১২ বছরের হিসাব-নিকাশ: উন্নয়নের গল্পের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও!!
বেমিসাল বারা সাল’ বা নজিরবিহীন ১২ বছর। আগামী এক মাস এই প্রচার নিয়ে গোটা দেশে দলকে মাঠে নামার নির্দেশ বে দিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন। ৯ জুন থেকে ৯ জুলাই দেশজুড়ে প্রচারাভিযানে নামতে চলেছে দল। পশ্চিমবঙ্গ সহ সাম্প্রতিক ৫ রাজ্যের নির্বাচনে বড় সাফল্যের পর বিজেপি এই ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করতেই পারে।
বেমিসাল ১২ সাল। নরেন্দ্র মোদি কিংবা নিতিন নবীনদের কাছে এটা নির্বাচিত স্লোগান। অর্থাৎ, এমন ১২ বছর, যার তুলনা নেই। দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। রাজনৈতিক প্রচারে এই ধরনের দাবি নতুন নয়। প্রতিটি সরকারই নিজের সাফল্যের কাহিনি রচনা করতে চায়। কিন্তু গণতন্ত্রে শেষ কথা বলে প্রচারের পোস্টার নয়, জনগণের অভিজ্ঞতা। বিজ্ঞাপনের ভাষা নয়, বাস্তবের হিসাব। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে- আদৌ কি গত ১২ বছর ‘বেমিসাল’? দেশের সাধারণ মানুষ কি সত্যিই সেই অভিজ্ঞতার সাক্ষী? নাকি এই ১২ বছরের গল্পের আড়ালে জমে রয়েছে মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, আয় বৈষম্য এবং ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার আর এক ভারত?
নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি প্রথম ক্ষমতায় আসে ২০১৪ সালে। তখন দেশের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল ‘আচ্ছে দিন’-এর প্রতিশ্রুতি। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, বছরে দু’কোটি কর্মসংস্থান, কালো টাকা উদ্ধার, কৃষকের আয় দ্বিগুণ, অর্থনীতির দ্রুত বিকাশ- একের পর এক উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতিতে ভর করে তৈরি হয়েছিল প্রবল জনসমর্থন। সেই সমর্থনই বিজেপিকে টানা তিন বার কেন্দ্রে ক্ষমতায় ফিরিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক বিচারে মোদি যুগ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে কংগ্রেস-পরবর্তী যুগে কোনও অ-কংগ্রেসি দল এত দীর্ঘ সময় ধরে এত শক্তিশালী অবস্থানে ছিল না। কিন্তু গণতন্ত্রে নির্বাচনি সাফল্য আর শাসনের সাফল্য এক জিনিস নয়।
গত ১২ বছরে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। পরিকাঠামো নির্মাণে নজিরবিহীন গতি এসেছে। জাতীয় সড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দর, রেল আধুনিকীকরণ, ডিজিটাল পেমেন্ট, মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার- এসব ক্ষেত্রে ভারতের অগ্রগতি অস্বীকার করার উপায় নেই। আজ গ্রামের মানুষও ইউপিআইয়ের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করছেন। কোটি কোটি পরিবার বিদ্যুৎ, শৌচাগার, গ্যাস সংযোগ এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের আওতায় এসেছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ভারতের উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। জি-২০ সম্মেলনের আয়োজন থেকে শুরু করে ভূরাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা- মোদি সরকারের কূটনৈতিক সাফল্যও কম নয়। কিন্তু এই ছবির অন্য দিকটাও কি সমান উজ্জ্বল?
দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি হল আয়ের বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং জীবনযাত্রার মান। সেই জায়গায় প্রশ্নের সংখ্যা উত্তরকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। গত এক দশকে ভারতের অর্থনীতি বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই বৃদ্ধির সুফল কতটা সমানভাবে পৌঁছেছে?
আজ দেশের এক বিরাট অংশের যুবক-যুবতী কর্মসংস্থানের জন্য হাহাকার করছেন। সরকারি চাকরির পরীক্ষায় কয়েক হাজার পদের জন্য লক্ষ লক্ষ আবেদন জমা পড়ছে। রেলের সামান্য কয়েকটি শূন্যপদের জন্য আবেদনকারীর সংখ্যা অনেক সময় ছোটখাটো শহরের জনসংখ্যাকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একাংশ ডিগ্রি হাতে নিয়েও উপযুক্ত কাজ পাচ্ছেন না। যে দেশে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ নতুন কর্মপ্রার্থী শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন, সেখানে কর্মসংস্থানের প্রশ্ন এখনও সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তার সঙ্গে জুড়েছে মূল্যবৃদ্ধির কষাঘাত।
সরকারি পরিসংখ্যান হয়তো বলবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু বাজারে গিয়ে চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, দুধ, রান্নার গ্যাস বা ওষুধের দাম জিজ্ঞেস করলে অন্য ছবি ধরা পড়ে। পরিসংখ্যানের মুদ্রাস্ফীতি আর সংসারের মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে ব্যবধান বিশাল। মধ্যবিত্তের সঞ্চয় কমছে, নিম্নবিত্তের সংসার টানাটানি বাড়ছে। যাঁরা প্রতিদিনের আয়ে সংসার চালান, তাঁদের কাছে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার নয়, বাজারের থলির ওজনই বাস্তব।
রান্নার গ্যাসের দাম এই দশকে বহুবার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। উজ্জ্বলা প্রকল্পের মাধ্যমে কোটি কোটি পরিবার গ্যাস সংযোগ পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে রিফিলের খরচ বহন করাই কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে সংযোগ থাকলেও ব্যবহারের হার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।একইভাবে পেট্রোল-ডিজেলেরউচ্চ মূল্য পরিবহণ ব্যয় বাড়িয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে প্রায় সব পণ্যের উপর।আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল আয় বৈষম্য।
ভারতের অর্থনীতি বেড়েছে, কিন্তু সেই সম্পদের কতটা উপরে জমা হয়েছে? বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষা এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বারবার উঠে এসেছে যে দেশের ধনীতম অংশের হাতে সম্পদের ঘনত্ব দ্রুত বেড়েছে। একদিকে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষ এখনও সরকারি রেশন, বিনামূল্যের খাদ্যশস্য এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু তার বণ্টন নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
কৃষিক্ষেত্রও এই বিতর্কের বাইরে নয়। কৃষক সম্মান নিধির মতো প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন খরচ, ফসলের দাম, ঋণের বোঝা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কৃষকদের উদ্বেগ কমাতে পারেনি। কৃষি আইন নিয়ে দীর্ঘ আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের আইন প্রত্যাহার- এই ঘটনাই দেখিয়ে দিয়েছে যে গ্রামীণ ভারতের অসন্তোষকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা যায় না।
তবে বিজেপির সমর্থকেরা পাল্টা প্রশ্ন তুলবেন- কোভিড-১৯ মহামারির মতো অভূতপূর্ব সংকটের মুখেও ভারত তুলনামূলক দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বহু দেশ যখন অর্থনৈতিক মন্দার সঙ্গে লড়ছে, তখন ভারত এখনও বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলির অন্যতম। এই যুক্তিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রে সরকারের মূল্যায়ন হয় বিজ্ঞাপনের ভাষায় নয়, মানুষের অভিজ্ঞতায়। রাষ্ট্রের সাফল্যের তালিকা যত দীর্ঘই হোক, যদি একজন যুবক চাকরি না পান, যদি একজন কৃষক ন্যায্য মূল্য না পান, যদি একজন গৃহবধূ প্রতিদিনের বাজারে হিমশিম খান, তাহলে তাঁর কাছে ‘বেমিসাল’ শব্দটির অর্থ ভিন্ন হবে।
তাই ১২ বছরের এই মূল্যায়ন একরৈখিক নয়। এটি একই সঙ্গে সাফল্য এবং সীমাবদ্ধতার গল্প। একদিকে দ্রুত পরিকাঠামো নির্মাণ, ডিজিটাল বিপ্লব এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে ভারতের উত্থান; অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সংকট, মূল্যবৃদ্ধির চাপ এবং ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের বাস্তবতা।
শাসক দল চাইতেই পারে এই সময়কে ‘বেমিসাল’ বলতে। কিন্তু ইতিহাসের আদালতে কোনও সরকারের সার্টিফিকেট সরকার নিজে দেয় না। সেই রায় লেখেন নাগরিকেরা। বাজারে দাঁড়ানো ক্রেতা, চাকরির লাইনে অপেক্ষারত
যুবক, ঋণের বোঝায় নুয়ে পড়া কৃষক, কিংবা উন্নয়নের সুফল পাওয়া নতুন মধ্যবিত্ত- সকলের অভিজ্ঞতা মিলিয়েই তৈরি হয় প্রকৃত মূল্যায়ন। সেই মূল্যায়ন এখনও চলমান। তাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- ‘বেমিসাল ১২ সাল’ কি সত্যিই ভারতের জনগণের অভিজ্ঞতার ভাষা, নাকি তা কেবল রাজনৈতিক প্রচারের এক আকর্ষণীয় স্লোগান?