নজরে আসাম ভোট
শেষ সময়ে আসামে বিধানসভা ভোট জমিয়ে দিয়েছে কংগ্রেস।তবে কংগ্রেস ক্ষমতায় আসবে কি না,তা নিয়ে দ্ধিধা-দ্ধন্ধ,সংশয় সব রয়েছে। এরপরেও বলা যায়, আসামে আগ্রাসী বিজেপির বিরুদ্ধে কংগ্রেস যে শেষ পর্যন্ত মাঠে টিকে ছিল, তাই বড় ব্যাপার। আসামের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বর্তমানে বিজেপির হিন্দুত্বের অন্যতম পোস্টার বয়। হিন্দুত্বের “আইকন” বললেও এই মুহূর্তে তাকে কম বলা হবে। নিন্দুকেরা বলে, তিনি উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকেও ছাপিয়ে গেছেন-অন্তত উগ্র হিন্দুত্বের জিগির তোলার ক্ষেত্রে। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা পাঁচ বছর ধরে আসামের মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন। এই সময়ের মধ্যেই তিনি গোটা দেশে তো বটেই, বিশ্বেও মোটামুটি নাম করে ফেলেছেন হিন্দুত্বের জিগির তোলার ক্ষেত্রে। বহুদিন তিনি কংগ্রেস করেছেন। দীর্ঘদিন কংগ্রেসের মন্ত্রী ছিলেন। ২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো আসামে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসে। সে সময় হিমন্ত অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী হননি। ২০২১ সালে ফের বিজেপি ক্ষমতায় এলে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হন বর্তমানে বিজেপির হিন্দুত্বের পোস্টার বয় হিমন্ত।
আসামের এবারের নির্বাচন বিজেপি বনাম কংগ্রেস নয়, যেন হিমন্ত বনাম কংগ্রেস, আরও বিশেষ করে বললে হিমন্ত বনাম গৌরব গগৈ হচ্ছে। এবারের আসামে নির্বাচনের মতো অতীতে কোনও নির্বাচন সে রাজ্যে অনুষ্ঠিত হয়নি। গত পাঁচ বছরে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে বিজেপি সে রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যে, সে রাজ্যে সংখ্যালঘুরা দারুণ অসহায় বোধ করছেন। কেন্দ্রের বিজেপি নেতৃত্ব, বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরাও আসামের মুখ্যমন্ত্রীকে তাদের ব্লু-আইড বয় হিসেবে গণ্য করেন। ফলে আসামে তার বিরুদ্ধে বহু কেলেঙ্কারির অভিযোগ থাকলেও মুখ্যমন্ত্রী হিসেরে হিমন্ত স্বাধীনভাবেই তার কাজ করে গেছেন গত পাঁচ বছর। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রের বিজেপি তাকে গোটা পূর্বোত্তরের দায়িত্বও দিয়ে রেখেছে। ফলে মুখ্যমন্ত্রী নিজেও জানেন যে তিনি অসীম ক্ষমতার অধিকারী এবং তাতে মোদি-শাহরও সম্মতি রয়েছে।
গত পাঁচ বছর রাজ্যজুড়ে তিনি ধর্মীয় মেরুকরণ করে গেছেন। উগ্র ধর্মীয় বক্তব্য রেখেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতির অভিযোগ, জমি কেলেঙ্কারির একাধিক অভিযোগ উঠলেও কেন্দ্রের বিজেপি তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার পথে হাঁটেনি।
বিজেপির নেতা এবং মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এই প্রথম সরাসরি ভোটের ময়দানে নেমেছেন হিমন্ত। আসামে ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যাওয়া কংগ্রেস এক বছর আগেও ভাবেনি যে এবারের নির্বাচনে তারা বিজেপিকে একটা ফাইট দিতে পারবে। কিন্তু কংগ্রেস নির্বাচনের প্রায় এক বছর আগে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈয়ের পুত্র এবং বর্তমান সাংসদ গৌরব গগৈকে প্রদেশ সভাপতি করে পাঠানোর পরই খেলা ঘুরে যায়। কংগ্রেস আজকের দিনে একটা লড়াই করার মতো পর্যায়ে চলে আসে। যদিও কংগ্রেসের কাছে বিজেপির মতো পাহাড়প্রমাণ একটি দলের বিরুদ্ধে লড়াই করা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু গৌরব গগৈয়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস আসামে দেখিয়ে দিয়েছে বুক চিতিয়ে কীভাবে লড়াই করা যায়। গৌরব গগৈ পাশে পেয়েছে আরেক গগৈকে-তার নাম অখিল গগৈ। যদিও বিজেপির কাছে প্রথম থেকেই অ্যাডভান্টেজ ছিল ডিলিমিটেশন এবং কংগ্রেসের মধ্যে কিছু অসন্তোষকে পুঁজি করে কংগ্রেসের ঘর ভাঙানো। শেষ সময়ে বিজেপি কংগ্রেসের এক সাংসদকে বিজেপিতে যোগ করিয়ে একটা মোক্ষম চাল দেয়।
অন্যদিকে কংগ্রেসও আগেই পরাজয় স্বীকার না করে বিজেপির বিরুদ্ধে দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যায়। নির্বাচনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আসামের মুখ্যমন্ত্রীর পরিবারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ এনে গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। যদিও মুখ্যমন্ত্রী এবং তার পত্নী কংগ্রেসের ওই নেতার বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল এবং মানহানির মামলা করেন। যদিও এই সংক্রান্ত অভিযোগের অনেক কিছুরই জবাব এখনও পাওয়া যায়নি।
এতসবের পরেও আসামের এবারের নির্বাচন সত্যিকার অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কংগ্রেস আদৌ সে রাজ্যে নির্বাচনে কোনও প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস যদি আসামে বাজিমাত করতে পারে, তাহলে তা হবে তাদের কাছে এক হারকিউলিয়ান টাস্ক। বিজেপি কিন্তু এসবের ধার ধরছে না। বিজেপি হ্যাটট্রিক করার দাবি করছে। বিজেপির হ্যাটট্রিক নাকি কংগ্রেসের প্রত্যাবর্তন-এর জন্য আমাদের চৌঠা মে পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় নেই।