মঙ্গলবার | ০৭ এপ্রিল ২০২৬

ক্ষমতার নতুন মানচিত্র

 ক্ষমতার নতুন মানচিত্র

ভারতের যুক্তরাষ্টীয় কাঠামোয় লোকসভার আসন বণ্টন নির্ধারিত হয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে।

ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে দেশ। একদিকে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ঐতিহাসিক সুযোগ, অন্যদিকে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস ঘিরে গভীর রাজনৈতিক সমীকরণ- এই দুইয়ের সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছে এক জটিল এবং বহুস্তরীয় পরিস্থিতি। এই প্রেক্ষাপটে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ নিছক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; বরং তা এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিত বহন করছে।


২০২৩ সালে পাশ হওয়া ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ ভারতীয় রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। লোকসভা ও বিধানসভায় ৩৩ শতাংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণ- এই ধারণা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। কিন্তু সেই আইনের কার্যকারিতা নির্ভরশীল করা হয়েছিল জনগণনা ও ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ার উপর। অর্থাৎ বাস্তবায়ন অনিবার্যভাবে পিছিয়ে যাচ্ছিল ২০৩০-এর দশকে।


এখন সেই অপেক্ষার পথ পরিহার করে সরকার চাইছে ২০২৯ সালের নির্বাচনের আগেই এই আইন কার্যকর করতে। প্রশ্ন উঠছে- এটি কি সত্যিই নারী ক্ষমতায়নের তাগিদ, নাকি নির্বাচনী রাজনীতির অঙ্ক?
সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমান লোকসভার আসন সংখ্যা ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৫৪৩ থেকে প্রায় ৮১৬-তে উন্নীত করা হবে এবং নতুন আসনের এক-তৃতীয়াংশ নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। উপর থেকে দেখলে এটি নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির একটি সাহসী পদক্ষেপ। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত রাজনীতি আরও গভীর।


ভারতের যুক্তরাষ্টীয় কাঠামোয় লোকসভার আসন বণ্টন নির্ধারিত হয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে। এখানে তৈরি হচ্ছে মূল দ্বন্দ্ব। উত্তর ভারতের জনবহুল রাজ্যগুলি- বিশেষত উত্তর প্রদেশ ও বিহার- স্বাভাবিকভাবেই বেশি আসন পাবে। বিপরীতে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি, যারা দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক সফল, তারা তুলনায় কম আসন বৃদ্ধির সুবিধা পাবে।
এই বৈষম্যের আশঙ্কা থেকেই দক্ষিণে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। তাদের যুক্তি- যে রাজ্যগুলি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়া উচিত নয়। অন্যদিকে ব্যর্থ রাজ্যগুলি যদি বাড়তি রাজনৈতিক শক্তি পায়, তবে তা এক ধরনের ‘উল্টো প্রণোদনা’ তৈরি করবে। এই প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক ভারসাম্যে।


উত্তর প্রদেশ, বিহারের মতো রাজ্যে আসন ব্যাপক বাড়বে। অন্যদিকে তামিলনাড়ু, কেরল, তেলেঙ্গানার মতো দক্ষিণের রাজ্যে তুলনামূলক কম বৃদ্ধি পাবে। ফলে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর অভিযোগ- জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়ার ‘শাস্তি’ তারা পাচ্ছে। আর ব্যর্থ রাজ্যগুলো পাচ্ছে রাজনৈতিক পুরস্কার। এই বিতর্কে বিরোধী শিবিরও বিভক্ত ও চাপে। সরকারের এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


নারী সংরক্ষণ কার্যকর করলে নারীদের বৃহৎ ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব পড়বে। বিরোধীরা যদি এর বিরোধিতা করে, তাহলে তাদের ‘নারীবিরোধী’ তকমা দেওয়া সহজ হবে। অন্যদিকে, জয়রাম রমেশ-এর মতো বিরোধী নেতারা বলছেন- এটি এক ধরনের রাজনৈতিক চাল, যার মাধ্যমে উত্তর ভারতের জনবহুল রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়িয়ে বিজেপি নিজের সুবিধা নিশ্চিত করতে চাইছে।
রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে কার্যকর। নারী সংরক্ষণে আপত্তি জানানো প্রায় অসম্ভব- কারণ তা সরাসরি নারী ভোটারদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে। ফলে বিরোধীরা যদি আসন বৃদ্ধির বিরোধিতা করে, বিজেপি সহজেই তাদের ‘নারীবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *