প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে সতর্কতা, আইনি পেশায় সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অবিরাম শিক্ষা: বিচারপতি ভূঁইয়া!!
দৈনিক সংবাদ অনলাইন, ১৫মার্চ: ভারতের সংবিধান শুধু একটি আইনি দলিল নয়। এটি সমতা, ন্যায়বিচার ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সামাজিক চুক্তি। ভবিষ্যতের আইনজীবী ও বিচারকদের দায়িত্ব হবে এই মূল্যবোধকে রক্ষা এবং আরও সমৃদ্ধ করা। শনিবার নরসিংগড় জুডিশিয়াল একাডেমির প্রেক্ষাগৃহে রাজ্যের জাতীয় আইন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত অপাংশু মোহন লোধ মেমোরিয়াল পাবলিক লেকচার অনুষ্ঠানে উদ্বোধকের ভাষণে এই কথাগুলি বলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া। বিচারপতি ভূঁইয়া আরও বলেন, আইন পেশার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অবিরাম শিক্ষা। অনেকেই মনে করেন, ডিগ্রি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আইন শেখা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে আইন এমন এক পেশা, যেখানে নিয়ম-কানুন সবসময় বদলাতে থাকে। তাই একজন আইনজীবী সারাজীবন আইনের ছাত্র হিসেবেই থেকে যান।
আইন পেশাকে তিনি ক্রিকেটের দীর্ঘ ইনিংসের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, এটা টি-টোয়েন্টি বা এক দিনের খেলা নয়। টেস্ট ক্রিকেটের মতো এখানে ধৈর্য, পরিশ্রম আর দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করার মানসিকতা থাকতে হয়।

তিনি আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তি আইন পেশায় সহায়ক হতে পারে, কিন্তু মানবিক বিচারবুদ্ধির বিকল্প কখনোই হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, একজন সফল আইনজীবীর জন্য সততা, সাহস, অধ্যবসায়, বাগ্মিতা,ধৈর্য, বিচারবুদ্ধি ও সহমর্মিতা- এই সাতটি গুণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালতে যুক্তি উপস্থাপনের সময় আবেগ নয়, বরং প্রস্তুতি ও যুক্তির শক্তিই আসল। ভারতে আইনি শিক্ষার প্রসঙ্গ টেনে বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, আগে আইন পড়ার সুযোগ খুব সীমিত ছিল। কিন্তু এখন দেশে বহু ন্যাশনাল ল’ ইউনিভার্সিটি ও আইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ফলে শিক্ষার্থীদের সামনে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রের দরজা খুলে গেছে। ভারতে বর্তমানে ২৭টির বেশি ন্যাশনাল ল’ ইউনিভার্সিটি এবং অসংখ্য আইন কলেজ রয়েছে। ফলে আইন শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগও বেড়েছে। আগে অনেকেই অন্য বিষয়ে সুযোগ না পেলে আইন পড়তে আসতেন। কিন্তু এখন অনেক শিক্ষার্থীর প্রথম পছন্দই আইন।
তিনি বলেন, আইন শুধু আদালতে চর্চা করার বিষয় নয়, এটা কল্পনাশক্তিকেও প্রসারিত করে। আইন পড়তে গেলে আমাদের অদৃশ্য সীমারেখা কল্পনা করতে হয় এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিস্থিতিও ভাবতে হয়। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভালো আইনজীবী হতে হলে শুধু আইনের বই পড়লেই হবে না, ইতিহাস, বিজ্ঞানসহ নানা বিষয়ের জ্ঞানও থাকা দরকার। তাঁর মতে, একজন ভালো আইনজীবী একদিকে ইতিহাসবিদের মতো চিন্তা করবেন, আবার অন্যদিকে সারাজীবনের ছাত্র হয়ে থাকবেন। বিচারপতি ভূঁইয়া একটি আমেরিকান প্রবন্ধের কথা উল্লেখ করে বলেন, আইন অধ্যয়ন কল্পনাশক্তিকে সবচেয়ে বেশি প্রসারিত করে।
আইনজীবীদের এমন অনেক বিষয় কল্পনা করতে হয় যা দৃশ্যমান নয়- যেমন আইনগত সীমা, ভবিষ্যৎ ফলাফল ও বিচারিক প্রভাব। বিচারপতি আইনজীবীদের সততা ও নৈতিকতার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, একজন আইনজীবী শুধু তাঁর মক্কেলের মুখপাত্র নন। তিনি আদালতের একজন কর্মকর্তা এবং ন্যায়বিচারের সহায়ক। তিনি ব্রিটিশ বিচারপতি লর্ড ডেনিং-এর একটি বক্তব্য উল্লেখ করে বলেন, আইনজীবীর প্রথম দায়িত্ব আদালতে এবং সত্যের প্রতি।
তিনি শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে বলেন, আইন পেশা সহজ নয়। এটিকে অনেক সময় “ঈর্ষান্বিত প্রেমিকা” বলা হয়- কারণ এটি সম্পূর্ণ নিষ্ঠা ও পরিশ্রম দাবি করে। তিনি ভারতের সংবিধানের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এই সংবিধান একটি অসাধারণ দলিল যা ভারতকে একটি সমতাভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেছে। এই সংবিধান তৈরিতে ড. বি. আর. আম্বেদকরের অবদান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ আইনজীবীদের দায়িত্ব হলো সংবিধানের মূল্যবোধ রক্ষা করা এবং তা আরও সমৃদ্ধ করা। অনুষ্ঠানে এছাড়াও আলোচনা করেন জাতীয় আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. যোগেশ প্রতাপ সিং, রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপার্সন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অরিন্দম লোধ প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন ত্রিপুরা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এম. এস. রামাচন্দ্র রাও, হাইকোর্টের বর্তমান ও প্রাক্তন অন্যান্য বিচারপতিগণ, বরিষ্ঠ আইনজীবী, আইনের ছাত্রছাত্রী প্রমুখ।