মঙ্গলবার | ১০ মার্চ ২০২৬

বন্দে মাতরম বিতর্ক

 বন্দে মাতরম বিতর্ক

সম্পাদকীয়, ৯ মার্চঃ কিছুদিন আগে সংসদে বন্দে মাতরম নিয়ে বিতর্ক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিছুদিন হ হঠাৎ কেন্দ্রের এই বন্দে মাতরম-প্রীতি নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন।
অনেকে সরবও হয়েছিলেন। অনেকেই আবার প্রশ্ন তুলেছিলেন বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ করে কেন্দ্র সরকার কেন বন্দে মাতরম নিয়ে এত উৎসাহিত এবং আচ্ছাদিত। আদতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত এই বন্দে মাতরম গানের এ বছর দেড়শ বছর পালিত হচ্ছে। তাই কেন্দ্রীয় সরকার বন্দে মাতরম নিয়ে একটু বেশিই উৎসাহিত। এছাড়া নজরে পশ্চিমবঙ্গ ভোট তো রয়েছেই। বাঙালি সেন্টিমেন্টকে উসকে দিতেই কেন্দ্রের এই নয়া ভাবনা বলেও অনেকে মনে করেন। সংসদে বন্দে মাতরম নিয়ে বিতর্কে কেন্দ্রীয় সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখে বারবারই উঠে এসেছে কংগ্রেসের সমালোচনা। অন্যদিকে বিরোধীরাও বন্দে মাতরম বিতর্ক নিয়ে বিজেপির দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার আবার সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং স্কুল ও কলেজে বন্দে মাতরম গাওয়া বাধ্যতামূলক করেছে। এবার এ নিয়ে শুরু হয়েছে ফের বিতর্ক। এবং এর বিরোধিতা প্রকাশ্যে এসেছে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলো থেকে। সম্প্রতি নাগাল্যান্ডে বন্দে মাতরম নিয়ে বেজায় আপত্তি উঠেছে। শুধু নাগাল্যান্ড কেন, মিজোরাম, মেঘালয় ইত্যাদি খ্রিস্টান-অধ্যুষিত রাজ্যগুলো থেকেও বন্দে মাতরম নিয়ে আপত্তি উঠেছে। আপত্তি উঠেছে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টিতেও। জন গণ মন ভারতের জাতীয় সঙ্গীত, আর বন্দে মাতরম হচ্ছে আমাদের দেশের জাতীয় গীত। কেন্দ্রের হঠাৎ মনে হয়েছে, বন্দে মাতরমের দেড়শ বছরে বন্দেমাতরম গাওয়া সরকারি স্তরে বাধ্যতামূলক করতে হবে। এবং তাই সম্প্রতি দেশের সর্বত্র সরকারি অনুষ্ঠান এবং স্কুল ও কলেজে বন্দে মাতরম গানটি পুরো গাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।

নাগাল্যান্ডে বন্দে মাতরম নিয়ে আপত্তির বিষয়টি আর কিছুই নয়, বলা হচ্ছে বন্দে মাতরম গানে কিছু লাইন রয়েছে বাংলায় এবং এতে মন্দির গড়া, দেবী বন্দনার মতো বিষয়গুলি উপস্থিত থাকায় সে রাজ্যের জনজাতি ও খ্রিস্টানরা অনেকটাই বিরক্ত এবং অসন্তুষ্ট। সম্প্রতি নাগাল্যান্ড বিধানসভায় রাজ্যপালের বক্তৃতার পর এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক দানা বাঁধে। দলমত নির্বিশেষে বিধায়করা একটা দাবি করেন নাগাল্যান্ডের মতো খ্রিস্টান-অধ্যুষিত রাজ্যে এমন গান বাধ্যতামূলক করা সাংবিধানিকভাবে ধর্মীয় জটিলতার জন্ম দিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিধায়করা ১৯৮৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেন যে, সুপ্রিম কোর্ট তখন জানিয়েছিল বন্দে মাতরম গাওয়া বাধ্যতামূলক নয় এবং কাউকে জোর করে গান গাওয়ানো হলে তা সংবিধানে প্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী হতে পারে। বিধায়করা আরও বলেন, নাগাল্যান্ডের জনগণ জন গণ মন গান গেয়ে তাদের দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন যে, এই দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদই এই দেশের শক্তি। যদিও শেষ পর্যন্ত তীব্র বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হয়। রাজ্যের বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনও এতে আপত্তি জানিয়েছে। ব্যাপ্টিস্ট চার্চ কাউন্সিল বন্দে মাতরম গাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং দেশের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে।

নাগাল্যান্ডের দিকে দিকে এখন এই ইস্যুতে উত্তাল পরিস্থিতি। মিজোরামের একই অবস্থা। মিজোরামের বিভিন্ন সংগঠনের মতে, বন্দে মাতরমের কেন্দ্র-নির্দেশিত অংশ অতিরিক্ত দীর্ঘ। সেখানে সরাসরি হিন্দুধর্মের দেবদেবীকে প্রার্থনা এবং মন্দির গড়ার কথা রয়েছে। এটা একটা দেশে ধর্মীয় নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। মেঘালয়েরও খোদ বিজেপি নেতৃত্ব মনে করে, এভাবে অপরিচিত সংস্কৃতি পালনে জনজাতীয় খ্রিস্টানদের বাধ্য করা হলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। আসল কথা হচ্ছে, কেন্দ্র যেভাবে একতরফাভাবে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা গত কয়েক বছর ধরে শুরু করেছে, তা নিয়েই যত বিরোধিতা এবং আপত্তি। কেন্দ্রের শাসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ইচ্ছে করে ইতিহাসকে বিকৃত করছে এবং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ও বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য নষ্ট করতে চাইছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ খ্রিস্টধর্মাবলম্বী মানুষজন মনে করেন, বৈষম্য ছাড়াই ব্যক্তিগতভাবে ধর্ম পালন, আচরণ এবং প্রচার করার স্বাধীনতা প্রত্যেকের মৌলিক অধিকার। সংবিধানে এ কথা বলা রয়েছে। সুতরাং বন্দে মাতরম নিয়ে উত্তর-পূর্বে যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে, কেন্দ্রকেই এর গভীর সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *