শুক্রবার | ০৫ জুন ২০২৬

দক্ষিণ ভারতের বার্তা—‘কংগ্রেস এখনও ফ্যাক্টর’!!

 দক্ষিণ ভারতের বার্তা—‘কংগ্রেস এখনও ফ্যাক্টর’!!

ভারতের রাজনীতিতে একটি অদ্ভুত অভ্যাস তৈরি হয়েছে গত এক দশকে। বিজেপি জিতলেই বলা হয়, ইতিহাসের শেষ অধ্যায় লেখা হয়ে গেল। বিরোধীরা হারলেই ঘোষণা হয়ে যায়, তাদের রাজনৈতিক মৃত্যু ঘটেছে। অথচ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সত্যটি হল-রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই।

এক সময় মনে হয়েছিল, কংগ্রেস নামক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানটি বুঝি ইতিহাসের জাদুঘরে জায়গা নিতে চলেছে। দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল, স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তরাধিকারী, সংবিধান নির্মাণের অন্যতম কারিগর- সেই দলটিই যেন নিজের ছায়ার সঙ্গে লড়াই করছিল। একের পর এক নির্বাচনি পরাজয়, সাংগঠনিক অবক্ষয়, নেতৃত্বের সংকট এবং আঞ্চলিক দলগুলির উত্থান কংগ্রেসকে এমন জায়গায় ঠেলে দিয়েছিল, যেখানে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন- বিজেপির বিরুদ্ধে জাতীয় স্তরে লড়াই করার মতো শক্তি কি আর তাদের হাতে আছে?

নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই। তিনি শুধু বিজেপিকে শক্তিশালী করেননি, বিরোধীদের দুর্বলতাকেও রাজনৈতিক
অস্ত্রে পরিণত করেছেন। একদিকে তিনি কংগ্রেসমুক্ত দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আবার পাশাপাশি আঞ্চলিক বিরোধী দলগুলোকে দিয়ে কংগ্রেসকে হীনবল করতে এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, যেখানে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই মানেই প্রায় অসম্ভব যুদ্ধ। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, বিপুল অর্থবল, সাংগঠনিক দক্ষতা, প্রচারযন্ত্র এবং ব্যক্তিনির্ভর জনপ্রিয়তা-সব মিলিয়ে বিজেপি যেন এক অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।

কিন্তু ভারতবর্ষ কোনও দিনই একরঙা রাজনৈতিক ভূখণ্ড নয়। এই দেশ যতটা দিল্লির, ততটাই বেঙ্গালুরু, হায়দ্রাবাদ, তিরুবনন্তপুরম, চেন্নাই কিংবা কলকাতার। আর সেই কারণেই আজ দক্ষিণ ভারত দেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

দক্ষিণ ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট- বিজেপি অপরাজেয় নয়, আর কংগ্রেসও মৃত নয়। যদিও গত নির্বাচনে কর্ণাটকে কংগ্রেসের প্রত্যাবর্তন ছিল সূচনা। তেলেঙ্গানায় ক্ষমতা দখল সেই বার্তাকে শক্তিশালী করেছে। আর এবার কেরলে ক্ষমতায় ফেরা সেই ধারাবাহিকতাকে প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এই সাফল্য কোনও আবেগের ঢেউ নয়। এটি সুপরিকল্পিত সাংগঠনিক পুনর্গঠনের ফল।

কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় রোগ ছিল সিদ্ধান্তহীনতা। দলের ভেতরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব থাকত, কিন্তু সমাধান আসত না। নেতৃত্বের প্রশ্নে অস্পষ্টতা থাকত, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস দেখা যেত না। কর্ণাটকে ডি কে শিবকুমারকে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসানোর সিদ্ধান্ত সেই পুরনো সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।

শিবকুমার শুধু একজন মুখ্যমন্ত্রী নন। তিনি কংগ্রেসের কাছে একটি রাজনৈতিক প্রতীক। ডি কে শিবকুমারকে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসানোর সিদ্ধান্তকে শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি কংগ্রেসের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বহু বছর ধরে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, দলের নেতৃত্ব বাস্তব রাজনীতির চেয়ে দরবারি সংস্কৃতিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। মাঠে লড়াই করা নেতার চেয়ে দিল্লির করিডরে প্রভাবশালীরাই বেশি গুরুত্ব পান। শিবকুমারের উত্থান সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার চাপ, জেলযাত্রা- সবকিছুর মধ্যেও যিনি দল ছাড়েননি, শেষ পর্যন্ত তিনিই পুরস্কৃত হয়েছেন। এই বার্তাটি শুধু কর্ণাটকের জন্য নয়; গোটা দেশের কংগ্রেস কর্মীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বার্তা একটাই- যারা মাঠে লড়াই করবে, দলকে বিপদের দিনে বাঁচাবে, তারাই পুরস্কৃত হবে। দিল্লির দরবারে ঘোরাফেরা নয়, মাটির রাজনীতিই শেষ কথা।

