চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিষিদ্ধ: জনস্বার্থ নাকি নীতিগত ভুল?
গত দুই দিন আগে রাজ্যের ডবল ইঞ্জিনের সরকার আগরতলা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ এবং জিবি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। রাজ্য মন্ত্রিসভায় এই সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দাবি করে মহাকরণে সাংবাদিক সম্মেলন করে সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা রাজ্যবাসীকে জানিয়েছেন মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী। সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পরেই এ নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসকদের মধ্যে সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, চিকিৎসকদের পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন অংশের জনগণের মধ্যেও সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই সিদ্ধান্ত কি রাজ্য মন্ত্রিসভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে? নাকি দুই-একজনের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তকে সর্বসম্মত বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে? কেননা, এটি একটি অতি স্পর্শকাতর বিষয়। এমন স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজ্য সরকারকে এই বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা, পর্যালোচনা করার প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছে সমাজের বিভিন্ন মহল। কারণ, এর সঙ্গে শুধু রাজ্যের চিকিৎসা পরিষেবার বিষয়টি যুক্ত নয়, এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে রাজ্যবাসীর চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়টিও।
শুধু তাই নয়, রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তকে উদ্ভট আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রথমত, এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র আগরতলা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও জিবি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে কেন প্রযোজ্য? রাজ্যের অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে কেন এই সিদ্ধান্ত কার্যকর নয়? তাহলে সরকারের চোখে কি একমাত্র অপরাধী আগরতলা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও জিবি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকরা? তাছাড়া সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে যে দাবি করা হয়েছে, সে দাবি নিয়েও জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ডাক্তারদের সংগঠনের সঙ্গে কথা বলে এবং তাঁদের সম্মতি নেওয়া হয়েছিল। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা হওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই রাজ্যের চিকিৎসক মহলে কেন এমন বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলো? কেন এ নিয়ে এত জলঘোলা হচ্ছে? রাজ্যের চিকিৎসক মহল যে সরকারের এই সিদ্ধান্তে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ এবং অখুশি, তা তো দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, মন্ত্রী এবং স্বাস্থ্যসচিবের বক্তব্য নিয়েও চিকিৎসক মহল চরম অপমানিত বলে প্রকাশ্যেই মুখ খুলে প্রতিবাদ জানিয়েছে। এখন সব থেকে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিপূর্ণ? এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজ্যবাসীর স্বার্থ, অসুস্থ রোগীদের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হবে? সরকারের এই সিদ্ধান্তে আগরতলা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও জিবি হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবার মান কতটা উন্নত হবে? জিবি হাসপাতালে চিকিৎসা করতে যাওয়া রোগীদের হয়রানি কতটা লাঘব হবে? রোগীদের সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরী হবে? জিবি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে দিলেই জিবি হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবার মান ফিরবে? এমন গ্যারান্টি কি রাজ্য সরকার এবং রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর রাজ্যবাসীকে দিতে পারবে?এই প্রশ্নগুলি নিয়ে কিন্তু এখন জোর চর্চা চলছে।সমাজের বিভিন্ন মহলের মতে, সরকার আসল কাজ না করে যুক্তিহীন একটি উদ্ভট সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্যের চিকিৎসা পরিষেবাকেই বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।অনেকের মতে, সরকার কাজের কাজ না করে আচমকা একটি বিতর্ক অকারণে উসকে দিয়েছে। কারণ, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজ্য সরকার রাজ্যের একটি বড় অংশের মানুষের চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিষয়টি
নিয়ে একবারও ভাবেনি। যদি ভাবত, তাহলে এমন একটি উদ্ভট সিদ্ধান্ত নিতে পারত না। প্রথমত, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য কোনও নেতা-মন্ত্রী,জনপ্রতিনিধি, শাসক ও বিরোধী দলের সিকি থেকে আধুলি, শীর্ষ নেতা-নেত্রী, সরকারি আমলা থেকে শুরু করে বড় বেতনের সরকারি কর্মচারী, উচ্চমধ্যবিত্ত, বড় ও মাঝারি স্তরের ব্যবসায়ী- এরা কেউই যান না। এরা বেসরকারি হাসপাতাল এবং প্রাইভেট চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। সরকারি হাসপাতালে
চিকিৎসার জন্য তাঁরাই যান, যাঁদের আর্থিক অবস্থা দুর্বল। এককথায় সমাজের অসহায় গরিব, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন আয়ের মানুষ। এখন সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক জিবি হাসপাতালের স্পেশালিস্ট চিকিৎসকরা যদি প্রাইভেট
প্র্যাকটিস বন্ধ করে দেন, তাহলে যাঁরা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যান না, সেই রোগীদের কী হবে? অন্যদিকে, সরকারের সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্পেশালিস্ট চিকিৎসকরা যদি চাকরি ছেড়ে দেন, তাহলে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবার কী হাল হবে? অনেকের অভিমত, রাজ্য সরকার যদি প্রকৃত অর্থেই জিবি হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবার মান উন্নত করতে চায় এবং জনগণকে সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে হাসপাতালের পরিকাঠামোর উন্নয়ন করার
পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়িয়ে শিফটিং ডিউটি কঠোরভাবে চালু করা জরুরি। ডিউটির সময়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস কিছুতেই করা যাবে না। এই আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা জরুরি। আইন ভাঙলে কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে সমাজের সকল অংশের জনগণেরও সুবিধা হবে। প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং ফল হবে উল্টো।
তাছাড়া,জনকল্যাণমুখী একটি সরকারকে এমন সিদ্ধান্ত কখনোই নেওয়া উচিত নয়,যে সিদ্ধান্ত সরকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে, সামগ্রিক জনগণের বিরুদ্ধে যাবে এবং সমালোচনার ঝড় উঠবে। শেষে আবার ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে।জিবি হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করার সিদ্ধান্তের জল আরও কতটুকু গড়ায়,এখন সেটাই দেখার।