সুস্থ লিভার মানেই সুস্থ ভবিষ্যৎ

ফ্যাটি লিভার—যাকে এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হচ্ছে Metabolic dysfunction-associated steatotic liver disease—একসময় শুধুই প্রাপ্তবয়স্কদের রোগ হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, এই রোগ ক্রমশ শিশু-কিশোরদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনই এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে। এই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন শিশুবিশেষজ্ঞ ডাঃ অর্পণ সাহা। কথা বলেছেন আনন্দিতা সরকার

কেন শিশুদের মধ্যে বাড়ছে এই সমস্যা?

আজকের শিশুরা আগের মতো মাঠে খেলাধুলা করে না। তার বদলে সময় কাটছে মোবাইল, ট্যাব বা টিভির পর্দার সামনে। এই “স্ক্রিন-নির্ভর” জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস—প্রচুর জাঙ্ক ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্ট ফুড এবং মিষ্টি পানীয়। এসব খাবারে অতিরিক্ত চিনি, ট্রান্স ফ্যাট ও ক্যালোরি থাকে, যা শরীরে জমে লিভারে ফ্যাট তৈরি করে।

এর পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অনিয়মিত ঘুম এবং স্ট্রেসও শিশুদের মেটাবলিজমে প্রভাব ফেলছে। ফলে অল্প বয়স থেকেই লিভারে চর্বি জমা শুরু হচ্ছে।

MASLD-এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—অনেক সময় এই রোগের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। আপাতদৃষ্টিতে শিশুদের সাধারণত সুস্থই মনে হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে:
হালকা পেটব্যথা,
অকারণ ক্লান্তি,
ক্ষুধামন্দা।

অনেক সময় হঠাৎ রক্ত পরীক্ষায় (বিশেষ করে Liver Function Test) SGPT বা ALT-এর মাত্রা বেড়ে গেলে বিষয়টি ধরা পড়ে। অর্থাৎ, ভিতরে ভিতরে লিভারের ক্ষতি চলতে থাকে, কিন্তু বাইরে থেকে বোঝা যায় না।

কোন শিশুদের ঝুঁকি বেশি?

কিছু নির্দিষ্ট কারণে ঝুঁকি বেড়ে যায়:
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা,
পরিবারে Type 2 Diabetes বা মেটাবলিক রোগের ইতিহাস,
নিয়মিত জাঙ্ক ফুড ও মিষ্টি পানীয় গ্রহণ,
কম শারীরিক পরিশ্রম,
জন্মগত বা পারিবারিক প্রবণতা।

দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কী হতে পারে?

সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে এই রোগ ধীরে ধীরে গুরুতর রূপ নিতে পারে। যেমন:
লিভারের প্রদাহ (স্টিয়াটো-হেপাটাইটিস),
লিভারে দাগ বা ফাইব্রোসিস,
পরবর্তীতে Liver Cirrhosis পর্যন্ত গড়াতে পারে।

অর্থাৎ, শৈশবের একটি “নীরব” সমস্যা ভবিষ্যতে বড় রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অভিভাবকদের করণীয়

শিশুদের সুস্থ রাখতে অভিভাবকদের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ:
ওজন ও BMI পর্যবেক্ষণ: নিয়মিত শিশুর ওজন ও উচ্চতা মেপে BMI হিসাব রাখা,
দৈনিক শরীরচর্চা: প্রতিদিন অন্তত ১ ঘণ্টা দৌড়ঝাঁপ বা খেলাধূলা নিশ্চিত করা,
সুষম খাদ্যাভ্যাস: ঘরের খাবার, শাকসবজি, ফল, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাসে জোর দেওয়া,
জাঙ্ক ফুড সীমিত করা: ফাস্ট ফুড ও মিষ্টি পানীয় যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা,
স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ: মোবাইল ও টিভি ব্যবহারের সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া,
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: প্রয়োজন অনুযায়ী LFT বা অন্যান্য পরীক্ষা করানো।

সচেতনতার বার্তা

অনেক অভিভাবক ভাবেন—“এখন তো ছোট, বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে।” এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ, আজকের অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসই আগামী দিনের বড় রোগের ভিত্তি তৈরি করে।

শিশুকাল থেকেই যদি স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা গড়ে তোলা যায়, তাহলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। শুরুটা হোক পরিবার থেকেই—খাবার, ঘুম, শরীরচর্চা—সবকিছুর মধ্যে সঠিক ভারসাম্য আনতে হবে।

হেলদি হ্যাবিটস ছোটবেলা থেকেই গড়ে তোলা উচিত।

Sumit Chakraborty: