সংখ্যার খেলা, নীতির পরাজয়!!
দিল্লির অলিন্দে সম্প্রতি যে রাজনৈতিক দৃশ্যকাব্য মঞ্চস্থ হচ্ছে,তাকে সংসদীয় গণতন্ত্রের বিবর্তন বললে ইতিহাস প্রতি অবিচার করা হয়; এটি আসলে এক চরম ও নগ্ন অবক্ষয়ের ধারাবাহিক প্রদর্শন। একদিকে যখন বিরোধী শিবির ‘ইন্ডি’ জোটের শীর্ষনেতৃত্ব এক সমান্তরাল ভাবাদর্শের সলতে পাকাতে বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন, ঠিক তখনই মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরত্বে শাসক দলের এক ওজনদার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ড্রয়িংরুমে মঞ্চস্থ হচ্ছে অন্য এক অঙ্ক। লোকসভায় দেশের তৃতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জনই রাতারাতি শিবির বদলে দলত্যাগ-বিরোধী আইনের খাঁড়াকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাচ্ছেন। এই যে প্রকাশ্য দিবালোকে, আইন ও সংবিধানের নাকের ডগায় বসে একটি বিরোধী শক্তিকে খণ্ডবিখণ্ড করে দেওয়ার আস্ফালন, তা ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে কোনও নতুন ঘটনা না হলেও, এর প্রকাশ্য নির্লজ্জতা ও ‘টাইমিং’ অবশ্যই এক নতুন দেউলিয়াগ্রস্ততার ইঙ্গিতবাহী।
আসন সংখ্যার ওজনে যে দল দিল্লির রাজনীতিতে এত বড় ‘ফ্যাক্টর’, তাকে এভাবে লোকসভার ভেতরে দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ-সহ রাতারাতি এনডিএ শিবিরের ঝুলিতে পুরে নেওয়া – একে কি তবে আধুনিক ভারতের নতুন ‘চাণক্য নীতি’ বলে কুর্নিশ করতে হবে? রাজনীতির ব্যাকরণে নৈতিকতা ও অনৈতিকতার যে সূক্ষ্ম সীমারেখা থাকে, বর্তমান দিল্লির শাসকেরা তা কি চিরতরে মুছে দিতে চাইছেন? ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দেশের আপামর জনতা কোনও একক দলকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয়নি; এক ভগ্ন জনাদেশের উপর দাঁড়িয়েই গত দুই বছর চলছে এনডিএ সরকার। এই সংখ্যাগত ‘অনিরাপত্তা’ ও গদি বাঁচানোর মরিয়া তাগিদ থেকেই সম্ভবত এই দল ভাঙানোর রাজসূয় যজ্ঞের অবতারণা। ২৪০ আসনের ক্ষতে প্রলেপ লাগিয়ে সংখ্যাটিকে ২৬০ পার করাই যখন একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন লোকলজ্জা বা শালীনতার বালাই বিসর্জন দেওয়াই দস্তুর। ফলে, ‘বিপদকে সুযোগে রূপান্তর’ করার এই যে চাতুর্য, তা আসলে এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটেরই নামান্তর।
তবে এই গোটা নাট্যের সর্বাপেক্ষা কৌতুকাবহ অধ্যায়টি হলো এর মনস্তাত্ত্বিক লক্ষ্যবিন্দু। ঘর ভাঙল মমতার, অথচ দিল্লির রাজপথে রাতারাতি হোর্ডিং টাঙিয়ে চরিত্রহনন করা হলো রাহুল গান্ধীর! এই বৈপরীত্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে শাসকের আসল মনস্তত্ব। যে আঞ্চলিক দলগুলির রাজনীতি কেবলমাত্র ক্ষমতার ‘দখল’ এবং আঞ্চলিক দুর্গের অহংকারের উপর টিকে আছে, কেন্দ্রীয় এজেন্সির ভয় বা ক্ষমতার টোপ দিয়ে তাদের ভাঙা যতখানি সহজ, এক সর্বভারতীয় ভাবাদর্শের মেরুদণ্ডকে বাঁকানো ততখানি সহজ নয়। তাই আসল প্রতিপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিক ভাবে পর্যুদস্ত করতেই এই আয়োজন। কিন্তু এই আঞ্চলিক দলগুলির শীর্ষনেতৃত্বও কি তাদের দায় এড়াতে পারেন? একদা যারা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষতার অগ্রদূত ভেবে প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার সাজছিলেন, আজ তাদের তাসের ঘর বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ ছাড়াই ভেঙে পড়ছে। ইতিহাসের অমোঘ শিক্ষা এই যে, সুনির্দিষ্ট আদর্শগত মেরুদণ্ড ব্যতীত কেবল ক্ষমতার পিঠ চাপড়ানি দিয়ে দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসকের মোকাবিলা করা যায় না।
সর্বাপেক্ষা উদ্বেগের বিষয় হলো, এই তামাশায় দেশের সর্বোচ্চ বিচারব্যবস্থার একাংশের উদাসীনতা। যখন ‘স্পেশাল ইনটেনসিভরিভিশন’-এর নামে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের নাম বাদ দেওয়ার মতো গুরুতর নির্বাচনি জালিয়াতির অভিযোগ সুপ্রিম কোর্টের দরজায় কড়া নাড়ে, তখন যদি আদালত সেটিকে লঘু করে দেখার বার্তা দেয়, তবে আমজনতার শেষ ভরসাটুকুও টলে যায়। নির্বাচনি গণতন্ত্রকে যখন একদিকে অর্থ ও বাহুবল দিয়ে এবং অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা দিয়ে গ্রাস করা হচ্ছে, তখন কেবল ড্রয়িংরুমের বৈঠক বা সুবিধাবাদী জোট দিয়ে এই স্রোত আটকানো অসম্ভব। যতক্ষণ না এই সুবিধাবাদের রাজনীতি ত্যাগ করে এক আপসহীন, দীর্ঘমেয়াদি গণ-আন্দোলন ও বিকল্প ভাবাদর্শ দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে, ততক্ষণ দিল্লির রঙ্গমঞ্চে এই অলীক চাণক্যদের পৌষমাস চলতেই থাকবে, আর আমজনতার কপালে জুটবে কেবলই এক অন্তহীন সর্বনাশ।
এক্ষণে প্রশ্ন থাকে, এই নৈতিক দেউলিয়াগ্রস্ততার শেষ কোথায়? ক্ষমতার অলিন্দে সংখ্যার এই দম্ভ কি শেষ পর্যন্ত ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক আত্মাকেই খণ্ডবিখণ্ড করে দেবে না? যে বিচারব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলির কাজ ছিল গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী হওয়া, তারা যদি এই প্রকাশ্য নিলামে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে, তবে নাগরিকের শেষ আস্থাটুকু বাঁচবে কাকে অবলম্বন ধরে? ক্ষমতার এই রাজসূয় যজ্ঞের অবসানে ইতিহাস এই নির্বাক উদাসীনতাকেও ক্ষমা করবে কি না, সে উত্তর আপাতত কালের গর্ভে।