বৃহস্পতিবার | ১২ মার্চ ২০২৬

কূটনৈতিক মৌনতা

 কূটনৈতিক মৌনতা

সম্পাদকীয়, ১১ মার্চঃ পশ্চিম এশিয়ার আকাশে জ্বলতে থাকা যুদ্ধের আগুন আজ আর কেবল তেহরান কিংবা তেল আভিভের সীমান্তে আটকে নেই। সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ধীরে ধীরে আরব সাগর পেরিয়ে ভারতের অর্থনীতি ও গৃহস্থের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছতে শুরু করেছে। কারণ এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘স্ট্রেট অব হরমুজ’ ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগরকে সংযুক্ত করা সকীর্ণ সমুদ্রপথ, কিন্তু ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য যা কার্যত প্রধান ধমনী। আজ সেই জলপথের উপর যুদ্ধজাহাজের ছায়া। অথচ এই অগ্নিগর্ভ বাস্তবতার মাঝেও দিল্লির সেবাতীর্থে (সাবেক সাউথ ব্লক) বিরাজ করছে এক অস্বস্তিকর নীরবতা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে অর্থমন্ত্রী কিংবা প্রতিরক্ষামন্ত্রী – কারও মুখেই এখনও স্পষ্ট কূটনৈতিক অবস্থান শোনা যায়নি। ফলে প্রশ্নটি আরও জোরালো হচ্ছে: এই নীরবতা কি পরিণত কূটনৈতিক কৌশল, নাকি আন্তর্জাতিক সমীকরণের চাপে বাধ্যতামূলক সংযম?

ভূগোল ও পরিসংখ্যানের নির্মম সত্য এখানে উপেক্ষা করার উপায় নেই। হরমুজ প্রণালী থেকে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ের দূরত্ব আকাশপথে দুই হাজার কিলোমিটারেরও কম প্রায় দিল্লি থেকে আগরতলা যাওয়ার সমতুল। ভারতের ব্যবহৃত পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় নব্বই শতাংশই আমদানি করতে হয় এবং তার বড় অংশ আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে। বিশেষ করে এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে এই জলপথ কার্যত লাইফলাইন। আন্তর্জাতিক শিপিং ডেটা বলছে, দেড়শোরও বেশি তেলবাহী ট্যাঙ্কার এখন ওই অঞ্চলে অনিশ্চয়তার মধ্যে চলাচল করছে। যুদ্ধের উত্তাপ যত বাড়বে, সরবরাহে টান পড়া ততই অনিবার্য। ইতিমধ্যেই বাজারে গৃহস্থালির গ্যাসের দাম বেড়েছে এবং বিভিন্ন রাজ্যে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের ছবি সামনে আসতে শুরু করেছে। ফলে সরকারের ‘সব নিয়ন্ত্রণে আছে’ জাতীয় আশ্বাস সাধারণ মানুষের কাছে ক্রমশ অবিশ্বাস্য হয়ে উঠছে।

এই প্রেক্ষাপটে বিরোধীদের অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। তাদের বক্তব্য ইজরায়েলের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা দেখাতে গিয়ে ভারত তার দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্য নষ্ট করেছে। ইতিহাস বলছে, কাশ্মীর প্রশ্নে যখন ‘অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন’-এর বহু সদস্য রাষ্ট্র ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, তখন ইরান একমাত্র ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছিল। এমনকি এক সময় ডলারের পরিবর্তে ভারতীয় মুদ্রায় তেল বিক্রির বিশেষ ব্যবস্থাও চালু হয়েছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার পরে ২০১৮ সালে ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ করে দেয় ভারত। সেই সিদ্ধান্ত তখন কৌশলগত বাধ্যবাধকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, কিন্তু আজকের পরিস্থিতিতে তার দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক মূল্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সমস্যার অভিঘাত কেবল জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সামান্য বাড়লেই তার প্রভাব পরিবহণ খরচ থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের বাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। খারিফ মরশুমের আগে ডিএপি বা এসএসপি সার উৎপাদনের কাঁচামাল গন্ধকের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কৃষি অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়বে। এরই মধ্যে রাশিয়া, চিন এবং ইউরোপের একাধিক ছোট দেশ সংঘাত নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। কিন্তু ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার রাজনৈতিক উচ্চারণ থাকা সত্ত্বেও ভারত কেন এত সতর্ক ও নীরব- এই প্রশ্নও উঠছে।

কূটনীতিতে ‘স্ট্র্যাটেজিক সাইলেন্স’ অবশ্যই একটি কৌশল। কিন্তু সেই নীরবতার মূল্য যদি সাধারণ মানুষকে দিতে হয়, তবে তা আর কৌশল থাকে না বরং দুর্বলতার প্রতীক হয়ে ওঠে। অটল বিহারী বাজপেয়ীর সময় পশ্চিম এশিয়া প্রশ্নে ভারত যে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছিল, আজ তা ম্লান বলে মনে হচ্ছে। একদিকে প্যালেস্টাইনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান গ্রহণ করে সমর্থনের বার্তা দেওয়া, অন্যদিকে প্রকাশ্যে ইজরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা; এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার যে কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছিল, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই সমীকরণকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

অতএব প্রশ্নটি আর কেবল তেলের দাম বা গ্যাসের সিলিন্ডারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; প্রশ্নটি ভারতের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মর্যাদা নিয়েও। যুদ্ধের আগুন ভারতের সীমান্তে না এলেও তার ধোঁয়া ইতিমধ্যেই অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে ছড়িয়ে পড়ছে। যদি কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশের ভুলে মানুষকে মূল্যবৃদ্ধির আগুনে পুড়তে হয়, তবে তার দায় এড়ানোর উপায় শাসকের নেই। এখন দেখার বিষয়, দিল্লি কি এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট উত্তর দেবে, নাকি নীরবতাকেই নীতি বলে প্রতিষ্ঠা করবে। ইতিহাস সাক্ষী, ঘরের মানুষকে অনাহারে রেখে বিশ্বমঞ্চে নীরব দর্শক সেজে থাকা কোনও সার্থক কূটনীতির পরিচয় হতে পারে না। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করার সাধ্য ভারতের নেই, এটা সত্য। কিন্তু তার অভিঘাত সামলানোর প্রস্তুতি নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *