একলা চলো
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর অমর সৃষ্টি এই গানটির সঙ্গে আসমুদ্রহিমাচল পরিচিত।
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে, একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো একলা চলো রে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর অমর সৃষ্টি এই গানটির সঙ্গে আসমুদ্রহিমাচল পরিচিত। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বদেশি যুগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত একাধিক দেশাত্মবোধক গানের মধ্যে এটি অন্যতম। কিন্তু সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই গান রচনার শতবর্ষ পরেও গানের অন্তর্নিহিত অর্থ বা সারমর্ম ততটাই প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে। এই প্রাসঙ্গিকতা যেমন প্রতিটি মানুষের জীবনে জড়িয়ে আছে, তেমনি জড়িয়ে আছে আমাদের সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, কুটনীতি-সহ প্রতিটি ক্ষেত্রে। তাই তো বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ‘একলা চলো’র অন্তর্নিহিত অর্থকে। এই প্রতিবেদনের মূল বিষয়ও ভারতীয় রাজনীতিতে “একলা চলো” নীতি। তাই শুরুতে এই গানটির প্রথম কলি উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এই নীতি নতুন নয়। সময় ও বাস্তবতার নিরিখে স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় রাজনীতিতে বহু রাজনৈতিক দলকেই দেখা গেছে একলা চলো নীতি নিয়ে চলতে। এই নীতি নিয়ে চলতে গিয়ে সবাই যে সবসময় লাভবান হয়েছে, এমন দাবি করা যাবে না। আবার একসঙ্গে চলতে গিয়েও যে খুব একটা লাভ হয়েছে, তেমনও নয়। তবে এটা ঠিক যে, রাজনৈতিক দলগুলো সময়ের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে সময়ে সময়ে তাদের নীতি পরিবর্তন করেছে। এখনও নীতি বদলের সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।
এই কথাগুলি বলার একটাই কারণ, ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে আমাদের ত্রিপুরা রাজোও একটি বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন এবং ত্রিপুরা স্বশাসিত জেলা পরিষদের ভোট হবে। এই নির্বাচনগুলিতে এবার দেশের সবথেকে পুরনো রাজনৈতিক দল কংগ্রেসকে দেখা যাচ্ছে সেই “একলা চলো নীতি অবলম্বন করতে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরায় কংগ্রেস দলকে একেবারে অন্য ভূমিকায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের অভিমত, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে এবার বড় রাজনৈতিক চমক এনে দিয়েছে জাতীয় কংগ্রেস। দীর্ঘ দুই দশক ধরে বামেদের সঙ্গে জোট করে লড়াই করার পর এবার তারা একাই ২৯৪টির মধ্যে ২৮৪টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু কৌশলগত নয়, বরং বাংলায় নিজেদের হারানো জমি ফিরে পাওয়ার এক মরিয়া প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক মহল। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ‘একলা চলো’ নীতি বন্ধের ভোট সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলায় এখনও কংগ্রেসের সংগঠন রয়েছে। বিশেষ করে মালদা, মুর্শিদাবাদ ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলিতে কংগ্রেসের নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, কংগ্রেসের সংগঠনকে নতুন করে চাঙ্গা করতেই বঙ্গে এবার এই পদক্ষেপ নিয়েছে কংগ্রেস। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, ২০২৮ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন বেশ চমকপ্রদ হতে চলেছে। এই নির্বাচনে বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক চার ভাগে ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তৃণমূল, কংগ্রেস, বাম-আইএসএফ এবং মিম-হুমায়ূনের আম জনতা উন্নয়ন পার্টির জোটের মধ্যে। ফলে এবার বয় আসনে ফলাফল অপ্রত্যাশিত হতে পারে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ, মালদা ও উত্তর দিনাজপুর মিলিয়ে প্রায় ৬০-৭০টি আসনে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
ঐতিহাসিকভাবে দেখলে, ২০০৬ সালের পর এই প্রথম কংগ্রেস বাংলায় এককভাবে বড় আকারে নির্বাচনে লড়ছে। এর আগে কখনও তৃণমূল, কখনও বামেদের সঙ্গে জোটে থেকেছে তারা। কিন্তু সেই জোট রাজনীতির ফলে সংগঠন দুর্বল হয়েছে বলেই মত অনেকের। তাই এবার স্বাধীনভাবে লড়াই করে নিজেদের ভিত্তি মজবুত করাই মূল লক্ষ্য। ত্রিপুরাতেও একই ছবি। এডিসি এবং উপনির্বাচনে কংগ্রেস এবার বামেদের সঙ্গ ছেড়ে একাই লড়াই করছে। সব মিলিয়ে, বাংলার এবারের নির্বাচন আর শুধুমাত্র তৃণমূল বনাম বিজেপি লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। কংগ্রেসের সক্রিয়তা এই নির্বাচনকে ত্রিমুখী, এমনকী চতুর্মুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত করেছে। আগামীদিনে এই সিদ্ধান্ত কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নির্ভর করছে ভোটারদের মনোভাব এবং মাটির লড়াইয়ের ওপর। তবে এটুক স্পষ্ট ২০২৬-এর বাংলা ভোটে কংগ্রেস নতুন করে খেলায় ফিরতে চাইছে, এবং সেই চেষ্টা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক সমীকরণ নাড়িয়ে দিয়েছে। তবে কংগ্রেসের এই একলা চলো নীতির কারণে শেষপর্যন্ত কে লাভবান হবে, সেটাই এখন সবথেকে আলোচ্য বিষয়।