পুস্তক পর্যালোচনা : সেলিমের দশম কবিতা পুস্তিকা কাপুরুষ আমি, মরে যাই লাজে

কিশোর রঞ্জন দে

এই কবির যাত্রাপথ দীর্ঘ। যাত্রাপথ লাবণ্যধর্মী। এটি কবির দশম কবিতা পুস্তিকা। তার নিজের ভাষায়— ‘আমার এই হাওয়ার মিনার।’ উৎসর্গে উচ্চারণ করা হয়েছে সদ্যপ্রয়াত আমাদের হৃদয়ের কবি শঙ্খপল্লব আদিত্যের নাম। মন-মনন-বোধে আলো পড়তে শুরু করেছে প্রথম থেকেই।
১) ‘নিমগাছটা মরে গেল। অনেক উঁচু হয়েছিল। মরা ডালগুলো এখনো ছড়িয়ে রয়েছে ডিসেম্বরের আধো-আধো মেঘলা আকাশে, যেন মরেনি। আকাশের ওপারে কেউ নেই…
‘দীর্ঘদিন আমার সঙ্গী ছিল এই নিম। কখন ধীরে ধীরে মরে গেল আমার চোখের সামনেই, টেরও পেলাম না। হয়তো অনাদরে, হয়তো নিয়মেই। আজ থেকে অনেক বছর আগে, এ বাড়িতে আমরা একইসঙ্গে এসেছিলাম।’ (নিম)
বর্তমান সময়ের তারুণ্য আর মনের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা অরণ্যকে আস্বাদ করার অভিলাষে সেলিম চালনা করেছেন তার বর্তমান ৭৬টি কবিতাকে। সময়ের অন্যপীঠের উত্তাপকে নিজের কবিতায় সবসময়ই ধরে রাখেন কবি। আজকের ‘বইবাজার’-এর আস্ফালনে নগ্নতার ধ্বজাধারী কবিতার উল্টোপথে নিজের ছায়াকে সবসময়ই দেখতে পান তিনি। জানেন, পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠার মুদ্রা আয়ত্ত করলে প্রকৃত কবিতার সামনে দাঁড়াবার রাস্তা রুদ্ধ হয়ে যায় স্থায়ীভাবে।
২) ‘এই যে মানুষজন্ম, হত্যা ও মৃত্যু, এই যে পেশোয়ার বা কোকড়াঝাড়। এই গণহত্যা—কারণ রয়েছে সেখানেও। কী কারণ?’ (কারণ) কবিতার ভিত্তিভূমি চৈতন্যের উন্মোচন। এই উন্মোচনকে সহায়তা করার জন্য স্মৃতির একটা বিশেষ ভূমিকা থাকে। তার দশটি কবিতাপুস্তিকার প্রায় হাজারখানেক কবিতায় (বিভিন্ন লিটল ম্যাগে প্রকাশিত কবিতাসহ) পাঠক এই স্বর্ণাভ দ্যুতি দেখেছেন। পড়েছেন এই দ্যুতির বলয়কে, যে বলয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে সেলিম মুস্তাফা হয়ে উঠেন এই সময়ের অপরিহার্য কাব্যপ্রণেতা। আমরা আরও ভেতরে প্রবেশ করি সেলিমের কবিতায়। ৩) ‘আগুন একটা রঙের নাম/ভয়ের কিছু নেই/অনেক খেলার পর শেষখেলা হয় এই রঙে। আমরা পাহাড়তলিতে দাঁড়িয়ে দেখছি। এই রং নিয়ে খেলছে মণিপুর। যতক্ষণ তারা খেলতে পারে ততক্ষণ/রং পাঠাতে থাকবে দিল্লি।’ (রং); ৪) ‘ছোটো ছোটো পুতুল নিয়ে এই সংসার,/ আমি তাদের হাসি আর কান্না শেখাই,/ দ্রুত মানুষ হবার দুরন্ত আবেগে/মাঝে মাঝে কোথায় যেন হারিয়ে যায় ওরা./ কেউ কেউ ফিরে আসে রুখসুখ—উদাসীন/… না-কেঁদে না-হেসে কি আর মানুষ হওয়া যায়!’ (পুতুল);
৫) ‘হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পাই সামনে একটা দরজা, একটু দাঁড়াই, বুঝতে পারি না/এটা ঢোকার, না বেরোবার।’ (দরজা);
৬) ‘তোমার অলীক কলসি থেকে জল পান করে/শরীরের পাখি আর পাখির শরীর/লালি-আঁকা লাগা হাঁসের মতো এখন/এলোমেলো বিমূঢ় পা (লালি আঁটা)’।
যেটা বলতে চাইছি, কবিতা পুস্তিকার ৭৬টি কবিতা স্বতন্ত্র হলেও ভেতরে একটা অভিন্ন সুর কাজ করছে, যেন সাদা কাপড়, শ্যাওলা, অতিমারি, শিকারি, বিকেলের নরম রোদ, উৎসব, জঙ্গল, জোনাকি, যাত্রী, রূপ-অরূপ আর একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতার এক জটিল পরিসর। সেলিমের একক ভ্রমণ সরলরৈখিক। তার প্রতিটি কবিতায় এক নতুন অর্থ অন্বেষণে নামতে হয় পাঠককে।
সময়ের রাজা যে উলঙ্গ, একথা সবাই জানে বলেও। কিন্তু বক্তাও যে বস্ত্রহীন, একথা বলেনি কেউ। সকলেই ষোলো আনা মানিকরতন। কোন মায়ের কোল আগামীতে শূন্য হবে কে জানে!
‘আমার আওয়াজগুলি’ পড়ে দেখবেন পাঠক। সেলিমের মতো কবিকে নিয়ে আলোচনা করা সহজ নয়। নষ্ট সময়ে দাঁড়িয়ে কবি জীবনটাকে দেখছেন। অনুভব করছেন, আমাদের জীবনযাপনে সাহিত্য আর সত্যের উপর নির্ভরতা কমে আসছে। ফলে মানুষ তার ভাবনার রাজ্যে দিন দিন একা হয়ে পড়ছে। প্রতিদিনের প্রতিটি মৃত্যুই কবিকে আক্রমণ করতে বাধ্য। সমাজধর্ম, নীতি, অনুশাসনের দমবন্ধ করা পৃথিবীতে সব কবিকেই বাস করতে হয়। ১৯৭৬ থেকে ২০২৬—দীর্ঘ ৫০ বছর অন্তত দশবার তিনি বাঁক নিয়েছেন। নিজেকে বদলেছেন। তার ছায়া দীর্ঘতর হয়েছে। সময় তাকে শিখিয়েছে নতুন করে ভাবতে, তাই তার দীর্ঘ পরিক্রমায় কবিতার গভীরতা বা নিবিড়তা কোনোটাই কমে যায়নি। মানুষ ব্যক্ত হয়ে পড়েছে জীবনের স্থূলতা ও ভোগব্যাকুলতায়, কবিতা তাই আলো-আঁধারে নিকষিত অবয়ব। বহুমাত্রিক সময়ের জটিলতায় কবিতাও বহুমাত্রিক। কবিতার গভীরতা উত্তরোত্তর বেড়ে যাচ্ছে।
৭) “আমি সদাই মরি কিছু অস্পষ্ট মৃত্যু/মৃত্যুর বহুস্বর বারবার আমাকে জাগায়, পথে পথে দেখি কত/নিঃস্ব-শব্দ অহল্যারা বসে আছে কেউ। বাসে তো বাসুক ভালো যদি এই পথে আসে/আমি ডিঙিয়ে এসেছি সেইসব পাথরপ্রতিমা। আমার কোনো দ্বিরাগমন নেই।” অথবা, “আজ সংঘাত আমার নিত্য সহচর/কিছু বল তো যুদ্ধ,/কিছু না-বল, তা-ও যুদ্ধ./ কাগজে প্রতিহিংসার অতিমারি খবর হয়েছে/নির্বাচন হয়েছে দু-পেয়ে জড়দের এলাকায়।” (উদ্ধৃতি দুটো ‘আমার আওয়াজগুলি’ কবিতার)। এই অপরাধজগতেই কবির জন্ম ও বেড়ে ওঠা। এখানেই তার আর্তনাদ আর ভালোবাসা। ভালোবাসা, প্রেম ও সৌন্দর্য আর অনাগত বিভ্রম—এসবই জীবনের অনুষঙ্গ। প্রচলিত গড্ডালিকা প্রবাহ থেকে সরে গিয়ে যখন নতুন শব্দমালা ও নির্মাণশৈলী অভিঘাত সৃষ্টি করে, তখন চেতনা ও মনন ঋদ্ধ হয়।
‘আমার আওয়াজগুলি’ নামের দীর্ঘ কবিতায় সেলিম লিখেছেন, “হাতে অস্ত্র, মুখে অস্ত্র, পোশাকের তলে অস্ত্র/কে কার সৈন্য, কে সেনাধিপতি,/কে শহিদ, কে-বা দেশদ্রোহী/কোনটা কার রক্তের দাগ কেউ জানে না/হৃদয়ে কোনদিকে কার কার ছিদ্র/কোনদিকে স্বপ্নের লালিত কুসুম/কেউ জানে না লেখা থাকে না। এইসব দুর্বলতা।”
৭৬টি কবিতার ‘এই হাওয়ার মিনার’ থেকে (কবি এই শব্দসমষ্টিই ব্যবহার করেছেন উৎসর্গের পাতায়) আরও দুটি কবিতা পড়া যাক: ১) ‘জঙ্গলে ঢুকে পড়েছি,/পা টিপে টিপে/খুবই সতর্ক চলাফেরা,/শব্দ/হলেই বিপদ/এখন শব্দই/শত্রু’ (জঙ্গলে); ১০) ‘একদিন হঠাৎ/নদীটি এসে বলল, দাঁড়াও!/ তারপর সব অঙ্গ ভিজিয়ে দিল,/ তাহলে এতদিন আমি কি অশুদ্ধ ছিলাম। মোটেই না। আমি তো গোপনে তার কমণ্ডলু থেকে/চুমুকে চুমুকে রোজই পান করি।’ (নদী ৩); ১১) ‘ফিরে আসব বলে চলে এসেছিলাম ইন্ডিয়া/মা বললেন এদেশে শুধু ডালভাত/সব ডালভাতেই কিছু কালো থাকে/ এসব গোপন কথা ফিরে গিয়ে বলা হয়নি নদীকে/ যাব যাব করে একদিন পাল্টেই গেল। সেই দেশ,/স্বদেশ, আমাকে বল/নদী কি আগের মতো আছে?’ (নদী-৪)।
সেলিমের পাঠকেরা জেনে গেছেন, তার কাগজে কবিতা আসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কোনো হিসেব কষে, অর্থাৎ অঙ্কের নামতা কষে কবি কবিতা লেখেন না। সৃষ্টির সময়ে বড় নিমগ্ন থাকেন, আন্তরিক থাকেন। অর্থাৎ সিরিয়াস হয়ে যান। কবিতায় নিজেকেই নিজে আঘাত করেন যেন। নিরন্তর ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়েই দশম কবিতা পুস্তিকায় তিনি খুঁজেছেন নতুন সন্ধান।
সৈকত প্রকাশনের এই সংকলনে প্রতিটি পাতায় দৃষ্টিনন্দন ছাপা। বানানের ব্যাপারে সিরিয়াস এই প্রকাশক। নির্ভুল ছাপা, অক্ষরবিন্যাস আর স্বচ্ছ পরিবেশনা পুস্তিকার মান বাড়ায়। এই গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে এক উজ্জ্বল প্রস্তুতি।
প্রচ্ছদশিল্পী অরূপ দত্ত। তার সৃষ্ট প্রচ্ছদ ইঙ্গিতবহ, আর আলোচ্য এই ৭৬টি কবিতার ছোঁয়া যেন লেগে আছে এতে।
কাপুরুষ আমি, মরে যাই লাজে — সেলিম মুস্তাফা
সৈকত প্রকাশন, আগরতলা
মূল্য: ১৩০ টাকা

Sumit Chakraborty: