বৃহস্পতিবার | ০৭ মে ২০২৬

রূপান্তরের সংকেত

 রূপান্তরের সংকেত

ভারতের রাজনীতির মানচিত্রে এক নীরব, কিন্তু গভীর পরিবর্তন ঘটে চলেছে-আঞ্চলিক শক্তির ধীরে ধীরে অবক্ষয় এবং জাতীয়স্তরে দ্বিমুখী রাজনৈতিক কাঠামোর উত্থান। এই পরিবর্তন হঠাৎ নয়; বরং গত তিন দশকের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংগঠনিক রূপান্তরের ধারাবাহিক ফল।

ষাটের দশকের শেষ থেকে শুরু হওয়া আঞ্চলিক রাজনীতির উত্থান একসময় ভারতের গণতন্ত্রকে এক নতুন ভারসাম্য দিয়েছিল। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে বিভিন্ন রাজ্যে ভাষা, সংস্কৃতি, জাতিগত পরিচয় এবং স্থানীয় সমস্যাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি। দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগাম, অল ইন্ডিয়া আন্না ডিএম কে, সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজবাদী পার্টি, অসম গণ পরিষদ, রাষ্ট্রীয় জনতা দল, বিজু জনতা দল কিংবা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস-এই দলগুলো শুধু রাজ্য রাজনীতিতেই নয়, কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। জোট সরকার, দরকষাকষির রাজনীতি এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা- সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল এই আঞ্চলিক শক্তিগুলো।

কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই শক্তির ভিতেই এখন চিড় ধরছে। কেন?প্রথমত, জাতীয় রাজনীতির ‘প্রেসিডেন্সিয়ালাইজেশন’। ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতীয় জনতা পার্টির উত্থান এবং নরেন্দ্র মোদিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ব্যক্তিনির্ভর রাজনৈতিক বয়ান নির্বাচনি রাজনীতিকে অনেকটাই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বমুখী করে তুলেছে। ভোটারদের একাংশ এখন রাজ্যের ইস্যুর চেয়ে জাতীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থা বা অনাস্থার ভিত্তিতে ভোট দিচ্ছেন। ফলে স্থানীয় দলগুলোর প্রাসঙ্গিকতা কমে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, সংগঠনের প্রশ্ন। বহু আঞ্চলিক দলই ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের উপর নির্ভরশীল। উত্তরাধিকার, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং নেতৃত্বের অভাব তাদের দুর্বল করে তুলছে। যেখানে একটি সর্বভারতীয় দল বহুমাত্রিক সাংগঠনিক কাঠামো, বিপুল অর্থবল এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারযন্ত্র নিয়ে মাঠে নামছে, সেখানে আঞ্চলিক দলগুলো প্রায়শই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক বয়ানের পরিবর্তন। একসময় স্থানীয় পরিচয়ই ছিল রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু- ভাষা, জাত, অঞ্চল। এখন সেই জায়গা ক্রমশ দখল করছে বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী বয়ান, যার সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ও জড়িয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন আঞ্চলিক দলগুলোর জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, কারণ তাদের মূল শক্তিই ছিল স্থানীয়তার ভিত।

চতুর্থত, কেন্দ্রীয় সম্পদের প্রভাব। ক্ষমতাসীন জাতীয় দল যখন কেন্দ্র ও একাধিক রাজ্যে ক্ষমতায় থাকে, তখন প্রশাসনিক এবং আর্থিক সুবিধার প্রশ্নে এক ধরনের ‘অ্যাসিমেট্রি’ তৈরি হয়। বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলোর পক্ষে সেই সমীকরণের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের রাজনীতি ক্রমশ এক দ্বিমুখী কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে- একদিকে শক্তিশালী ভারতীয় জনতা পার্টি, অন্যদিকে পুনরুজ্জীবনের লড়াইয়ে থাকা জাতীয় কংগ্রেস। আঞ্চলিক দলগুলো কোথাও কোথাও এখনও প্রাসঙ্গিক- তামিলনাড়ু বা তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যে তারা শক্তিশালী- কিন্তু সর্বভারতীয় প্রভাবের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান স্পষ্টতই সংকুচিত। তবে এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে ইতিবাচক- এমন বলা যাবে না। আঞ্চলিক দলগুলোর উপস্থিতি ভারতের বহুত্ববাদী গণতন্ত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষা করত। তারা কেন্দ্রীয় ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখত, স্থানীয় সমস্যাকে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসত এবং রাজ্যগুলোর স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। সেই জায়গা দুর্বল হলে কেন্দ্রীকরণের ঝুঁকি বাড়ে।

অন্যদিকে, দ্বিমুখী রাজনীতি স্থিতিশীলতা আনতে পারে- স্পষ্ট ম্যান্ডেট, শক্তিশালী সরকার, দ্রুত সিদ্ধান্ত। কিন্তু তার বিনিময়ে যদি বহুমতের প্রতিনিধিত্ব কমে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের গভীরতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। কার্যত এবারের ৫ রাজ্যের নির্বাচন, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ফলাফল, বৃহত্তর ভারতীয় রাজনীতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গের মতো ঐতিহ্যগতভাবে উদারপন্থী রাজ্যে একটি ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী বয়ানের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে- এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক বড় পরিবর্তন। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক দলগুলোর প্রভাব ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে- এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হলো। বিহার, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব কিংবা উত্তরপ্রদেশ- বিভিন্ন রাজ্যে একই ধারা দেখা যাচ্ছে, যেখানে স্থানীয় শক্তিগুলো ধীরে ধীরে জায়গা হারাচ্ছে সর্বভারতীয় দলগুলোর কাছে। ফলে ভারতের রাজনীতি ক্রমেই এক দ্বিমুখী কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে- একদিকে শক্তিশালী বিজেপি, অন্যদিকে দুর্বল হলেও জাতীয় উপস্থিতি থাকা কংগ্রেস। এই ‘বাইপোলার’ রাজনীতির মধ্যে আঞ্চলিক দলগুলোর জায়গা কতটা থাকবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

পশ্চিমবঙ্গের এই ফলাফল তাই শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি এক বৃহত্তর রাজনৈতিক রূপান্তরের সংকেত, যার প্রভাব আগামী দিনে ভারতের গণতন্ত্রের চরিত্রকেই নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।

ভারতের সামনে তাই এখন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রশ্ন- স্থিতিশীলতা বনাম বৈচিত্র্য, কেন্দ্রীয় শক্তি বনাম আঞ্চলিক স্বর। আঞ্চলিক রাজনীতির পতন যদি একেবারেই অনিবার্য হয়ে ওঠে, তাহলে সেই শূন্যতা কে এবং কীভাবে পূরণ করবে? আর যদি দ্বিমুখী রাজনীতি স্থায়ী রূপ নেয়, তাহলে তার মধ্যে কতটা জায়গা থাকবে ভারতের বহুবর্ণ বাস্তবতার জন্য? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দশকের ভারতীয় গণতন্ত্রের চরিত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *