শনিবার | ১১ এপ্রিল ২০২৬

সম্পাদকীয়: পরিচিতির কারাদণ্ড

 সম্পাদকীয়: পরিচিতির কারাদণ্ড

ফ্রানৎস কাফকা যখন তার কালজয়ী উপন্যাস ‘দ্য ট্রায়াল’-এর সূচনা করেছিলেন, তখন হয়তো ভাবেননি যে এক শতাব্দী পরেও জনৈক জোসেফ কে-র সেই অসহায়তা আধুনিক রাষ্ট্রের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা নাগরিকের প্রাত্যহিক ভবিতব্য হয়ে উঠবে। সকালে ঘুম ভাঙলে জোসেফ কে দেখেছিলেন, দুই আগন্তুক তার ঘরে। তিনি গ্রেপ্তার, কিন্তু অপরাধ কী? উত্তর নেই। তিনি পরিচয়পত্র দেখালেন, জন্ম শংসাপত্র পেশ করলেন— কিন্তু রাষ্ট্রনিযুক্ত সেই দূতেরা নিস্পৃহ। নাগরিক নিজের সম্পর্কে কী দাবি করছেন, তাতে রাষ্ট্রের কৌতূহল নেই; আদালত নাগরিককে কী ভাবে সংজ্ঞায়িত করছে, সেটুকুই বিচার্য। ২০২৬ সালের ভারতের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে কাফকার সেই দুঃস্বপ্ন আজ এক রূঢ় বাস্তব। সাম্প্রতিককালে যে তিনটি আইন ভারতে দ্রুতগতিতে পাশ করানো হয়েছে— ধর্মীয় ধর্মান্তর, লিঙ্গ পরিচয় এবং বিবাহের নথিভুক্তিকরণ সংক্রান্ত; তা আসলে ব্যক্তির সার্বভৌমত্বের উপর রাষ্ট্রের এক শাণিত আধিপত্যের দলিল।

রাষ্ট্রের এই দর্শনের মূলে রয়েছে এক প্রাচীন ও রক্ষণশীল তত্ত্ব। ইউরোপীয় নবজাগরণের উত্তরসূরি হিসেবে উদারপন্থী আইনব্যবস্থার দাবি ছিল, সমাজের মূল একক হল ব্যক্তি। সে তার পছন্দ, তার অধিকার এবং তার চুক্তির মালিক। রাষ্ট্র সেখানে কেবল এক প্রহরী। কিন্তু ভারতের বর্তমান আইনি প্রবণতা বলছে অন্য কথা। এখানে ব্যক্তি গৌণ, মুখ্য হল তার গোষ্ঠী, ধর্ম বা জাত। ১৯৩৬ সালে বি আর অম্বেডকর ‘অ্যানিহিলেশন অফ কাস্ট’ ভাষণে সতর্ক করেছিলেন যে, হিন্দু সমাজ ব্যক্তিকে চেনে না, চেনে তার জাতকে। নাগরিককে সেখানে নিজের পরিচয় নিজে নির্মাণ করার অধিকার দেওয়া হয়নি, বরং সেই পরিচয় অনুমোদিত হতে হয় পুরোহিত, পঞ্চায়েত বা ম্যাজিস্ট্রেটদের কলমে। শতবর্ষ পরেও যেন সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে। মহারাষ্ট্র বা গুজরাটের বিবাহ সংক্রান্ত নতুন আইনগুলি কার্যত ঘোষণা করছে যে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের পছন্দই শেষ কথা নয়; রাষ্ট্রের কাছে তাকে প্রমাণ করতে হবে যে তার পিছনে পরিবার বা গোষ্ঠীর সীলমোহর রয়েছে। ট্র্যান্সজেন্ডারদের অধিকার রক্ষার নামে যে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে, সেখানেও আত্মপরিচয়ের অধিকার কেড়ে নিয়ে তাকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে এক ‘মেডিক্যাল বোর্ড’-এর সামনে।

এই ব্যাধি কেবল ভারতের নয়, এক বিশ্বজনীন মহামারি। হাঙ্গেরির সংবিধানে পরিবারের সংজ্ঞা বদলে দেওয়া থেকে রাশিয়ার ‘চিরাচরিত মূল্যবোধ’-এর দোহাই দিয়ে ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ— সর্বত্রই নাগরিকের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে বলি দেওয়া হচ্ছে গোষ্ঠীর বেদীতে। মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের পরিচয়হীন করে দেওয়া কিংবা আমেরিকায় ভোটার তালিকা থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের নাম ছেঁটে ফেলার নেপথ্যে সেই একই মানসিকতা: রাষ্ট্র ঠিক করবে আপনি কে। ভারতের ‘এসআইআর’ প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু পশ্চিমবঙ্গেই যে নব্বই লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেল, তার ভুক্তভোগী মূলত মুসলমান সমাজ এবং হিন্দু ধর্মালম্বীদের মধ্যে মতুয়া বা দলিত উদ্বাস্তু সমাজ। যাদের হাতে নথির জোর নেই, রাষ্ট্রের ‘লেগেসি’ প্রমাণের খেলায় তারাই প্রথম পরাজিত।

গণতন্ত্রের মূল কথা ছিল ক্ষমতা নিচ থেকে উপরে সঞ্চালিত হওয়া। অথচ আধুনিক রাষ্ট্র এখন নিয়ন্ত্রণের এক নিপুণ যন্ত্র। অমর্ত্য সেনের ভাষায়, মানুষকে একটিমাত্র পরিচয় বা ‘সিঙ্গল আইডেন্টিটি’-তে বন্দি করাই সমকালের শ্রেষ্ঠতম বিপদ। নথির অভাবে যে নাগরিক অদৃশ্য হয়ে যায়, তার অস্তিত্বের দায় রাষ্ট্র নিতে চায় না। ‘ফারগো’ টিভি সিরিজের সেই স্টাসি অফিসারের মতো রাষ্ট্র আজ বলছে, “রাষ্ট্র কখনও ভুল হতে পারে না; তুমি যদি বলো রাষ্ট্র ভুল, তবে ভুলটা আসলে তোমার অস্তিত্বেই।” কাফকার মূল জার্মান উপন্যাসের নাম ছিল ‘ডের প্রসেস’— যার অর্থ কেবল বিচার নয়, বরং পদ্ধতি। আজকের ভারতে সেই পদ্ধতিই আসলে দণ্ড। নাগরিক আজ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজছে, আর রাষ্ট্র তার হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে এক অন্তহীন আইনি গোলকধাঁধা। এই প্রসেস বা পদ্ধতিই যখন শাস্তি হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের খোলসটি থাকে ঠিকই, কিন্তু ভিতর থেকে ব্যক্তির স্বাধীনতা হয়ে পড়ে এক নিরেট কঙ্কাল।

প্রশ্নটি কেবল নথিপত্রের বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার নয়, প্রশ্নটি দর্শনের। রাষ্ট্র কি তবে এখন নাগরিকের সেবকের পোশাক ছেড়ে তার অভিভাবক হয়ে উঠবার সাধনায় মগ্ন? নিজের দেশের মানুষের আত্মপরিচয়কে যদি রাষ্ট্র সর্বক্ষণ সন্দেহের চোখে দেখে, তবে সেই শাসনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরতে পারে, কিন্তু মুক্তি কি থাকে? জোসেফ কে-র সেই অন্তহীন বিচারপ্রক্রিয়া আজকের ভারতের সাধারণ নাগরিকের প্রাত্যহিক ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়ালে, তা কেবল শাসনযন্ত্রের জয় ঘোষণা করে না, বরং এক মুক্ত সমাজের পরাজয়কেই চিহ্নিত করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *