যেখানে পরীক্ষাও আর নির্ভরযোগ্য নয়!!
ভারতের মধ্যবিত্ত পরিবারে একটি ডাক্তারি আসন সামাজিক উত্তরণের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের নাম নিট। আর সেই স্বপ্নই আজ পরিণত হয়েছে অবিশ্বাস, আতঙ্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণার এক ভয়ঙ্কর প্রতীকে।
নিট-ইউজি ২০২৬ প্রশ্নপত্র ফাঁস কাণ্ড নিয়ে মোদি সরকারের অবস্থান এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে ব্যর্থতার থেকেও বড় হয়ে উঠেছে দায় অস্বীকারের প্রবণতা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হল, এই কেলেঙ্কারিতে সরকারের বক্তব্য আর সরকারের অধীনস্থ সংস্থার বক্তব্য একে অপরকে কার্যত খণ্ডন করছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, “চেইন অফ কম্যান্ডে গলদ” ছিল। তিনি ‘শিক্ষা মাফিয়া’, ‘সংগঠিত চক্র’- এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ সরকার নিজেই মানছে, গোটা পরীক্ষাব্যবস্থার ভিতরে ভয়ঙ্কর পচন ধরেছে।
কিন্তু তার পরেই এনটিএ-র শীর্ষকর্তার দাবি- “সিস্টেম থেকে প্রশ্নফাঁস হয়নি”। এই বক্তব্য নিছক আত্মরক্ষার চেষ্টা নয়, এটি এক বিপজ্জনক আমলাতান্ত্রিক কৌশল। যেন বলা হচ্ছে, সার্ভার হ্যাক হয়নি, তাই আমরা নির্দোষ! যেন পরীক্ষাব্যবস্থা বলতে শুধুমাত্র একটি কম্পিউটার সার্ভার। প্রশ্নপত্র কে ছাপাল, কোথায় রাখা হল, কীভাবে পরিবহণ হল, কোন্ স্তরে তা বাইরে বেরিয়ে গেল-এই পুরো শৃঙ্খলটাই তো একটি পরীক্ষার সিস্টেম। সেই শৃঙ্খল ভেঙেই যখন প্রশ্নপত্র কোটি টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তখন ‘সিস্টেম অক্ষত’ বলাটা আসলে সাধারণ মানুষের বুদ্ধিকে অপমান করা।
এই কাণ্ডে সবচেয়ে ভয়াবহ হল রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। প্রশ্নফাঁসের মতো অপরাধে প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল সম্পূর্ণ স্বচ্ছ তদন্ত, দ্রুত দায় নির্ধারণ এবং ছাত্রছাত্রীদের আস্থা ফেরানো। কিন্তু তার বদলে দেখা যাচ্ছে, সরকার ও সংস্থার মধ্যে শুরু হয়েছে দায় ঠেলাঠেলি। শিক্ষামন্ত্রী দায় স্বীকার করছেন, এনটিএ দায় অস্বীকার করছে, আর সিবিআই গ্রেপ্তার করছে এনটিএ-র সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিকেই। এর নাম প্রশাসনিক বিভ্রান্তি নয়, এর নাম প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলা।
এখানে আরও বড় প্রশ্ন আছে। বছর বছর কেন প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে? শুধু নিট নয়- একের পর এক জাতীয় পরীক্ষায় একই চিত্র। কখনও রেল, কখনও শিক্ষক নিয়োগ, কখনও কেন্দ্রীয় প্রবেশিকা।যেন পরীক্ষাব্যবস্থা আজ দেশের বৃহত্তম কালোবাজারে পরিণত হয়েছে। যেখানে মেধার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে টাকা, মাফিয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাব।
সরকারের কাছে এই প্রশ্নের কোনও গ্রহণযোগ্য উত্তর নেই। কারণ, সমস্যাটি প্রযুক্তির নয়, সমস্যাটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার। যে দেশে শিক্ষা ক্রমশ কোচিং শিল্প, বেসরকারি লবি এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক ব্যবসার হাতে বন্দি হয়ে পড়ে, সেখানে প্রশ্নফাঁস কেবল অপরাধ নয়- তা হয়ে ওঠে এক লাভজনক শিল্প। আর সেই শিল্পের সঙ্গে প্রশাসনের কোনও অংশ যুক্ত না থাকলে, বছরের পর বছর ধরে এত বড় চক্র চলতে পারে না।
সবচেয়ে করুণ অবস্থায় রয়েছে পরীক্ষার্থীরা। যাদের বয়স সতেরো-আঠারো, তারা আজ বুঝে যাচ্ছে এই দেশে শুধু পড়াশোনা যথেষ্ট নয়; ভাগ্য, অর্থ এবং ‘সেটিং’-ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরীক্ষার বাতিল হওয়া মানে শুধু কয়েক মাস সময় নষ্ট নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানসিক অবসাদ, সামাজিক চাপ, পারিবারিক হতাশা। ইতিমধ্যেই আত্মহত্যার খবর সামনে এসেছে। অথচ রাষ্ট্রের ভাষ্যে সেই যন্ত্রণা প্রায় অনুপস্থিত।
এই ঘটনার পর কেন্দ্র যদি সত্যিই নিটকে পুরোপুরি অনলাইন পরীক্ষায় রূপান্তর করার পথে হাঁটে, তবে সেটি কার্যত অফলাইন ব্যবস্থার ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি। কিন্তু প্রশ্ন হল, ফরম্যাট বদলালেই কি দুর্নীতি বন্ধ হবে? যে ব্যবস্থায় দায় এড়ানোই প্রথম প্রতিক্রিয়া, সেখানে প্রযুক্তি কেবল নতুন মুখোশ হয়ে উঠতে পারে।
আজ নিট কেলেঙ্কারি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে এক নির্মম আয়না ধরেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলিও আর নির্ভরযোগ্য নয়। আর রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছাত্রছাত্রী নয়, নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা।
সমস্যা এখানেই। যখন সরকার ব্যর্থতাকে ‘টেকনিক্যাল গলদ’ বলে ছোট করতে চায়, তখন সাধারণ মানুষ বুঝে যায়- ব্যবস্থার ভিতরে পচন অনেক গভীরে।