রাজনীতির গাজন নৃত্য
সম্পাদকীয়, ১২ মার্চঃ নাতনী সমাজে বিশেষ করে হিন্দু বাঙালিদের কাছে ‘গাজন নৃত্য’ বা ‘শিবের গাজন’ হলো একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও লোক উৎসব। যা বাংলা বছরের শেষ মাস অর্থাৎ চৈত্রের প্রথম দিন থেকে এই ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও লোক উৎসবের সূচনা হয়। সারা চৈত্র মাস ধরে চলে এই উৎসব। শেষ হয় চৈত্র মাসের শেষদিনে চড়ক পুজোর মাধ্যমে। পরের দিন পয়লা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। এই লোক সংস্কৃতি ও উৎসবের মূল বৈশিষ্ট হচ্ছে, ওই সময়ে নানা সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে শৈব সম্প্রদায়ের মানুষ শিব ও পার্বতী সেজে বাড়ি বাড়ি নৃত্য পরিবেশন করে। আবার রামায়ণ-মহাভারতের বিভিন্ন পালাও অভিনয়ের মাধ্যমে পরিবেশন করা হয়। আধুনিক জমানায় গ্রাম ত্রিপুরায় এই পৌরাণিক ঐতিহ্যবাহী লোক সংস্কৃতি এখনও কিছুটা টিকে আছে। চৈত্র মাস এলেই গ্রাম ত্রিপুরার নানা জায়গায় শিব-পার্বতীর গাজন নৃত্য লক্ষ্য করা যায়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, গাজন নৃত্যের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক কী? সেই অর্থে বলতে গেলে গাজন নৃত্যের সাথে রাজনীতির ধারে কাছেও কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক থাকারও কথা নয়। কেননা দুটোই একেবারে পরস্পর বিরোধী ভিন্ন মেরুর। তাহলে ‘রাজনীতির গাজন নৃত্য’ কথাটি এলো কোথায় থেকে? এই প্রশ্ন ওঠা একেবারে স্বাভাবিক। আসলেই এই কথাটি এসেছে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক, তথা রাজ্যের বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরীর মুখ থেকে। বুধবার সাক্রমের কলাছড়ায় এডিসি নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বর্তমান সরকারের দুই শরিককে নিশানা করে ‘গাজন নৃত্য’-এর প্রসঙ্গ উত্থাপন করে রাজনীতির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন।

জিতেন্দ্রবাবু কী বলেছেন? তিনি বলেছেন, ‘আমাদের গ্রাম ত্রিপুরাতে চৈত্র মাসে নানা জায়গায় ‘গাজন নৃত্য’ অনুষ্ঠিত হয়। এটি গ্রাম ত্রিপুরার একটি ঐতিহ্যবাহী লোক সংস্কৃতি। কিন্তু আমাদের রাজ্যের বর্তমান সরকারের দুই শরিক দল চৈত্র মাস আসার অনেক আগে থেকেই ‘গাজন নৃত্য’ শুরু করেছে।’ তার এই বক্তব্যের সারমর্ম এবং লক্ষ্য যে সরকারের দুই শরিকের (বিজেপি ও তিপ্রা মথা) কাজিয়া, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জিতেন্দ্রবাবু দুই শরিকের মধ্যে এই লড়াই ও বিরোধকে ঐতিহ্যবাহী লোক সংস্কৃতি গাজন নৃত্যের সাথে তুলনা করেছেন।
রাজনৈতিক মহলের অভিমত, বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী একেবারে সঠিক তুলনা করেছেন। গত কয়েক মাস ধরে রাজ্য রাজনীতিতে এক অদ্ভুত ধরনের এবং অস্বস্তিকর পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারের দুই শরিকদল একে অপরের বিরুদ্ধে হামলে পড়েছে। প্রকাশ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে হুমকি, ধমকি, একে অপরের রক্ত ঝড়ানো থেকে শুরু করে পার্টি অফিস পুড়িয়ে দেওয়া, সমর্থক থেকে শুরু করে নেতা-কর্মীদের উপরে আক্রমণ, বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, কিছুই বাদ রাখছে না। অথচ এরাই আবার একসাথে রাজ্য সরকার চালাচ্ছে। দেশের অন্য কোনো রাজ্যে এমন শরিকি বিরোধ আছে কিনা? খুঁজে পাওয়া যায়নি। মতাদর্শের বিরোধ থাকতে পারে। থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই বলে এমন হিংসাত্মক লড়াই, এককথায় নজিরবিহীন।
দুই শরিকের এই রক্তাক্ষয়ী লড়াই দেখে শুধু রাজনৈতিক মহলই নয়, রাজ্যবাসীও হতবাক। দুই শরিক একে অপরের বিরুদ্ধে যেভাবে কাদা ছোড়াছুড়ি করে চলেছে, তা দেখে রাজ্যের সচেতন নাগরিকরা হাসাহাসি করছেন। দুই শরিকের নেতা-নেত্রীরা নিজেদের এমন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন যে, তাদের এই কার্যকলাপ সার্কাসের মনোরঞ্জনকেও পর্যন্ত হার মানিয়ে দিয়েছে। বিরোধী নেতার ভাষায় রাজনীতির এই গাজন নৃত্য আরও কতদিন চলতে থাকবে? সেটাই এখন দেখার।