দেশপ্রেমের আহ্বান না নীতিগত ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি?

ইতিহাসের নির্মম পরিহাস বোধহয় একেই বলে।যে দেশ একদা বিশ্বমঞ্চে নিজের আর্থিক সার্বভৌমত্ব ও ‘আত্মনির্ভরতা’র জয়গান গেয়েছিল,আজ তাকেই চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে দেশবাসীর দৈনন্দিন অভ্যাসের দরজায় কড়া নাড়তে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক দেশবাসীর প্রতি আহ্বান, যেখানে তিনি ভোজ্যতেলের ব্যবহার কমানো,সোনা কেনা স্থগিত রাখা কিংবা অপ্রয়োজনীয় বিদেশযাত্রা এড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন, তা কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়, বরং ভারতীয় অর্থনীতির অন্দরে বহমান এক গভীর ক্ষতের আকস্মিক আত্মপ্রকাশ। এমনকী ১৯৯১ সালের সেই অভূতপূর্ব আর্থিক বিপর্যয়ের সময়েও, যখন দেশের সোনার ভাণ্ডার বিদেশি ব্যাঙ্কে বন্ধক রাখতে হয়েছিল, তখনও রাষ্ট্রকে এমন দীনভাবে নাগরিকের হেঁশেল কিংবা সিন্দুকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে হয়নি। আজ যদি খোদ প্রধানমন্ত্রীকে পেট্রোল-ডিজেলের খরচ কমাতে ফের ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর মতো আপৎকালীন দাওয়াইয়ের শরণাপন্ন হতে হয়, তবে বুঝতে হবে বিপদের জল কতখানি ওপর দিয়ে বইছে।

এই আকস্মিক আর্তনাদের নেপথ্যে রয়েছে এক রূঢ় বাস্তব, দেশের বাণিজ্য ঘাটতির রেকর্ড উল্লম্ফন। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি যখন ৩৩,৩০০ কোটি ডলারের বিপজ্জনক চূড়া স্পর্শ করে, তখন ‘সবকা বিকাশ’-এর সুদৃশ্য আখ্যানটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। রপ্তানি যেখানে স্থবির, আমদানির ঘোড়া সেখানে লাগামহীন। তার ওপর পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধমেঘ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় অর্ধেকেরও বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে, যার সম্পূর্ণ অভিঘাত এখনও দেশের খাতায় এসে পৌঁছায়নি। এই করাল ছায়া দেখেই কি তবে রাজদণ্ড আজ শঙ্কিত?

আশ্চর্যের বিষয়, যে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অপচয় নিয়ে সরকার আজ উদ্বিগ্ন, তার বড় অংশই খরচ হয়েছে সোনা, ভোজ্যতেল এবং সারের মতো বুনিয়াদি পণ্যে। শেয়ারবাজারের অস্থিরতা থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষ সোনাকে নিরাপদ আশ্রয় ভাবছেন, ফলে শুল্ক বাড়িয়েও সোনা আমদানি রোখা যাচ্ছে না। কিন্তু আরও বড় ব্যর্থতা লুকিয়ে রয়েছে কৃষি ও শিল্পনীতিতে।একটি কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও ভারতকে তার ভোজ্যতেলের অর্ধেকেরও বেশি বিদেশ থেকে আনিয়ে খেতে হয়, আর আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই নাগরিকদের পাত থেকে তেল ছাঁটার উপদেশ দেওয়া হয়। দীর্ঘমেয়াদি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির পথে না হেঁটে, কেবল কৃষ্ণসাধনের উপদেশ দেওয়া কি শাসকের নীতিগত দেউলিয়াপনারই প্রমাণ নয়? সারের ক্ষেত্রেও গল্পটি এক। ইউরিয়ার আমদানি এক বছরে ৬০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের দোহাই দিয়ে এই দায় এড়ানো চলে না, কারণ দীর্ঘমেয়াদি দূরদর্শিতার অভাবই আজ ভারতকে এই খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রহসনটি বোধহয় ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ও ‘আত্মনির্ভর ভারত’ নামক গালভরা স্লোগান দুটির। ঢাকঢোল পিটিয়ে বিপুল অঙ্কের ভরতুকি (পিএলআই স্কিম) দেওয়ার পরও চিনের ওপর ইলেকট্রনিক উপাদান বা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির নির্ভরতা কমেনি, উল্টে আমদানির বহর বিপুল বেড়েছে। গত অর্থবর্ষে এই খাতে আমদানি ২০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর আর অর্থনীতির বাস্তব জমিনের মধ্যে ফারাকটি আজ আর ঢাকা দেওয়া যাচ্ছে না। ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারও দ্রুত খালি হচ্ছে, যা টাকার দামকে আরও অতলান্তে তলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে নাগরিকদের ত্যাগের আহ্বান জানানো সহজ, কিন্তু রাষ্ট্রের নিজের নীতিগত খামতি আড়াল করা অসম্ভব। শুধু অভ্যাসের পরিবর্তন নয়, অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারের সৎ সাহস না দেখালে, এই ক্ষুরধার সংকট থেকে মুক্তির কোনও সহজ পথ নেই। অন্যথায়,আত্মনির্ভরতার স্লোগানটি ইতিহাসের পাতায় এক নির্মম কৌতুক হিসেবেই থেকে যাবে।

নাগরিকের কৃষ্ণসাধন কখনোই রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতার বিকল্প বা আবরণ হতে পারে না। দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে সিন্দুক বা হেঁশেলের স্বাধীনতা খর্ব করার এই রাজকীয় আর্তি আসলে দীর্ঘমেয়াদি দূরদর্শিতার অভাবজনিত এক সুগভীর আত্মস্বীকৃতি। প্রশ্ন এখানেই, স্লোগানের চটক ও আত্মনির্ভরতার ঢাকঢোল যদি সত্যিই বাস্তবমুখী হতো, তবে আজ কেন একুশ শতকের সাবালক অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্য কম্পনে এমন থরথর কম্পমান হতে হবে?কেনই বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সমান্তরালে বৃদ্ধি পাবে পরনির্ভরতার গ্লানি? শাসনযন্ত্রকে আজ এই সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে যে, কাঠামোগত দুর্বলতা লুকিয়ে কেবল সাময়িক ত্যাগের আহ্বানে খাদের কিনারা থেকে দেশকে ফেরানো অসম্ভব। অন্যথায়, বাগাড়ম্বরের আড়ালে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার এই ব্যর্থ প্রয়াস আগামী ইতিহাসের দরবারে এক নির্মম কৌতুক হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বিবেক জাগ্রত হোক, কারণ সময় আর বেশি নেই।

Dainik Digital: