বাসব মৈত্র
“রেলপথে চলেছি বাবার বাড়ি।দমদম জংশন থেকে উল্টোডাঙ্গা পৌঁছবার ঠিক আগে—
মাঝপথে থেমে গেল ট্রেন। লাইনের ধারের মানুষের ঘর সংসার অনেকক্ষণ ধরে দেখার নেশা আমার বরাবরই। গালাগাল দিতেই পারেন আপনারা।বলতেই পারেন—
কলকাতা শহরের দু’-তিনখানা বাড়ির মালকিন হয়েও রেলবস্তির ফুটোচালের ঘরে কী দেখিস এত, ময়ূরা? এ হল তোর মনবিলাস”
(কিচিরমিচির/ ময়ূরী মিত্র)
উপরের উদ্ধৃত অংশটি ময়ূরী মিত্রের “কিচিরমিচির” গল্পের অংশ।
এই গল্পে লেখক ও মূল চরিত্র সম্ভবত মিশে গেছেন। মিশে গেলেও লেখক এখানে তার শ্রেণিগত অবস্থান থেকে সরে এসে দৃশ্যটিকে পাঠকের জন্য বড় ক্যানভাসে তুলে ধরছেন। পাঠক জানেন, এই ময়ূরা চরিত্র তুলনায় উচ্চবিত্তের। যিনি একজন নারী। আবহমান বাঙালি নারীর প্রেক্ষাপটে যদি আমরা এই চরিত্রকে দেখি,দেখব অধিকাংশ নারীর কাছে আজও ‘সংসার’ অন্যতম প্রধান আকর্ষণের জায়গা। সেখানে রেল লাইনের ধারের মানুষের সংসার অবলোকন করা— এ যেন গভীর মানবিক আকুতি, মানুষ হয়ে মানুষকে স্পর্শ করার,ছুঁয়ে দেখার।ফুটো চালের সংসার— বিত্ত, বৈভব এখানে কথা নয়। এ যেন জানতে চাওয়া— ‘ কেমন আছ মানুষেরা? ‘। আর সেই মানবিক কৌতূহল থেকেই জন্ম নেয় বিপরীত শ্রেণির চরিত্র, বাস্তবতা। আবিষ্কারের নেশা। যে কারণে ময়ূরা বলে, “ওদের হাঁ করে গেলাটা ছাড়বে না ময়ূরা”। কী দেখতে চায় সে? চায় লাল নীল রঙের একটা সংসার দেখতে। চায় রঙিন মানুষ দেখতে যে দারিদ্র্যকে তোয়াক্কা না করে সম্পর্কের রঙিন উদযাপনে মাততে পারে। দিন যাপন যাদের আলাদা। সংলাপ যাদের আলাদা। কী ভাবে প্রেমের কথা বলে এই নরনারী? ময়ূরার চোখে ধরা পড়ে এদের স্পষ্ট আদিম আত্মীয়তা।
ময়ূরা কি অবচেতনে মিলিয়েও নিতে চায় না ওদের সঙ্গে নিজের?নিজেদের? কিন্তু সে ইঙ্গিত লেখক উহ্য রেখেছেন পাঠকের কল্পনার জন্য। খেয়াল রাখতে হবে, লেখক এখানে তুলনায় উচ্চবিত্তের কোনো অহংকারকে প্রশ্রয় দেননি। এই কারণে দারিদ্র্য বিষয় হয়ে উঠছে না। শ্রেণিগত বৈষম্য বিষয় হয়ে উঠছে না। বরং সেই পাঁচিল ভেঙে দিচ্ছেন লেখক বারবার। লেখক চরিত্রের অবচেতনকে বাস্তবতা দিয়ে আঘাত করে খেয়াল করিয়ে দিতে চাইছেন, পাঠকের চোখে ময়ূরার এই সংবেদনশীলতা কিছুক্ষণের ন্যাকামি মনে হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও এই উচ্চারণ মূলত এক নারীর। তেমনই ময়ূরার কৌতূহল প্রশ্নহীন নয়। কিন্তু পুরো অসত্যও নয়।
এই রেললাইনের পাশে ময়ূরা খুঁজেছিল ,বহু মানুষের সংসার। সংসার— যা সম্পর্ককে বেঁধে রাখে।যেখানে সম্পর্কের মূল গাথনি মায়া। সংসার বহু রঙা। গরিবের সংসারে হয়তো আতিশয্য নেই। কিন্তু সেই সব লেখক পাত্তা দিচ্ছেন না,মূল চরিত্রের দৃষ্টি ভঙ্গির মধ্যে দিয়ে। শ্রেণিসচেতনতা বজায় রেখেই। হয়তো পাঠককে আংশিক ছায়াগ্রস্থ করে দিয়েই।
কী দেখছে এক দৃশ্যে ময়ুরা? এক লাইনে শুয়ে ছটফট করছে এক বর আর বউ। মরতে চায় নাকি ওরা? না, মাথায় এই ভাবনা এলেও, ময়ূরা দেখে, ওরা আবির মাখাচ্ছে পরস্পরকে। মুখে খিস্তি।
কখনো ‘শুয়োরের বাচ্চা মর তুই’ বলছে মেয়েটি তার পুরুষকে। কখনো বলছে, ‘ এই শালা’ । পাঠক কল্পনা করুন, আমাদের মূল চরিত্রের, ময়ূরার চোখে কি তখন চিক চিক করছে না জল? যে দাম্পত্য সেই ভর সন্ধ্যের আবিষ্কার তার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক বন্যতা,আদিমতার প্রাথমিক মৌখিক উচ্চারণ।খিস্তি এখানে রাগের,ঘৃণার নয়।প্রেমের দ্যোতক। আহা দাম্পত্য!
দারিদ্র্য যেন এই সংলাপের ভেতর উচ্চারণ করেছে আত্মার অকুণ্ঠ প্রেম।যা দারিদ্র্যের সঙ্গে নিত্য উদযাপিত। মধ্যবিত্ত এই তথাকথিত দাম্পত্য খিস্তিকে সন্দেহ করে। মধ্যবিত্তের রাবীন্দ্রিক রুচি এতে আহত হয়।মধ্যবিত্ত এই সম্পর্ককে,এই সংলাপকে মান্যতা দিতে কুণ্ঠিত।
কিন্তু মধ্যবিত্তের অনেক ভাগ।তারও কোণায় কোণায় এই সংলাপ আজ বহুদিন নারী পুরুষের আকর্ষণকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।তাই এই সংলাপ শুনেও ময়ূরা ব্যথিত হয়নি। তার কপালে ভাঁজ পড়েনি ,এই বলে যে আহা সংস্কৃতির কী অবনয়ন। বরং ভানহীন সম্পর্কে ময়ূর যেন পরোক্ষে উজ্জ্বল। লেখকের এই আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি মুগ্ধ করে।
পাঠক খেয়াল করবেন, এমনকি “মর তুই”-এর মধ্যেও কোনও মৃত্যু কামনা নেই। বরং এর মধ্যে সখ্য ,বন্ধুত্ব,প্রেম মিলে মিশে একাকার।এই ভাবেই ময়ূরী মিত্র পারেন বারবার নাগরিক সচেতনাকে উসকে দিয়ে মানব মনের সঠিক সত্তাকে পর্যবেক্ষণ করতে।
‘কালো পার্বতী কথা’-র প্রথম পর্বেও আমরা পাই নৃত্য পটিয়সী সুলোচনার কথা।সুলোচনার ঘরে ইলেকট্রিক নেই।সে একজন বিবাহ বিচ্ছিন্ন বিহু শিল্পী।
সুলোচনা জানাচ্ছে, ” আমার আর বরের ছাড়াছড়ি হয়ে গেছে দিদি। কিন্তু বিহুর সময় না এসে পারে না।আমার নাচ দেখা ও ছাড়তে পারেনি।বন্ধুদের নিয়ে আসে।”
নাচের মধ্যে দিয়ে এখানে বিগত সম্পর্ক-বিচ্ছেদকে অস্বীকার করা হয়েছে। প্রেমের জন্য একটা কোনো গুণ দরকার হয়। সেটা বিভিন্ন হতে পারে। লেখক এখানে নৃত্যকে দুই নারী পুরুষের মিলন ক্ষেত্র হিসেবে নাচ এবং বিহু-কে যা ঐতিহ্যের উৎসব তাকে পটভূমিকার অংশ হিসেবে তুলে এনেছেন। প্রাঞ্জল ভাষায় ময়ূরী মিত্রের লেখার মূল কেন্দ্র থাকে হাতে গোনা কয়েকটি অনুচ্ছেদে।বাকি ক্ষেত্রে প্রকৃতি, অতিসাধারণ সমস্ত ঘটনা গল্পের আবহ নির্মাণ করে, অসংখ্য সার্থক গল্পের মতোই।
