বৃহস্পতিবার | ১৪ মে ২০২৬

নিথর বিবেক

 নিথর বিবেক

ভারতীয় গণতন্ত্রের মহোৎসবে যখন রাজপথ থেকে আকাশপথ-সর্বএই প্রতিশ্রুতি রঙিন ফানুস উড়ছে, ঠিক তখনই একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে দেশজুড়ে।দেখা যায়,ওড়িশার কেওনঝাড় থেকে শুরু করে ছত্তিশগড়ের বিজাপুর পর্যন্ত এক দীর্ঘ ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে।সেই ছায়া কোনও প্রগতির নয়, বরং এক আদিম ও অমানবিক বঞ্চনার। জিতু মুন্ডা যখন তার দিদির কঙ্কালসার দেহ বস্তাবন্দি করে ব্যাঙ্কের দোরগোড়ায় হাজির হন, তখন তা কেবল একজন নিরুপায় ভাইয়ের আর্তনাদ থাকে না; তা হয়ে ওঠে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও তার আমলাতান্ত্রিক জড়তার মুখে এক সপাটে চড়। ১৯ হাজার ৪০২ টাকার অধিকার সাব্যস্ত করতে মৃতদেহ বহন, এই দৃশ্য কি কেবলই অভাবের, নাকি এক গভীরতর কাঠামোগত অন্ধত্বের?

প্রশ্নটি কেবল নথিপত্রের নয়, প্রশ্নটি সংবেদনশীলতার। ওড়িশা গ্রামীণ ব্যাঙ্ক নিয়মের দোহাই দিয়েছে। নিয়ম বলে, উত্তরাধিকার প্রমাণে শংসাপত্র চাই। কিন্তু যে প্রান্তিক জনজাতি সমাজ আজও অক্ষরপরিচয় ও নাগরিক সুবিধার আলোকবৃত্ত থেকে যোজন দূরে, তাদের কাছে এই আইনি মারপ্যাঁচ এক দুর্ভেদ্য প্রাচীরসম। ব্যাঙ্কের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে যারা ‘কেওয়াইসি’ বা ‘লিগাল হেয়ার সার্টিফিকেট’-এর খসড়া প্রস্তুত করেন, তারা সম্ভবত বিস্মৃত হন যে, নিয়ম মানুষের জন্য, মানুষ নিয়মের জন্য নয়। ভাইরাল ভিডিয়োয় জিতু মুন্ডার কাঁধের ওই বস্তাটি আসলে আমাদের তথাকথিত উন্নয়নের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে। যে রাজ্যে খোদ মুখ্যমন্ত্রী জনজাতি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, তদুপরি সেই কেওনঝাড় জেলারই বাসিন্দা, সেখানেও একজন মানুষকে দিদির মৃতদেহ খুঁড়ে বার করতে হয় কেবল ব্যাঙ্কের ম্যানেজারকে বিশ্বাস করাতে যে তার দিদি আর জীবিত নেই। এই ঘটনা শ্লেষের অতীত, এ ঘটনা চূড়ান্ত লজ্জার।

ইতিহাস অবশ্য নিষ্ঠুর পুনরাবৃত্তিতে অভ্যস্ত।আজ জিতু মুন্ডা যা করলেন, আট বছর আগে দানা মাঝি তা করেছিলেন কালাহান্ডিতে। স্ত্রীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে নাবালিকা কন্যাকে সঙ্গে করে দশ কিলোমিটার পথ হেঁটেছিলেন দানা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শববাহী যান দেয়নি, কারণ দানা মাঝির অর্থাগম ছিল না। দানা মাঝির সেই পদযাত্রা দেখে বিশ্ববিবেক শিউরে উঠেছিল। তৎকালীন নবীন পট্টনায়েক সরকার ‘মহাপ্রয়াণ’ প্রকল্প চালু করে পিঠ বাঁচিয়েছিল। কিন্তু আজ জিতু মুন্ডার ঘটনা প্রমাণ করল, প্রকল্পের নাম বদলালেও প্রান্তিক মানুষের হাড়ভাঙা খাটুনি আর হাড়কাঁপানো অপমান বিন্দুমাত্র কমেনি। আমাদের প্রশাসন ও সমাজ কেবল ‘ভাইরাল’ ভিডিয়োর অপেক্ষায় থাকে। ক্যামেরার লেন্স যখন দুর্ভাগ্যের উপর আলোকসম্পাত করে, তখনই কেবল সরকারি তড়িৎ-তৎপরতা শুরু হয়। নথিপত্র রাতারাতি তৈরি হয়, ক্ষতিপূরণ ঘোষিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, মৃতদেহ কেন প্রতিবারই অধিকার আদায়ের হাতিয়ার হবে?

কোভিড-লকডাউনের সেই বিভীষিকাময় দিনে বারো বছরের কন্যা জামলো মকদমের দেড়শো কিলোমিটার হাঁটা এবং অবশেষে তৃষ্ণার্ত ও অবসন্ন দেহে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি এক সুপরিকল্পিত উদাসীনতার পরিণাম। যে রাষ্ট্র উচ্চবিত্তের বিদেশ থেকে প্রত্যাবর্তন সুনিশ্চিত করতে তৎপর থাকে, সেই রাষ্ট্রই জামলোদের জঙ্গলপথে পশুর মতো হাঁটতে বাধ্য করে। মৃত্যুর পর এক লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ দিয়ে সেই অপরাধ স্খালনের চেষ্টা আসলে মৃতদেহের উপর রাজনীতির লেপন মাত্র।

গণতন্ত্রের আইপিএল মরসুমে নেতারা চপারে চক্কর কাটেন, পদযাত্রা করেন ভোট কুড়াতে। আর জিতু মুন্ডা, দানা মাঝি বা জামলোরা হাঁটেন কেবল অস্তিত্বের টানে, নতুবা স্বজনের সম্মান রক্ষার্থে। এই দুই হাঁটার ব্যবধানই বলে দেয়, ভারতবর্ষ আসলে কোন তিমিরে দাঁড়িয়ে। নথিপত্র আর নিয়মের জালে যে মানবিকতা আজ বন্দি, তার মুক্তি কি আদৌ সম্ভব? যদি না হয়, তবে এই উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের আস্ফালন নিরর্থক। জিতু মুন্ডার দিদির কঙ্কাল আসলে আমাদের বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোরই কঙ্কালসার রূপটি উন্মোচিত করে দিয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, জিতু মুন্ডা কিংবা দানা মাঝিরা এই রাষ্ট্রের কাছে কোনও নাগরিক নন, বরং কিছু পরিসংখ্যান মাত্র। রাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে তার অপরাধ ঢাকবার চেষ্টা করে বটে, কিন্তু যে সমাজ ও প্রশাসন একজন মানুষকে কঙ্কাল বহন করতে বাধ্য করে, তার নৈতিক দেউলিয়া দশা ঢাকবার মতো আবরণ আজও আবিষ্কৃত হয়নি। প্রশ্ন থেকে যায়, আর কতগুলি মৃতদেহ মিছিল করে রাজপথে নামলে তবেই আমাদের ব্যবস্থার এই ‘নিথর বিবেক’ সজল হবে মানবিকতা কি তবে কেবল অভিধানের শব্দ হয়েই থাকবে, নাকি কোনওদিন এই দুর্ভাগা জনপদগুলির রূঢ় বাস্তবকে স্পর্শ করা সাহস সঞ্চয় করবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *