সম্পর্কের সন্ধিক্ষণ
সম্পাদকীয়, ১৭ ফেব্রুয়ারী: বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রায় দীর্ঘ দুই দশক পরে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতার প্রত্যাবর্তন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দল, এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তারেক রহমান। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা-র ক্ষমতাচ্যুতির পর যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অন্তবর্তী প্রশাসন এবং রাস্তায় আন্দোলনের আবহ তৈরি হয়েছিল, তার পরিসমাপ্তিতে এই নির্বাচন নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক কাঠামোর পুনঃপ্রতিষ্ঠার বার্তা বহন করে। কিন্তু নির্বাচন কোনও গন্তব্য নয়- এটি এক নতুন রাজনৈতিক পর্বের সূচনা। আর সেই সূচনাতেই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নটি হল ঢাকা-দিল্লী সম্পর্ক কি নতুন ভিত্তি পাবে, নাকি পুরনো অবিশ্বাসই প্রাধান্য পাবে?
নয়াদিল্লী দ্রুততার সঙ্গে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-র বার্তা কেবল সৌজন্য নয়, এটি কৌশলগত তৎপরতারও প্রতিফলন। গত এক দশকে শেখ হাসিনার আমলে দুই দেশের সম্পর্ক যে ঘনিষ্ঠতা অর্জন করেছিল-সন্ত্রাসবাদ দমন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সংযোগ প্রকল্প ও বিদ্যুৎ বাণিজ্যে-তা দক্ষিণ এশিয়ার এক সফল দ্বিপাক্ষিক মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু হাসিনার পতনের পর রাজনৈতি সমীরকরণ বদলে যায়, এবং জনমতের একাংশে ভারতবিরোধী সংশয় বাড়তে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লীর দ্রুত বার্তা আসলে একটি কূটনৈতিক স্বীকারোক্তি-প্রতিবেশী বাংলাদেশকে আগের সম্পর্কের উষ্ণতাতেই দেখতে চায় ভারত।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভাষ্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে তিনি যে সুর তুলেছেন-দিল্লী নয়, পিন্ডি নয়- সবকিছুর আগে বাংলাদেশ- তা একাধারে জাতীয়তাবাদী এবং ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা। এতে যেমন দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে স্বাধীন অবস্থানের বার্তা রয়েছে, তেমনই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলিকে জানানো হচ্ছে যে ঢাকা কোনও একক অক্ষের দিকে ঝুঁকবে না। অনেকেই এই অবস্থানকে ডোনাল্ড ট্রাম্প এর (আমেরিকা প্রথম) নীতির প্রতিধ্বনি বলে ব্যাখ্যা করছেন, কিন্তু বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা চিত্র ভিন্ন। এখানে সমদূরত্ব মানে একাধিক শক্তির মধ্যে সুক্ষ্ম ভারসাম্য- ভারত, চিন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা, কিন্তু নির্ভরতার ফাঁদে না পড়া। সমস্যা হল, কৌশলগত বাস্তবতা এবং জনমতের আবেগ সবসময় একই পথে চলে না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার সীমান্ত, বিস্তৃত বাণিজ্য, আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ গ্রিড, রেল ও সড়ক করিডোর- সব মিলিয়ে পারস্পরিক নির্ভরতা গভীর। কিন্তু ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ এবং হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনায় একাংশের মনে প্রশ্ন জেগেছে- ভারত কি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পক্ষপাতদুষ্ট? তারেক রহমানকে তাই এক কঠিন সমীকরণ সামলাতে হবে, ভারতের সঙ্গে বাস্তববাদী সহযোগিতা বজায় রাখা, অথচ দেশের ভিতরে ‘জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন’- এর অভিযোগ থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
এই সমীকরণে সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যু তিনটি- সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, তিস্তার জলবন্টন এবং সীমান্তে হত্যাকাণ্ড। সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রেক্ষিতে তারেকের মন্তব্য- ‘ধর্ম ব্যক্তিগত, রাষ্ট্র সকলের’ আশাব্যঞ্জক। কিন্তু কথার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে প্রশাসনিক পদক্ষেপ। সংখ্যালঘু সুরক্ষার প্রশ্নটি এখন কেবল মানবাধিকারের বিষয় নয়, এটি ভারতের সঙ্গে আস্থার সম্পর্কের পরীক্ষাও। তিস্তা চুক্তি দীর্ঘদিন ঝুলে আছে, এর সমাধান হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন ভিত্তি তৈরি হতে পারে। সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনাও দুই দেশের মধ্যে আবেগঘণ বিতর্কের বিষয়: এখানে মানবিক ও নিরাপত্তা সংবেদনশীল সমাধান প্রয়োজন।
সবচেয়ে জটিল প্রশ্নটি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে। এটি আইনি, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তিন স্তরেই বিস্ফোরক। তারেক রহমান যদি এ বিষয়ে তীব্র অবস্থান নেন, তবে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে। আবার সম্পূর্ণ নীরব থাকলেও দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক চাপ বাড়বে। এই ইস্যুই সম্ভবত নতুন সরকারের প্রথম বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা।
প্রশ্ন থেকে যায়-তারেক রহমান কী সত্যিই এক পরিবর্তিত বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করছেন? অতীতে বিএনপি-ভারত সম্পর্ক ছিল সন্দেহ ও দূরত্বে পরিপূর্ণ। কিন্তু সময় বদলেছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি এখন আরও বহুমাত্রিক, চিনের প্রভাব, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প- সব মিলিয়ে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা পাশাপাশি চলছে। এই বাস্তবতায় সংঘাত নয়, স্থিতিশীলতাই উভয় দেশের স্বার্থে।
ঢাকা ও দিল্লীর সম্পর্ক অনেক সময় ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’- এর সঙ্গে তুলনা করা হয়-একটি যাত্রা, যা মাঝে মাঝে থেমেছে, আবার চলেছে। এখন সেই যাত্রা এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে। ইতিহাসের ভার, জনমতের সংশয় এবং কৌশলগত প্রয়োজন-এই তিনের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। ব্যর্থ হলে পুরনো অবিশ্বাসই ফিরে আসবে।
অতএব, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। তারেক রহমানের সামনে সুযোগ রয়েছে-অতীতের ছায়া অতিক্রম করে বাস্তববাদী, আন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গড়ে তোলার। একইভাবে নয়াদিল্লীরও প্রয়োজন সংবেদনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা।
দুই দেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লেখা শুরু হয়েছে। সেটি সহযোগিতা হবে, নাকি পুনরাবৃত্ত সংঘাতের-তার সিদ্ধান্ত এখন নেতৃত্বের হাতে।