সুলোচনা ও তার প্রাক্তন বরের মধ্যে দিয়ে লেখক পুরুষের মনস্ত্বত্বকে তুলে আনছেন।
১/ লেখক দেখাচ্ছেন,পুরুষ তার প্রাক্তন স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে।কী কারণ তার উল্লেখ নেই। এখানে লেখক রহস্যকে ঘনীভূত করেছেন। কিন্তু প্রাক্তন স্ত্রীর নাচের প্রতি রয়েছে পুরুষের আসক্তি। নাচ যেন এখানে শিল্পের তো বটেই, অবদমিত যৌনতার প্রতীক। যৌনতাকে উপেক্ষা করতে না পারা এক পুরুষ স্বভাব। স্ত্রীকে যদি প্রাক্তন প্রেমিকা হিসেবেও দেখি, তাহলে সেই নারীর দেহ সৌষ্ঠব, নৃত্যকলাকে বন্ধুদের সামনে উপস্থাপিত করার মধ্যে দিয়ে পুরুষ এটা প্রমাণ করতে চায়, সে কোথায় জয়ী। নারীকে, নারীর শরীর মনকে জয় করার মধ্য দিয়ে পুরুষের প্রচ্ছন্ন অহংকার কোথাও গিয়ে এক জ্যোতির্বলয় তৈরি করে পুরুষ অস্তিত্বে। যা ভীষণ ভাবেই পুরুষতান্ত্রিক।
২/ অন্যদিকে দেখি, সুলোচনা নৃত্যের শিক্ষক। কড়া শিক্ষক।কাজ থেকে ছুটি নেয়না। কিন্তু তার প্রাক্তন বর এলে সে শিক্ষকের কাজ থেকে ছুটি নেয়। অর্থাৎ সেও উপেক্ষা করতে পারেনা পছন্দের পুরুষ অস্তিত্বকে।সে সারা জীবনের জন্য সেই পুরুষকে যাপনের শর্তে মেনে নিতে না পারলেও,খণ্ডিত সময় এবং উৎসবের আবহে তাকেই যেন নিজের পুরুষ হিসেবে শিলমোহর দিতে চায়। সামগ্রিক নয় খণ্ডিত মুহূর্ত উদযাপন যা এই সময়ের মূল চরিত্র— লেখক তাকে দুই নাগরিক নয় এমন চরিত্রের মধ্যে দিয়ে তুলে এনে, নগর, অরণ্যকে এবং এই সময়কে কোথায় সুনিপুণ দক্ষতায় মিলিয়েছেন।
৩/ বন্ধুর প্রাক্তন স্ত্রীর নাচ দলগত ভাবে দেখার মধ্যেও রয়েছে লোভ লালসার এক নিরপেক্ষ উচ্চারণ।।সেখানে শিল্পের ভূমিকা কত টুকু? বরং সমবেত উপস্থিতি, এতো পুরুষেরই কাম-উত্তেজনার একটা দিক।
৪/ আমরা একথাও ভেবে দেখতে পারি, উচ্চবিত্তের মধ্যে এই সময়ে,ডিভোর্সের পরও বন্ধু হিসেবে থাকার বহু ঘটনা দেখা যায়।সুলোচনা আর তার প্রাক্তন স্ত্রীর সম্পর্ক কি সেই নাগরিক চিহ্নকে বহন করে না?
পরিশেষে বলার, অর্থাৎ ময়ূরী মিত্রের এই দুই গল্পে আমরা দেখতে পাই, সম্পর্কের শৃঙ্খলহীন এক মায়াবী নিরাপত্তা,যা হয়তো শিকড়ের মতো মার্কসীয় দর্শন অগ্রাহ্য করে জড়িয়ে থাকে।যাকে উপলব্ধি করা যায়।প্রশ্ন করা যায়।সমাজ দিয়ে ক্ষত বিক্ষত করা যায়।উপেক্ষা করা যায় না। এখানেই ময়ূরী মিত্রর সমাজ ভাবনায় এক অনন্য সুর।