সংকটে দেশ
সম্পাদকীয়, ২৫ মার্চঃ পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের প্রভাব এবার সরাসরি এসে আঘাত করেছে ভারতে। বিশেষ করে ভারতের জ্বালানি ক্ষেত্রে এই সংকট দিনদিনই ঘনীভূত হচ্ছে। শুধু জ্বালানি ক্ষেত্র কেন, সর্বক্ষেত্রে আঘাত আসছে। এতদিন ভেতরে ভেতরে টের পাচ্ছিল কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। এবার তা বিস্ফোরণের মতো বাইরে বেরিয়ে এলো। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বললেন, ভয়াবহ সংকটের কথা। মনে করিয়ে দিলেন করোনাকালের কথা। করোনাকালেও যেমন দেশের সামনে যেভাবে দুর্যোগ এসেছিল, সংকট এসেছিল, সেরকমই দুর্যোগ এবারও কি অপেক্ষা করছে দেশের সামনে? এজন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীকে একজোট হয়ে এই সংকটকালও উত্তরানোর কথা বলেছেন। শুধু তাই নয়, সর্বদলীয় বৈঠকও হয়ে গেল বুধবার। এই বৈঠকে রাজ্য সরকারগুলির সর্বোচ্চ সহায়তা চাওয়া হয়েছে। যে রাজ্যে বিজেপি সরকার রয়েছে তারা তো সহায়তা করবেনই, অন্যান্য অবিজেপি রাজ্য সরকারগুলির কাছ থেকেও দেশের সামনে এই ভয়াবহ বিপদের/ সংকটের মুহূর্তে কেন্দ্রকে সহায়তার আহ্বান জানানো হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার এই যুদ্ধের এপিসেন্টারে রয়েছে ইরান। ইরানের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের যৌথ হানাদারির প্রভাব এবার টের পাচ্ছে এশিয়া সহ বিশ্বের তাবড় তাবড় দেশগুলি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল মনে মনে ভেবেছিল ইরানকে বুঝি হেলায় পর্যুদস্ত করা সম্ভব, কিন্তু যতদিন যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল বুঝতে পারছে ইরানের উপর একতরফা হানাদারিতে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবং সবেচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলি, পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য দেশ এবং ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি। ভারত এ অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বড় দেশ। ১৪০ কোটির বেশি এর জনসংখ্যা। সুতরাং ভারতে যে এর প্রভাব বেশি পড়বে তা বলাই বাহুল্য। এতদিন ধরে এদেশের বিরোধী দলগুলি এনিয়ে চিৎকার করলেও সরকারের ঘুম যেন ভাঙেনি। এবার সত্যি সত্যি বাঘ এসে পড়ল। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং সংসদে মুখ খুলে জানিয়ে দিয়েছেন যে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি এদেশে পড়তে চলেছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী করোনাকালের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। মূলত ভারত সহ এ অঞ্চলে জ্বালানি সংকটের মূল কারণ হচ্ছে ইরানের দখলে থাকা হরমুজ প্রণালী। হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারত সহ এ অঞ্চলে বিভিন্ন পণ্যবাহী জাহাজগুলি আসা যাওয়া করে। কিন্তু ইরানের উপর হামলা হওয়ায় ইরান এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ঠিক এর পর থেকেই জ্বালানি সংকট দেখা দেয় ভারতের মতো এশিয়ার অন্যতম জনবহুল দেশে। যা আজও অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে দেশে এলপিজির মারাত্মক চাহিদা। বহু রাজ্য, রাজধানীতে হোটেল, রেস্তোরাঁ বন্ধ শুধুমাত্র এলপিজির কারণে। এলপিজির এই সংকটের আবহে ভারত এলপিজিতে বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, কিন্তু সরকার বুঝতে পারছে যে, তা দিয়েও কাজের কাজ হবে না। এবার সুদূরপ্রসারী সংকট আগত দেশে। সরকারের আশঙ্কা এবার পেট্রোপণ্য থেকে ওষুধ শিল্প, সার সহ অন্যান্য পেট্রোকেমিক্যালে সংকট দেখা দেবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে এসে দেশের অর্থনীতিতে। এমনিতেই দেশের শেয়ার বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। সোনা, রূপার দাম ওঠানামা করছে। টাকার দাম ক্রমশ কমেই চলেছে ডলারের তুলনায়। দেশের কেন্দ্রীয় সরকার প্রথমদিকে বিষয়টিকে পাত্তা না দিলেও এবার কেন্দ্রীয় সরকার হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে যে, দেশে ব্যাপক সংকট ঘনীভূত হতে যাচ্ছে। সরকার এজন্য কী কঠোর পদক্ষেপ নেয় তাই এবার দেখার অপেক্ষায় রয়েছে দেশবাসী। সেজন্য কেন্দ্রীয় সরকার বুধবারই দেশের সব রাজনৈতিক দলগুলিকে ডেকে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করিয়েছে। মাত্র ২৪ ঘন্টা আগে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে জানিয়েছেন দেশের সংকট সমাগত। এবার ২৪ ঘন্টার মধ্যে কেন্দ্র সর্বদলীয় বৈঠক ডেকে বুঝিয়ে দিল যে, পরিস্থিতি বেজায় জটিল। সবার সহযোগিতা দরকার। বেজায় খারাপ পরিস্থিতিতে না পড়লে কেন্দ্রীয় সরকার সর্বদলীয় বৈঠক ডাকে না। তাই এবার সত্যি সত্যিই বোঝা যাচ্ছে যে, বিধি বাম। আর রক্ষে নেই। হয়তো কোন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে কেন্দ্র। চলমান সংকটময় পরিস্থিতির সমাধান কোনপথে তা নিয়ে দেশের আমজনতা সত্যিই উদ্বিগ্ন।