দাঙ্গাবাজদের ভিটেমাটি বেচে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে, গুন্ডাদমন বিলের আলোচনায় কড়া হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আজ বিধানসভায় তাঁর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

কলকাতা অফিস, ২৯ জুন- দাঙ্গা থেকে শুরু করে উগ্র আইন অমান্যের মতো ঘটনা বাংলায় নতুন নয়। এবার এই ধরনের সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে বিধানসভায় দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাশ করাল রাজ্য সরকার। সোমবার বিধানসভায় পাশ হল ‘পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’, যা সংক্ষেপে ‘গুন্ডাদমন বিল’ নামে পরিচিত। আর সেই বিল পাশ হওয়ার পরে পূর্বতন তৃণমূল সরকারকে নিশানা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিরোধীদের প্রবল হট্টগোলের মধ্যে তিনি স্পষ্টভাবে জানালেন, সরকারি বা সাধারণ মানুষের সম্পত্তি ধ্বংস করলে এবার আর পার পাওয়া যাবে না, অপরাধীদের ঘরবাড়ি বিক্রি করে দ্রুত সেই ক্ষতিপূরণ উসুল করবে প্রশাসন।

            তাৎপর্যপূর্ণভাবে এদিনই বিধানসভার গ্যালারিতে দর্শকাসনে উপস্থিত ছিলেন রাজনৈতিক হিংসার শিকার হওয়া পরিবারগুলির সদস্যরা। ডায়মন্ড হারবারে খুন হওয়া রাজু সামন্তের পরিবার, মুর্শিদাবাদের নিহত হরগোবিন্দ দাস ও চন্দন দাসের পরিবার এবং নন্দীগ্রামে স্রেফ নতুন সরকারকে ভোট দেওয়ার ‘অপরাধে’ আক্রান্ত দেবব্রত মাইতির পরিজনেরা  হাজির হয়েছিলেন। আর সেই গ্যালারির দিকে আঙুল তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘তৎকালীন সরকার যদি সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা নিত এবং সাধারণ অপরাধ ও ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির মধ্যে তফাৎ বজায় রাখত, তবে আজ এই পরিবারগুলোকে এ দিন দেখতে হত না। আপনারা নির্বাচনে শুধু হারেননি, মানুষ আপনাদের প্রত্যাখ্যান করেছে।’

            বিরোধীবেঞ্চে দুই তৃণমূলের ভূমিকাকে কটাক্ষ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে বিধানসভায় কোনও শক্তপোক্ত অপজিশন নেই। কেউ কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন, কেউ আবার নিজের দলের লোকের জামা ধরে টানছেন। কারও দাবি, তিনিই আসল তৃণমূল, আবার কেউ অন্যকে ল্যাম্পপোস্ট বলছেন।’ আবার বাম আমলকে নিশানা করে তিনি বলেছেন, ‘আমি নিজে ছাত্র রাজনীতি করে ধাপে ধাপে কাউন্সিলর ও বিধায়ক হয়েছি। রাজনীতিতে এই অধঃপতনের সূত্রপাত হয়েছিল বামেদের আমলে। ২০০১ সালে পরিবর্তনের জনমতকে গায়ের জোরে আটকাতে তৈরি করা হয়েছিল ‘হার্মাদ বাহিনী’। লক্ষ্মণ শেঠ, সুশান্ত ঘোষ, অমিয় পাত্রদের মতো নেতারা সেই জমানার সৃষ্টি। তবে হ্যাঁ, এবার ডোমকল থেকে ওদের (সিপিএম) একজন ভদ্রলোক অন্তত জিতে এসেছেন।’ নতুন বিলের কড়া প্রয়োগের আশ্বাস দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, এই আইন কোনও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা অপপ্রয়োগের জন্য আনা হয়নি। হুঁশিয়ারির সুরে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘আসানসোলে আমরা দাঙ্গাকারীদের থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে দেখিয়েছি। এবারও দরকার হলে দাঙ্গাবাজদের ভিটেমাটি বিক্রি করে পাইপয়সা উসুল করা হবে, এবং তা অত্যন্ত দ্রুত করা হবে। পার্ক সার্কাসে পুলিশের ওপর ঢিল মেরে, মাথা ফাটিয়ে রক্ত ঝরিয়ে ভাবছেন পার পেয়ে যাবেন? আগে কালীঘাট থানায় টেবিলের তলায় পুলিশ লুকাত, কিন্তু মনে রাখবেন— এই পুলিশমন্ত্রী আলাদা। আগের সেই প্র্যাকটিস আর চলবে না। এই আইন শুধুমাত্র গুন্ডা ও দাঙ্গাকারীদের দমনের জন্য প্রযোজ্য।’

            পূর্বতন সরকারের ‘সন্ত্রাসের’ বিবরণ তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের মধ্যে প্রথম সিএএ বিরোধী মিছিল হয়েছিল বাংলায়। সিঁথির মোড় থেকে শ্যামবাজার পর্যন্ত মিছিল করে বাংলায় আগুনটা লাগিয়ে দিয়েছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তারপর থেকে গোটা বাংলা জ্বলল। চাঁচলের সামসিতে রেল লাইন উপড়ে দেওয়া হয়েছিল। রেলে কি শুধু হিন্দুরা চড়ে, মুসলমানরা চড়ে না? বেলডাঙায় স্টেশন জ্বলেছে, ৫০০ হকারের দোকান পুড়েছে। নিমতিতাতে ৬৮ দোকান লুট, রেজিনগর স্টেশনে আগুন। নবান্ন থেকে একটু দূরে সাঁতরাগাছিতে ৩৭টা বাসে আগুন ধরানো হয়েছিল, তার মধ্যে ২২টা ছিল সরকারি বাস। বেছে বেছে মোথাবড়িতে হিন্দু দোকানে আগুন।’

            তারাতলা কান্ডে কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেফতারের পরে তৃণমূলের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, “শুধু ‘কালী’ (কালীচরণ)-কে ধরলে আসলে কী হবে? আসল দোয়াত আর পেন বা কলমটা কোথায়? কালি তো এমনি এমনি থাকে না, তাকে তো দোয়াতে রাখতে হয়। তাই আসল দোয়াতটাকে নিয়ে আসুন, আর যে পেন দিয়ে সই হয়েছে, তাকেও ধরুন।” তার জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তৃণমূলের একজন (কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়) প্রশ্ন তুলেছেন যে, কালীকে তো গ্রেফতার করেছেন, কিন্তু দোয়াত আর কলমের কী হবে? আমি পরিষ্কার বলছি – ফিরহাদ হাকিম যদি সেই ‘কলম’ হন, তবে আসল ‘দোয়াত’ হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার নির্দেশ ও প্রশ্রয় ছাড়া কিছুই হত না।

Sumit Chakraborty: