বৃহস্পতিবার | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

শুভ সংকেত নয়

 শুভ সংকেত নয়

সম্পাদকীয়, ১৮ ফেব্রুয়ারী: বছরে দুই কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি ছিল এক সময়ের রাজনৈতিক ভাষ্যের কেন্দ্রবিন্দু। সেই অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসে নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন সরকার। এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে আজ যখন বেকারত্বের হার ফের ৫ শতাংশে পৌঁছায়, তখন প্রশ্ন ওঠে- এটি কি কেবল একটি মৌসুমি ওঠানামা, নাকি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান সঙ্কটের লক্ষণ? পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি মন্ত্রকের অধীনস্থ জাতীয় পরিসংখ্যান অফিস (এনএসও)-এর সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বেকারত্বের হার ছিল ৪.৮ শতাংশ, যা জানুয়ারীতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ শতাংশে। সংখ্যাগত দিক থেকে বৃদ্ধি সামান্য হলেও এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য গভীর। কারণ ডিসেম্বরেই প্রথমবারের মতো হারটি ৫ শতাংশের নিচে নেমেছিল-যা সরকার স্বস্তির নিদর্শন হিসাবে তুলে ধরেছিল। সেই স্বস্তি এক মাসেই ভঙ্গ হয়ে গেছে।

সরকারী রিপোর্টে গ্রামীণ বেকারত্ব বৃদ্ধির পেছনে আবহাওয়াগত কারণ, ফসল কাটার পরবর্তী মন্দা এবং কৃষিক্ষেত্রে উৎসাহহীনতার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শীতকালে নির্মাণ, পরিবহণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসার গতি কমে যাওয়ার যুক্তিও সামনে আনা হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির মৌলিক প্রশ্ন হলো- এই কারণগুলো কি নতুন? প্রতি বছরই কৃষিক্ষেত্রে ফসল কাটার পর একটি ‘লিন সিজন’ আসে। নির্মাণক্ষেত্রেও শীতকালে কিছুটা মন্থরতা থাকে। যদি এক দশকের উন্নয়নযাত্রায় অর্থনীতি যথেষ্ট বহুমুখী ও স্থিতিশীল হয়ে উঠত, তবে মৌসুমি ধাক্কা এতটা স্পষ্টভাবে জাতীয় বেকারত্ব সূচকে প্রতিফলিত হত কি?

এখানেই কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত মিলছে। ভারতের কর্মসংস্থানের বড় অংশ এখনও কৃষিনির্ভর ও আনুষ্ঠানিক খাতে কেন্দ্রীভূত। শিল্প ও উৎপাদন খাতে প্রত্যাশিত বিস্তার না ঘটলে মৌসুমি ধাক্কা থেকেই যায়। বেকারত্বের হার বাড়ার পাশাপাশি কমেছে শ্রমশক্তি ও অংশগ্রহণের হার (LFPR) ও শ্রমিক জনসংখ্যা অনুপাত (WPR)। এই দুই সূচক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেকারত্বের হার কখনও কখনও বিভ্রান্তিকরণ হতে পারে-যদি মানুষ কাজ খোঁজা বন্ধ করে দেয়, তবে তারা বেকারের তালিকায় থাকেন না।

এলএফপিআর কমা মানে, কর্মক্ষম বয়সের অনেক মানুষ হয়তো আশা ছেড়ে দিয়েছেন বা শ্রমবাজার থেকে সরে গিয়েছেন। বিশেষত মহিলাদের অংশগ্রহণের হার ঐতিহাসিকভাবে কম- যা অর্থনীতির সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাকে সীমিত করে।

এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগজনক। কারণ এটি কেবল কর্মসংস্থানের ঘাটতি নয়, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক আস্থাহীনতারও ইঙ্গিত দেয়। ভারতের জনমিতিক সুবিধা (demographic dividend) বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। তরুণ জনসংখ্যাই দেশের শক্তি- এই ধারণা রাজনৈতিক ভাষ্যে বারবার ফিরে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার অনেক বেশি।

উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা উপযুক্ত চাকরি না পেয়ে হয় অস্থায়ী ও কম মজুরির কাজে যুক্ত হচ্ছেন, নয়তো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বছরের পর বছর কাটাচ্ছেন। সরকারী চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, শূন্যপদ পূরণে অনীহা এবং বেসরকারী খাতে নিয়োগের মন্থরতা-সব মিলিয়ে এক গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে।

যে অর্থনীতি বছরে লক্ষ লক্ষ নতুন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে, সেখানে পর্যাপ্ত ‘গুণগত কর্মসংস্থান’ সৃষ্টি না হলে সেই মানবসম্পদ বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। গত এক দশকে স্টার্টআপ ইন্ডিয়া, স্কিল ইন্ডিয়া, মেক ইন ইন্ডিয়া, আত্মনির্ভর ভারত-এমন বহু প্রকল্প ঘোষণা হয়েছে। কাগজে কলমে উদ্যোগের অভাব নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রকল্পগুলো কতটা স্থায়ী ও বৃহৎ পরিসরের চাকরি সৃষ্টি করতে পেরেছে?

স্টার্টআপ সংস্কৃতি মূলত শহুরে ও প্রযুক্তিনির্ভর। তা কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুললেও, গ্রামীণ বা স্বল্পদক্ষ শ্রমিকদের জন্য সমাধান নয়। স্কিল ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচি দক্ষতা বাড়ালেও, বাজারে যদি চাহিদা না থাকে তবে সেই দক্ষতার সদ্ব্যব্যবহার হয় না।

অর্থাৎ সমস্যা শুধু প্রশিক্ষণের নয়, চাহিদা সৃষ্টির। উৎপাদন, রপ্তানি ও অবকাঠামো বিনিয়োগে টেকসই বৃদ্ধি ছাড়া কর্মসংস্থানের বিস্তার অসম্ভব। গত বছর থেকে মাসিক ও ত্রৈমাসিক বেকারত্বের হিসাব নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে- এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি প্রয়োজন সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ ও নীতিগত সংশোধন।

৫ শতাংশ বেকারত্ব আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে হয়তো মাঝারি স্তর। কিন্তু ভারতের বিপুল জনসংখ্যার প্রেক্ষাপটে এই হার মানে লক্ষ লক্ষ কর্মহীন মানুষ। তার সঙ্গে যদি এলএফপিআরকমে, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল। যদি বছরে ২ কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি ধরা হয়, তবে এক দশকে অন্তত ২০ কোটির বেশি নতুন চাকরি সৃষ্টি হওয়ার কথা। বাস্তব পরিসংখ্যান সেই দাবি সমর্থন করে না। বরং অনুষ্ঠানিক ও অস্থায়ী কর্মসংস্থানের আধিক্যই বেড়েছে।

এই ব্যবধান কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়- এটি নীতিগত আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্গঠন না করলে উন্নয়ন কেবল ডিজিপি বৃদ্ধির পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বেকারত্বের ৫ শতাংশ কোনও বিচ্ছিন্ন সংখ্যা নয়, এটি অর্থনীতির অন্তর্নিহিত কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। মৌসুমি কারণ দেখিয়ে দায় এড়ানো সহজ, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কঠিন।

ভারতের মতো জনবহুল দেশে কর্মসংস্থান শুধু অর্থনৈতিক সূচক নয়-এটি সামাজিক স্থিতি, রাজনৈতিক স্থায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নের ভিত্তি। তাই প্রয়োজন প্রতিশ্রুতির পুনর্মূল্যায়ন, নীতির বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং শিল্পোন্নয়ন কেন্দ্রীক সুদুর প্রসারী পরিকল্পনা। নচেৎ, ৫ শতাংশ কেবল একটি পরিসংখ্যান নয় এটি হয়ে উঠতে পারে এক অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির স্থায়ী স্মারক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *