শুক্রবার | ০৬ মার্চ ২০২৬

নেপালের ব্যালটের লড়াই

 নেপালের ব্যালটের লড়াই

সম্পাদকীয়, ৫ মার্চঃ দক্ষিণ এশিয়ার ছোট পাহাড়ি দেশ নেপাল আবারও ইতিহাসের এক দ সন্ধিক্ষণে দাড়িয়েট খাতিবার অনুষ্ঠিত আতীয় নিবাসের কবল একটি সংসদ গঠনের প্রক্রিয়া নয়; বরং গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি এবং তরুণ প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের বিরুদ্ধে জনগণের রায় দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। গত বছরের ছাত্র আন্দোলন ও সরকার পতনের পর এই নির্বাচন কার্যত পুরোনো রাজনীতি বনাম নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার এক গণভোটে পরিণত হয়েছে।

গত কয়েক দশক ধরে নেপালের রাজনীতিতে প্রধান প্রভাব বিস্তার করেছে কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী দল-বিশেষ করে নেপালি কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (Unified Marxist-Leninist)। এই দুই শক্তির মধ্যে ক্ষমতার পালাবদলই যেন হয়ে উঠেছিল নেপালের রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু বাস্তবে সেই পালাবদল দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে খুব বড় কোনও পরিবর্তন আনতে পারেনি। কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্নীতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা-সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা দীর্ঘদিন ধরেই জমে উঠছিল।

এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। রাজধানী কাঠমান্ডু-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্র ও তরুণদের নেতৃত্বে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। সেই আন্দোলনে প্রাণ হারান প্রায় ৭৫ জন মানুষ। তীব্র জনচাপের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সেই মুহূর্ত থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়। নেপালের রাজনীতিতে পরিবর্তনের দাবিটি আর উপেক্ষা করার মতো নয়।

এই প্রেক্ষাপটেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে বর্তমান নির্বাচন। প্রায় দুই কোটি ভোটারের অংশগ্রহণে ২৭৫ সদস্যের প্রতিনিধি সভা গঠনের এই ভোটে শুধু রাজনৈতিক দলগুলির শক্তির পরীক্ষা নয়, বরং গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থারও পরীক্ষা হচ্ছে। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা। গত বছরের আন্দোলনের পর ভোটার তালিকায় প্রায় ১০ লাখ নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই তরুণ। তারা দুর্নীতিমুক্ত শাসন, স্বচ্ছতা এবং কর্মসংস্থানের দাবিকে সামনে রেখেই ভোটের ময়দানে নেমেছেন।

এই নির্বাচনের সবচেয়ে প্রতীকী লড়াইটি হচ্ছে প্রবীণ রাজনীতিক কে পি শর্মা ওলি এবং তরুণ প্রজন্মের জনপ্রিয় মুখ বলে শাহ-এর মধ্যে। একদিকে বহু দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় উজ্জীবিত নতুন নেতৃত্ব- এই দ্বন্দ্বই যেন আজকের নেপালের রাজনীতির মূল চিত্র। একই সঙ্গে তরুণ নেতা গগন থাপা কিংবা রবি লামিছানে-র মতো নতুন প্রজন্মের নেতারাও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি করছেন।

বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির উত্থান অনেক বিশ্লেষকের মতে নেপালের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী দলগুলির প্রতি মানুষের হতাশা যত বাড়ছে, ততই নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আগ্রহও বাড়ছে। যদিও এই নতুন শক্তি ক্ষমতায় এলে তারা কতটা কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারবে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।

নেপালের রাজনীতির আরেকটি বড় সমস্যা হল দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা। ১৯৯০ সালের পর থেকে দেশটিতে ৩০ বারেরও বেশি সরকার পরিবর্তন হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যেন নেপালের রাজনীতিতে এক বিরল ঘটনা। এই পরিস্থিতিতে আজকের নির্বাচন যদি আবারও ভাঙা জোট ও অস্থায়ী সরকারের জন্ম দেয়, তাহলে মানুষের হতাশা আরও বাড়তে পারে।

তবে আশার জায়গাটিও একেবারে অদৃশ্য নয়। গত বছরের আন্দোলন দেখিয়েছে যে নেপালের নাগরিক সমাজ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও সক্রিয়। তারা রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে কেবল প্রতিবাদ করেই থেমে থাকতে চাইছে না; বরং সরাসরি রাজনীতির ভেতরেই পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি এখানেই।

আজকের এই নির্বাচন তাই কেবল একটি সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়; বরং নেপালের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। যদি এই ভোট সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করে, তাহলে তা শুধু নেপাল নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে উঠতে পারে।

-কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি একটাই গত বছরের রক্তাক্ত রাস্তার আন্দোলন কি সত্যিই ব্যালটের মাধ্যমে ক্ষমতার কাঠামো বদলে দিতে পারবে? নাকি নেপালের রাজনীতি আবারও পুরোনো চক্রেই আবর্তিত হবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে নেপালের আগামী দিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *