নজিরবিহীন!
সম্পাদকীয়ঃ এসআইআর নিয়ে নজিরবিহীন সংঘাত এবং এর জেরে এবার ব্যবস্থার হস্তক্ষেপ। ২টি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এরকম সংঘাতে রিতিমতো বিরক্ত দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এ রাজ্যের এবার নির্বাচনি কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ করলো এবার সুপ্রিম কোর্ট। দেশের ৯ রাজ্যে বর্তমানে এসআইআর চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর হয়ে ওঠেছে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের বিষয়টি। এ নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে মামলা হয়েছে। মামলাতে সওয়াল করেছেন খোদ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। এবার এর জেরে চূড়ান্ত বিরক্ত সুপ্রিম কোর্ট। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। এই সংস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করে থাকে। যে কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে স্বাধীনভাবে। কিন্তু বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের কার্জকর্ম নিয়ে এও প্রশ্ন ওঠছে এই সংস্থার স্বাধীনসত্তা নিয়ে বেজায় প্রশ্ন রয়েছে জনমনে।
তাই এসআইআর প্রক্রিয়া চালুর পর থেকেই বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে এ নিয়ে সরকারের সাথে নির্বাচন কমিশনের সংঘাত চলছে। পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে তৃণমূল পরিচালিত সরকার চলছে। যা কেন্দ্রের শাসক বিজেপি পরিচালিত সরকারের বিরোধী। তাই প্রতি পদে পদে তৃণমূলের সাথে নির্বাচন কমিশনের সরাসরি সংঘাত চলছে গত প্রায় মাস তিনেক ধরে। তৃণমূলের প্রতিনিধিদল বেশ কয়েকবার দিল্লীতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনের সাথে দেখা করেছে এবং নানা অভিযোগ জানিয়ে এসেছেন। সুপ্রিম কোর্টে মামলাও হয়েছে। মামলার শুনানি হয়েছে। কিছু নির্দেশিকা এসেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপরও পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর নিয়ে ঝামেলা মিটছিল না। ফলে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা পিছিয়ে যায় সে রাজ্যে।
নির্বাচন কমিশনের সাথে কোনও রাজ্য সরকারের এই ধরনের সংঘাত নজিরবিহীন ঘটনা। নির্বাচন কমিশন অনেকটা হচ্ছে ক্রিকেটে আম্পায়ার কিংবা ফুটবল মাঠে রেফারির ভূমিকায় থাকার কথা। কিন্তু নির্বাচন কমিশন যদি সেই ভূমিকায় না থাকে তাহলে তো তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও সমানে সমানে নির্বাচন কমিশনের সাথে টক্কর দিচ্ছে। সাধারণত নির্বাচন কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপ করে না বিচার বিভাগ। আগে বহু ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠলেও মোটামুটিভাবে নির্বাচন কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপ করতে চায়নি সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের কাজে পুরোপুরি হস্তক্ষেপ করেছে। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনি সংক্রান্ত নানা কাজ তদারকিতে এবার বিচারক নিয়োগ করার কথা বলেছে সুপ্রিম কোর্ট।
বিচারকরা যা নির্দেশ দেবে তাই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ হিসাবে গণ্য হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট
এটা গোটা দেশের ইতিহাসে একটা নজিরবিহীন ঘটনা। এই ধরনের ঘটনা গোটা দেশে আর কোনোদিন ঘটেনি। সুপ্রিম কোর্ট কতটা বিরক্ত হলে এই ধরনের নির্দেশ দিতে পারে তা এই নির্দেশই প্রমাণ করে।
সরকার হচ্ছে জনগণের ভোটে নির্বাচিত। আর নির্বাচন কমিশন স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। ২টাই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। দুই প্রতিষ্ঠানই এরকম সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়েছে যে শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট আর ধৈর্য ঠিক রাখতে পারেনি। একেবারে বিচারক নিয়োগ করে নির্বাচন কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপ করেছে। অন্যদিকে রাজ্য সরকারও কড়া বার্তা দিয়েছে। এবার আর পশ্চিমবঙ্গ সরকার আর নির্বাচন কমিশনের করার কি কিছু আছে।
অন্তত এসআইআরের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কাজে যদি এভাবে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করে তাহলে ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশনের কাজে আর কি স্বচ্ছতা আশা করবে জনগণ? নির্বাচন কমিশন মানুষের মনে আস্থা কীভাবে জোগাবে?
প্রতিটি বিষয়েই মানুষকে যদি আদালত, আইনের দারস্থ হতে হয় তাহলে নির্বাচন কমিশন থেকে কি লাভ? সরকার না হয় আসে যায় কিন্তু নির্বাচন কমিশন তো আর কোনো রাজনৈতিক দল নয়- যে আজ আছে তো কাল নেই। সুতরাং নির্বাচন কমিশনকে আত্মশুদ্ধির সময় এসেছে। কেন তাদের কাজে বিচার ব্যবস্থা হস্তক্ষেপ করবে তা ভেবে দেখতে হবে তাদেরই।