আত্মমুগ্ধ এক রাজা!!
সকালে বন্ধুত্বের পথ খুলছেন তো বিকালে বলছেন যুদ্ধের কথা। যে ব্যক্তি দুপুরে প্রশংসা করছেন তিনিই রাতে গালমন্দ করে শাসাচ্ছেন।ইনি যদি সাধারণ মানুষ হতেন তাহলে পরিজনরা
তাঁকে নিশ্চয়ই একা পথে ছাড়তেন না বয়োজনিত অসুখ ধরে নিয়ে। অন্তত মানসিক ডাক্তারের কাছে তো নিতেনই। কিন্তু যাকে নিয়ে আলোচনা তিনি তো আম আদমি নন। একটি দেশের রাষ্ট্রপতি, তাও বিশ্বের সবচেয়ে ধনী, শক্তিশালী, যুদ্ধবাজ দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি শ্রীযুক্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প মহোদয়। সপ্তাহ দেড় আগে তিনি ইরানি সভ্যতাকে ধুলায় মিশিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তিনি তো তিনিই। এইবার নিজেকে যিশুর সঙ্গে তুলনা করে সেই বিতর্ককে তিনি নিজেই আরও চড়িয়ে দিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মস্তিষ্কের সুস্থতা অসুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। ২০১৬ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর এই প্রশ্ন উঠেছিল। আমেরিকার সেরা ২৭ জন মানসিক রোগ- বিশেষজ্ঞ বই লিখে ঘোষণা করেছিলেন, ট্রাম্প মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ও বিপজ্জনক। বিশেষজ্ঞরা তখন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন কে নিয়ে ট্রাম্পের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, কিম যদি আমেরিকার বিরুদ্ধে কোনো হুমকি দেয় তাহলে এমন আগুনের তাণ্ডব চালানো হবে, যা পৃথিবীর মানুষ আগে কখনোই দেখেনি। ট্রাম্পের এই ধরনের আগুন নিয়ে খেলার বিষয়টি সেই দিন সবাইকে অবাক করেছিল। সেই উক্তি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা লিখেছিলেন, ট্রাম্প যে অসুখে ভুগছেন তার নাম ‘ম্যালিগন্যান্ট নার্সিসিজম’। বাংলায় যার তর্জমা হবে, – বিকৃত আত্মমুগ্ধতা।
বলাই বাহুল্য গত ১০ বছরে ট্রাম্পের এই অসুখটা আরও বিস্তৃতি পেয়েছে। হয়তো যথাযথ চিকিৎসা করাননি বলেই বেড়েছে। বিকৃত আত্মমুগ্ধতায় তিনি ইরান সীমান্তের হরমুজ প্রণালীকে নিজের ব্যক্তিগত সামাজিক মাধ্যম ভাবছেন। ছয় হাজার বছরের পুরানো ইরানি সভ্যতা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মাটির সঙ্গে গুঁড়িয়ে দেবেন বলে যে হুমকি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তাতে কেবল আত্মমুগ্ধতা নয়, মানসিক বৈকল্যের লক্ষণও ধরা পড়েছে। আইনের চোখে এমন হুমকি দেওয়াও যুদ্ধাপরাধ। আমেরিকার বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর চাক শুমার ট্রাম্পকে ‘একজন অত্যন্ত অসুস্থ মানুষ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্পের প্রাক্তন ব্যক্তিগত আইনজীবী টাই কব বলেছেন, লোকটা যে ‘পাগল’ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তা না হলে সভ্যতা গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা কেউ বলে? ইরান যুদ্ধের পর ট্রাম্পকে নিয়ে তাঁর একসময়ের ঘনিষ্ঠ লোকেরাই নানান শব্দে তাঁকে ভূষিত করছেন।কেউ বলছেন লুনাটিক, কেউ বলছেন ইনসেইন।সবগুলি শব্দেরই অর্থ হলো উন্মাদ।
নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ট্রাম্পের বন্ধু, নিকটজনেরাই কেউ কেউ এখন খোলামেলাভাবে তাঁর মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করেছেন। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আচরণ ও কথাবার্তা নিয়ে উদ্বেগ এতটাই বেড়েছে যে দেশটির সংসদ বা কংগ্রেস সদস্যদের অনেকে মনে করছেন গঠনতন্ত্রের ২৫তম সংশোধনী ব্যবহার করে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ব্যবস্থা করা উচিত। প্রায় ১০০ জন ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য এমন দাবি তুলে একটি খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। সর্বশেষ ট্রাম্পের মনোবৈকল্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে যিশুখ্রিষ্টের আদলে নিজের একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করার পর। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নির্মিত ওই ছবিতে সবকিছুই যিশুর মতো, কেবল ঈশ্বরপুত্রের চেহারায় ট্রাম্পের মুখখানা বসানো। চোখে পবিত্র দ্যুতি, মাথার চারধারে জ্যোতির্বলয়, এক হাত অসুস্থ ব্যক্তির মাথার ওপর-। আজ দলনির্বিশেষে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকের চোখে ৭৯ বছর বয়স্ক ট্রাম্প বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অপ্রকৃতস্থ হয়ে উঠছেন। সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তাঁর কমে আসছে। শারীরিক সুস্থতা নিয়ে নানা মহলে শুরু হয়েছে উদ্বেগ।
এ বছরের গোড়ার দিকে ট্রাম্পের হাতে অদ্ভুত এক ক্ষতের চিহ্ন দেখা গেলে অনেকেই ধরে নেন এটা নিশ্চয় অজ্ঞাত কোনো রোগের লক্ষণ। নিজেকে সুপারম্যান, সম্রাট, এমনকী সেরা সংগীতজ্ঞ হিসেবে চিত্রিত করেছেন এবং সেসব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলি করেছেন।
নিজেকে ঈশ্বর কর্তৃক নির্বাচিত, নন বায়োলজিক্যাল হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। এগুলি নিয়ে কথা উঠলে হেসে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিজেকে যিশুখ্রিষ্টের সঙ্গে তুলনা করে এবার যে কাণ্ড করেছেন, তা সম্ভবত আগের সব বাড়াবাড়ি ছাড়িয়ে গেছে। জটিলতা আরও বেড়েছে ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গে ট্রাম্পের পোপ লিওকে সমালোচনা করে। লিও যুদ্ধের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসন ইরান যুদ্ধকে ঈশ্বরের নির্দেশ বলে প্রচারের চেষ্টা করায় তার বিরোধিতা করেছেন পোপ। ট্রাম্পের দাবি, পোপ লিও আইনের ব্যাপারে দুর্বল, বৈদেশিক নীতির কিছুই তিনি বোঝেন না। বিশ্ব ইতিহাসে এমন মানুষের অভাব নেই, যাঁরা উন্মাদ বা অপ্রকৃতস্থ হয়েও ক্ষমতা আঁকড়ে থেকেছেন। তাঁদের একজন হলেন রোমান সম্রাট ক্যালিগুলা, যিনি নিজেকে জীবন্ত ঈশ্বর বলে ঘোষণা করেছিলেন।