মঙ্গলবার | ০৭ এপ্রিল ২০২৬

টাকার নিঃশব্দ পতন

 টাকার নিঃশব্দ পতন

ডলারের চাহিদা বাড়ছে এবং রুপির ওপর চাপ আরও তীব্র হচ্ছে।

নরেন্দ্র মোদি তখন প্রধানমন্ত্রী হননি। ছিলেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী। সেইসময় রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেশের তৎকালীন কংগ্রেস সরকারকে তীব্র আক্রমণের সূরে বলেছিলেন টাকার মান পড়ে গেলে সরকারের সম্মানও পড়ে যায়। সেই বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক কটাক্ষ ছিল না, বরং অর্থনীতির সঙ্গে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার এক সরল সমীকরণ তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরে আজ যখন সেই একই প্রশ্ন বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ফিরে আসে, তখন তা নিছক বিরোধিতার ভাষা নয় বরং বাস্তবতার নির্মম প্রতিফলন হয়ে ওঠে। আজকের ভারতীয় অর্থনীতির এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে টাকার ক্রমাগত অবমূল্যায়ন। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের সামনে রুপির অবস্থান ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে, এবং এই দুর্বলতা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়-এটি প্রতিদিনের জীবনে সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বাজারে গিয়ে পকেটের টান, জ্বালানির দামে উর্ধ্বগতি, আমদানি নির্ভর পণ্যের খরচ বৃদ্ধি-সব মিলিয়ে টাকার পতন যেন এক নীরব সংকট, যা ধীরে ধীরে নাগরিক জীবনের ভিত নড়িয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতির পেছনে কারণগুলোও অজানা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই ভারত একটি আমদানি-নির্ভর অর্থনীতি, বিশেষত জ্বালানি খাতে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লেই তার অভিঘাত সরাসরি এসে পড়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে। ডলারে পরিশোধ করতে গিয়ে টাকার ওপর চাপ বাড়ে, এবং সেই চাপের প্রতিফলন ঘটে বিনিময় হারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বৈশ্বিক আর্থিক নীতির পরিবর্তন যখন উন্নত দেশগুলো সুদের হার বাড়ায়, তখন বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক নিরাপদ বাজারের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

ফলে উন্নয়নশীল দেশের মুদ্রা আরও চাপে পড়ে। অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতাও কম দায়ী নয়। মুদ্রাস্ফীতি যখন বাড়ে, তখন টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ একই টাকায় কম জিনিস পাওয়া যায়। এই অভিজ্ঞতা এখন আর তাত্ত্বিক নয় প্রতিটি পরিবারের মাসিক বাজেটেই তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বাজারের ব্যাগ যেন প্রতিদিন একটু করে হালকা হয়ে যাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে হালকা হচ্ছে মানুষের আস্থা। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতাও এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে। বিশ্বজুড়ে সংঘাত, অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি সরবরাহের টানাপোড়েন বিনিয়োগকারীদের আরও সতর্ক করে তুলছে। তারা ঝুঁকি এড়িয়ে নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছে, যার ফলস্বরূপ ডলারের চাহিদা বাড়ছে এবং রুপির ওপর চাপ আরও তীব্র হচ্ছে। তবে এই সমস্ত অর্থনৈতিক ব্যাখ্যার বাইরে একটি বড় প্রশ্ন থেকে মায়-রাষ্ট্রের দায় কোথায়? অর্থনীতি নিঃসন্দেহে বহুস্তরীয় এবং জটিল একটি ক্ষেত্র, যেখানে সবকিছু সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কিন্তু নীতিনির্ধারণ, দূরদর্শিতা এবং সংকট মোকাবিলার কৌশল-এই তিনটি জায়গায় সরকারের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। বিশেষ করে যখন রাজনৈতিক বক্তব্যে অর্থনীতিকে সরলীকৃত করে তুলে ধরা হয়, তখন সেই বক্তব্যের দায়ও সময়ের সঙ্গে ফিরে আসে। আজকের বাস্তবতা হল, টাকার অবমূল্যায়ন শুধু অর্থনীতির সূচক নয়, এটি মানুষের মনস্তত্বেও প্রভাব ফেলছে। একসময় যে টাকা আত্মবিশ্বাস দিত, আজ তা অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনই সবচেয়ে উদ্বেগজনক। কারণ অর্থনীতি কেবল সংখ্যার খেলা নয় এটি বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। আর সেই বিশ্বাস যখন টলে যায়, তখন তার অভিঘাত বহুমাত্রিক হয়। এখানেই প্রয়োজন আত্মসমালোচনার। রাজনৈতিক বক্তব্যের আবেগ নয়, বরং বাস্তবতার নিরিখে অর্থনীতিকে বিচার করার সময় এসেছে। উন্নয়নের বড় বড় দাবি যতই থাকুক, যদি সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন না ঘটে, তবে সেই উন্নয়ন প্রশ্নের মুখে পড়বেই। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি খুব সহজ-টাকার মান শুধু বাজারে নির্ধারিত হয় না, এটি নির্ধারিত হয় মানুষের আস্থায়। আর সেই আস্থা ধরে রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। যদি সেই দায়িত্বে ফাঁক থাকে, তবে প্রশ্ন উঠবেই। কারণ প্রশ্ন তোলাই গণতন্ত্রের শক্তি, আর সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সাহসই একটি সরকারের প্রকৃত পরীক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *