষেত্রের রূপ নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু কেন? কারণ একটাই, বিগত দিনগুলিতে ভোটকে কেন্দ্র করে চরম রাজনৈতিক হিংসা, ভোট লুট, ছাপ্পা ভোট, বুথ দখলের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আটকাতে এবার নির্বাচন কমিশন গোটা পশ্চিমবঙ্গকে একপ্রকার যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটা অংশের মতে, শুধু ভোট লুট আটকাতে নয়, এর পিছনে অন্য কারণও রয়েছে। সেই কারণটি হলো, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পশ্চিমবঙ্গের ভোটে জয়লাভ করা ব্যক্তিগত এক মরিয়া লক্ষ্যপূরণ। আসলে প্রেস্টিজ ফাইট। নিছক আরও একটি অধরা রাজ্য দখল করা নয়। মোদির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং জনপ্রিয়তার ভাবমূর্তিকে নির্মাণ করবে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ফলাফল। পশ্চিমবঙ্গে পরাজিত হলে প্রধানমন্ত্রী মোদির ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা লাগবে।

এখানেই শেষ নয়। বাংলায় পরাজিত হলে আগামী নির্বাচনগুলি এবং পরবর্তী লোকসভা ভোটেও মোদি অনেকটাই ব্যাকফুটে চলে যাবেন। পশ্চিমবঙ্গে এবার বিজেপি পরাজিত হলে, আগামী বছরে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ভোটে দ্বিগুণ বিক্রমে বিরোধীরা ঝাঁপিয়ে পড়বে যোগী আদিত্যনাথকে পরাস্ত করতে। বিগত লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে যেমন বিজেপির আসন কমে গিয়েছিল, তার থেকে অনেক বেশি বিপর্যয় হয়েছিল উত্তরপ্রদেশে। সেখানে ২০১৯ সালে প্রাপ্ত আসনের থেকে এক ধাক্কায় বিজেপি অর্ধেকে নেমে আসে। সুতরাং উত্তরপ্রদেশ নিয়ে বিজেপি এমনিতেই টেনশনে। পশ্চিমবঙ্গে পরাজিত হলে উত্তরপ্রদেশের পরাজয়ের সম্ভাবনা ত্বরান্বিত হবে, যা মোদি ও বিজেপির জন্য আরও ভয়ঙ্কর বার্তা। অন্যদিকে, বঙ্গে বিজেপিকে এতকিছুর পরও যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আটকে দিতে পারেন, তাহলে তিনিই হয়ে উঠবেন দেশে মোদি ও বিজেপি-বিরোধী একমাত্র মুখ। এ নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। তাই ২০২৬-এর এই নির্বাচন সকলের কাছেই “ডু অর ডাই” লড়াই। এই লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবে? সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

Dainik Digital: