বুধবার | ০৬ মে ২০২৬

অর্থনৈতিক বিশ্বযুদ্ধ

যুদ্ধবিরতির পর কি হবে?এই নিয়ে একটি উদ্বেগ আশঙ্কা রয়ে গেছে সর্বত্র। বিশেষত,হরমুজ প্রণালীর রুদ্ধতায় এই উদ্বেগ এখন সীমাহীন হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির প্রথম দফার মেয়াদ শেষে দ্বিতীয়বার অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। উদ্দেশ্য একটাই একটি স্থায়ী চুক্তি সম্পাদন করা। ইরান মুখোমুখি বৈঠকে বসে যে সব শর্ত দিয়েছে তার অধিকাংশ বিষয় নিয়ে মতৈক্য হলেও পরমাণু ক্ষমতা নিয়ে ইরানের দাবি মানতে নারাজ আমেরিকা। ফলে বৈঠক সিদ্ধান্তহীন রয়ে গেছে। এর পরেও পাকিস্তান, মিশরের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলি স্থায়ীভাবে যুদ্ধ অবসানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ট্রাম্পের হুমকি বারবার পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে। ইরানও চুপ করে নেই, ট্রাম্পের হুমকির চেয়ে বড়সড় হুমকি পাঠানোই তাদের এখন বড় কাজ। অবশ্য কারণও আছে। ট্রাম্পের দুই দুই বারের যুদ্ধবিরতির কোনওটাতেই ইরানের কোনও মতামত বা আগ্রহ ছিল না। বরং ইরান প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত আমেরিকার যুদ্ধবিরতিকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তারা মনে করছে, আরও একটি আক্রমণের জন্য আমেরিকা কালক্ষেপ করে শক্তি সঞ্চয় করছে।

এ কথা ঠিক যে ট্রাম্পের এই সব বিরতিমূলক সিদ্ধান্তকে কেবল শান্তির চেষ্টা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে আরও গভীর কোনো কারণ থাকবে। এটি মূলত ওয়াশিংটনের সামরিক কৌশলের ব্যর্থতা। ইরানকে ভয় দেখিয়ে বশ করা যাচ্ছে না। আবার ইরানের ওপর শক্তি খাটানো আমেরিকার জন্য এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। ট্রাম্পের বিরতির ঘোষণা আসলে আমেরিকার সেই অসহায়তাকেই ফুটিয়ে তুলেছে। যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে হোয়াইট হাউস আসলে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করল। তারা বুঝে গেছে, এখন আর গায়ের জোরে সব শর্ত চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই উপসাগরের যুদ্ধবিরতিকে সমর বিশেষজ্ঞরা একধরনের কৌশলগত পিছুটান বলতে শুরু করেছেন। যুদ্ধের বিভিন্ন দিক পরীক্ষা করে আমেরিকা বুঝেছে, এই যুদ্ধে তাদের জেতার সম্ভাবনা খুবই কম। ইরানের পাল্টা হামলা চালানোর সক্ষমতা মারাত্মক। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলির শক্তিও অনেক বেশি। ফলে এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এই বিশাল চাপ সামলানো এখন ওয়াশিংটনের জন্য অসম্ভব। দেশের আইনসভা, বিচারসভা কেউ ট্রাম্পকে সমর্থন করছে না।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে অর্থাৎ হামলার প্রথম দিন থেকেই আমেরিকা চাইছে যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে ইরানের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে অচল করে দিতে। কিন্তু এই কৌশল কাজ করছে না। কারণ, পরিস্থিতি আগের মতো নেই। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে ইরানের সরাসরি প্রভাব খাটানোর সক্ষমতা আছে। সেই দিক থেকে আমেরিকা কেবল সরবরাহ গ্রহণ করে থাকে। মার্কিনীদের যুদ্ধের অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অনেক সময় নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সাময়িক বিরতি নেয়। এই যুদ্ধবিরতির আড়ালে আমেরিকা বা তার মিত্ররা কোনো গোপন হামলা চালাতে পারে। ইরান এই কৌশল সম্পর্কে বেশ সচেতন। তারা এই সম্ভাবনাকে হালকাভাবে দেখছে না। ইরানের রাষ্ট্রনেতা, সেনাবাহিনী, আইআরজিসি যুদ্ধের জন্য তারা পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছেন বলে বারবার জানাচ্ছেন। সহজ কথায়, এই বিরতি কোনো শান্তির সংকেত হয়ে উঠেনি। এটি সম্ভবত নতুন করে শক্তি গুছিয়ে নেওয়ারই সুযোগ মাত্র।

এই গোটা পরিস্থিতিতে ইজরায়েলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধারণা করা হচ্ছে, আমেরিকা এখন সরাসরি লড়াই থেকে দূরে থাকতে চাইছে। এর বদলে তারা ইজরায়েলকে সামনে রেখে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়। লেবানন সংকটের মতো নানা অজুহাত তুলে তারা ইজরায়েলকে ব্যবহার করতে পারে। খবর রয়েছে, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সহসাই যাচ্ছেন আমেরিকা সফরে। যদিও জানা যায়, ওয়াশিংটনে ইজরায়েলি লবি আর আগের মতো প্রভাব তৈরি করতে পারছে না ইরান যুদ্ধ শুরুর পর। এই কথা মনে রাখা দরকার যে নিজেদের ক্ষতি এড়াতে অন্যকে দিয়ে যুদ্ধ করানো আমেরিকার পুরোনো অভ্যাস। কিন্তু ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই চাল মানবে না। তাদের মতে, হামলা ইজরায়েল করলেও তার দায় আমেরিকাকেই নিতে হবে। তারা এই দুই পক্ষকে আলাদা করে দেখছে না। তেহরান বলেছে, অকারণ যুদ্ধটা তারা ইরানের ওপর যৌথভাবেই চাপিয়ে দিয়েছে।

বলাই বাহুল্য উপসাগর যুদ্ধে পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ার মূল চাবিকাঠি হলো হরমুজ প্রণালী। এই সমুদ্রপথ ইরানের নিয়ন্ত্রণে। সারা বিশ্বের তেলের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পারাপার হয়।তাই ইরান একে বড় একটি শক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। পশ্চিমী দেশগুলোর অবরোধের পাল্টা জবাব দিতে ইরান এই পথ বেছে নিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা এই পথ খুলে দেবে না। প্রয়োজন হলে এটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে। ফলত, সারা বিশ্বের জ্বালানিব্যবস্থা বড়ই বিপদে। পশ্চিমী দেশগুলি এখন প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে এই অচলাবস্থার দায় আমেরিকার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। বাধ্য হয়ে আমেরিকা হরমুজ প্রণালী থেকে দূরে গভীর সমুদ্রে জাহাজ দাঁড় করিয়ে ইরানের বন্দরগুলির ওপর অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। ফলত, এই লড়াই আর কেবল যুদ্ধের ময়দানে সীমাবদ্ধ নেই, এটি বিশ্ব অর্থনীতিকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে। গোলাবারুদের যুদ্ধে ইরান যুদ্ধ হয়তো শেষ। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে এটি বিশয়দের চেহারা নিচ্ছে কারণ সংকটটা বিশ্বময়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *