সন্দীপ বসু
নবদ্বীপ, ২ সেপ্টেম্বর- ‘যে খায় চিনি, তারে জোগায় চিন্তামণি’। চিনির দাম যখন কেজি পিছু ৭৫ টাকা ছাড়িয়ে ৮০-র দোরগোড়ায় তখন জন্মাষ্টমীর আগে ঢু মেরেছিলাম নবদ্বীপ, মায়াপুরের ভোগ রান্নার হেঁশেলে। মায়াপুরের ইসকনের জনসংযোগ আধিকারিক রসিক গৌরাঙ্গ দাসকে প্রশ্ন করতে ‘চিন্তামণি’র উপমা টানলেন তিনি।
মায়াপুর ইসকনের ভোগ রান্না যেখানে হয় তাকে হেঁশেল না বলে বলা হয় ‘কিচেন’। বড় বড় কড়াইতে দুধ ফুটছে। তার মধ্যে পড়ছে চাল। ধীরে ধীরে ঘন হচ্ছে পায়েস। সঙ্গে মিশছে কেজি কেজি চিনি। ফুটন্ত দুধে গলে যাচ্ছে চাল আর সঙ্গে মোটা দানার চিনি। কোথাও মাপজোকের কড়াকড়ি নেই। গেরস্থের হেঁশেলে যখন চিনি নিয়ে টানাটানি চলছে তখন মায়াপুরের ‘কিচেন’-এ এক চামচ চিনি কমানোর হিসাবও নেই। প্রায় দশটি কিচেনে আলাদা আলাদা ভাবে শ্রীকৃষ্ণের ভোগ রান্না হয়। জন্মাষ্টমীর আগে প্রতিটিতেই ব্যস্ততা তুঙ্গে। রসিক গৌরাঙ্গ দাসের কথায়, ‘প্রতিটি কিচেনেই আলাদা ভাবে ভোগ তৈরি হয়। চিনির দাম বাড়লেও সেই পরিমাণ কমেনি।’
অথচ নবদ্বীপ মহাপ্রভুর জন্মস্থানে বড়ই টানাটানির সংসার। সেখানে গড়ে উঠেছে অজস্র মঠ। রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহের সেখানে নিত্যপুজো হয়। আগে সমস্ত মঠেই লিটার পাঁচেক দুধের পায়েস হতো। এবার চিনির দাম বাড়তেই দুধের পরিমাণও অর্ধেক হয়েছে। গৌরাঙ্গ, নিত্যানন্দের ভোগে প্রতিদিন দেওয়া হয় পায়েস। মঠাধ্যক্ষ অদ্বৈত দাস বাবাজির কথায়, ‘নিত্য ভোগে বদল আনা উচিত নয় জেনেও রদবদল করতে হয়েছে। আগে যেমন পাঁচ কেজি দুধের পায়েস হতো, এখনও কেজি দুয়েকের বেশি হচ্ছে না। তবে জন্মাষ্টমীতে ভোগের পরিমাণে কোনো কাটছাঁট হবে না। বরং পায়েসের সঙ্গে মালপোয়া, ক্ষীরসহ আঠারোটি মিষ্টান্ন থাকবেই।’
এই নবদ্বীপে খোদ মহাপ্রভুর বাড়ি। সেখানকার সেবায়েত জয়ন্ত গোস্বামীর কথাতেও সেই আক্ষেপের সুর। তিনি জানালেন, ‘আগে প্রতিদিন পাঁচ কেজি দুধের পায়েস হতো। জন্মাষ্টমীতে বড়জোর তিন থেকে সাড়ে তিন কেজির মতো হবে। বাজারদরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভোগের হাঁড়িতেও পড়েছে সংযমের ছায়া।’
মহাপ্রভুর বাড়িতে ভোগ রান্না করেন প্রণব গোস্বামী। তিনি ‘পাচক ঠাকুর’ নামে যথেষ্ট জনপ্রিয়। মহাপ্রভুর ভোগ রান্নার রেসিপি বলতে গিয়ে বললেন, ‘পাঁচ কেজি দুধে ৮০০ গ্রাম চিনি লাগে। সঙ্গে ১৫০ গ্রাম কাজুবাদাম, ১৫০ গ্রাম কিশমিশ আর প্রয়োজনমতো তেজপাতা—এই সামান্য উপকরণেই লুকিয়ে অপূর্ব স্বাদ।’
প্রথমে দুধ ফোটানো হয়। ধীর আঁচে। ফুটতে ফুটতে দুধের শরীর ক্রমশ ঘন হয়ে আসে। উপর থেকে ওঠা সর আলতো হাতে মিশে যায় দুধের স্রোতে। সেই সময়ে আঁচ কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হয়। তারপর ঘিয়ে মাখানো গোবিন্দভোগ চাল ঢেলে দেওয়া হয় ফুটন্ত দুধে।
চাল আর দুধ মিশতে শুরু করলেই একটানা নাড়তে হয়, যাতে চালের দানা দুধের উষ্ণতায় নরম হয়ে ফুলে ওঠে। চাল সেদ্ধ হয়ে গেলে তাতে পড়ে কাজুবাদাম আর কিশমিশ। সবশেষে আসে মিষ্টির পালা। দুধ যখন আরও ঘন হয়ে যায়, চাল যখন সম্পূর্ণ সেদ্ধ হয়, তখন আঁচ একেবারে কমিয়ে ধীরে ধীরে মেশানো হয় চিনি। নাড়তে নাড়তে মিশে যায় মিষ্টি—দুধ, চাল, শুকনো ফল আর চিনির মধ্যে অপূর্ব স্বাদের সংসার তৈরি হয়। নবদ্বীপে গৌরাঙ্গ আর কৃষ্ণের পাশাপাশি অনেক মঠ আর বাড়িতে সেবা পান বলদেব। নবদ্বীপে নাকি বিশাল বপুর বলদেবের নিজস্ব বাড়িও আছে। সেখানেও নিত্য ভোগের ব্যবস্থা আছে। তবে বিশাল বপুর সুবাদে মহার্ঘ্যের বাজারেও বলদেবের খাদ্যতালিকায় কোনও খামতি রাখছেন না সেবায়তরা। প্রতিদিন সাত কেজি দুধের যেমন পায়েস হতো এখনও হচ্ছে। বলদেব বাড়ির নিত্য ভোগের দায়িত্বে আছেন কৃষ্ণ গোস্বামী। তাঁর কথায়, ‘ভগবানকে কম দেওয়া যায় না।’
নবদ্বীপ-মায়াপুরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় আড়াইশোর বেশি মঠ-মন্দির আছে। প্রত্যেকের নিজস্ব রীতি, ভোগের নিয়ম রয়েছে। জগপুর চৈতন্য মঠে না গেলে যে কেউ বিশ্বাস করবেন না যে এখানে জন্মাষ্টমীতে দু’শো লিটার দুধ লাগে, যার মধ্যে ৫০ লিটার দুধে শুধু তৈরি পায়েস হয়। তারপর দুধের তৈরি মিষ্টি, ছানা, ননী, ক্ষীর তো আছেই। মঠের পুরী মহারাজও সেই রসিক গৌরাঙ্গের ঢঙেই ‘চিন্তামণি’র উদাহরণ তুললেন। তারপর বললেন, ‘চিনির দাম বাড়লেও জন্মাষ্টমীতে প্রভুর পরমান্নের সঙ্গে কোনও আপোস নয়।’ চিনির দাম নিয়ে গেরস্থের পরিবারে যতই চিন্তা থাকুক না কেন, নবদ্বীপ-মায়াপুরে পায়েসের হাঁড়ি আগের মতোই ফুটবে জন্মাষ্টমীতে।