বিজেপির কাছে এই বার্তাটি আরও অস্বস্তিকর।
কারণ বিজেপি এতদিন ধরে বিরোধীদের মধ্যে নেতৃত্বের সংকট, বিভাজন এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়েছে। কংগ্রেস দুর্বল থাকলে বিজেপির সুবিধা ছিল দ্বিগুণ। একদিকে জাতীয় স্তরে প্রধান প্রতিপক্ষকে দুর্বল রাখা, অন্যদিকে আঞ্চলিক দলগুলিকে একে অপরের বিরুদ্ধে খেলা। কিন্তু সাম্প্রতিক ভারতীয় রাজনীতির কিছু ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়ে দিয়েছে, কংগ্রেস যদি নিজের সংগঠনকে পুনর্গঠন করতে পারে, তবে বিজেপির বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই এখনও সম্ভব। আর এখানেই শুরু
হচ্ছে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নতুন অস্বস্তি।

লোকসভা নির্বাচনের পর অনেক আঞ্চলিক নেতা মনে করেছিলেন, কংগ্রেসকে ছাড়াই বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দ্যাপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তেজস্বী যাদব, এমনকী কিছু ক্ষেত্রে স্ট্যালিনও জাতীয় বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রীয় মুখ হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু রাজনীতি নির্মম। যে দল নিজের রাজ্যে শক্তিশালী নয়, সে জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্ব দেয় কীভাবে? আজ পরিস্থিতি বদলেছে। কেউ নির্বাচনে পরাজিত, কেউ সাংগঠনিক চাপে বিপর্যস্ত, কেউ আবার রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন লড়াইয়ে খড়কুটো আঁকড়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে চলেছেন। সেই শূন্যস্থানেই ধীরে ধীরে ফিরে আসছে কংগ্রেস।

তবে কংগ্রেসের সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ বিজেপি নয়, আত্মতুষ্টি। দক্ষিণ ভারতে সাফল্য মানেই জাতীয় পুনর্জাগরণ নয়। ভারতের ক্ষমতার চাবিকাঠি এখনও উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট এবং মহারাষ্ট্রে। দক্ষিণে যতই জয় আসুক, হিন্দি বলয়ে সংগঠন পুনর্গঠন না হলে দিল্লির রাস্তা অধরাই থেকে যাবে। কংগ্রেসের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত একটি বিষয়- বিজেপিকে হারানোর শর্টকাট নেই। রাহুল গান্ধী বারবার মতাদর্শের লড়াইয়ের কথা বলেন। তিনি ভুল নন। বিজেপির সঙ্গে লড়াই আদর্শেরও লড়াই। কিন্তু শুধু মতাদর্শ দিয়ে নির্বাচন জেতা যায় না। বুথ কমিটি, পঞ্চায়েত, ওয়ার্ড, ব্লক- গণতন্ত্রের প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্র সেখানেই।
দক্ষিণ ভারতে কংগ্রেস সেই যুদ্ধ লড়েছে। উত্তর ভারতে এখনও সেই প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ। তবুও এই মুহূর্তে দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক বার্তাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

কারণ এটি শুধু একটি দলের সাফল্যের গতিপথ নির্ণয়ের দিকনির্দেশনা নয়। এটি ভারতের গণতন্ত্রের ভারসাম্য ফিরে পাওয়ার বার্তা। গণতন্ত্রে শক্তিশালী সরকারের প্রয়োজন আছে। কিন্তু তার থেকেও বেশি প্রয়োজন শক্তিশালী বিরোধী পক্ষের। বিরোধীহীন রাজনীতি কখনও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না। বরং ধীরে ধীরে ক্ষমতাকে প্রশ্নাতীত করে তোলে।

এক দশক ধরে ভারতীয় রাজনীতিতে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি ঘুরে বেড়িয়েছে, তা হল- বিজেপির বিকল্প কে? দক্ষিণ ভারত সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি। কিন্তু অন্তত এটুকু জানিয়েছে, উত্তরটি এখনও কংগ্রেস হতে পারে। আর সেই সম্ভাবনাই আজ দিল্লির ক্ষমতার করিডরে সবচেয়ে বড় অস্বস্তির কারণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *