ভোটের রাজনীতির অঙ্কেই মাপা হতো পূর্বোত্তর: মোদি
দৈনিক সংবাদ অনলাইন ডেস্ক, ১৪ ফেব্রুয়ারী: কেন্দ্রীয় বাজেট পেশের পর উত্তর-পূর্বে এটিই ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-র প্রথম সফর। সেই সফরেই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণ শানিয়ে উত্তর-পূর্বকে ‘অষ্টলক্ষ্মী’ আখ্যা দিলেন তিনি। তার কথায়, বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের কাছে উত্তর-পূর্ব মানে কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, বরং সমৃদ্ধি, শক্তি ও অগ্রাধিকারের প্রতীক। আজ গুয়াহাটির সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দিন “আগেই সংসদে কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ হয়েছে এবং বাজেটের পরে উত্তর-পূর্বে এটাই তাঁর প্রথম সফর। তিনি দাবি করেন, কংগ্রেস আমলে যে অঞ্চল অবহেলিত ছিল, সেটিকে উন্নয়নের মূল স্রোতে এনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান সরকার। তার ভাষায়, উত্তর-পূর্বকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে তুলতে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে এবং পরিকাঠমো উন্নয়নে নজিরবিহীন বিনিয়োগ হয়েছে। অসমের প্রাপ্য আর্থিক বরাদ্দের প্রসঙ্গ তুলে নরেন্দ্র মোদি বলেন, এ বছর রাজ্য প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা কর ভাগ হিসেবে পাবে, যা কংগ্রেস আমলে প্রায় ১০হাজার কোটির কাছাকাছি ছিল। গত ১১ বছরে কেন্দ্র থেকে ৫ লক্ষ ৫০ হাজার কোটিরও বেশি অর্থ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এই অঙ্কগুলিই প্রমাণ করে, উত্তর-পূর্ব আজ আর প্রান্তিক নয়- বরং দেশের বিকাশযাত্রার অন্যতম অগ্রভাগে রয়েছে।
পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, একসময় উত্তর-পূর্বের নাম উঠলেই বিছিন্নতা ও দুর্বল যোাগযোগের কথা মনে পড়ত। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। এমন মহাসড়ক তৈরি হয়েছে যেখানে কেবল যানবাহনই নয়, প্রয়োজনে বিমানও অবতরণ করতে পারে। মরান এলাকায় বায়ুসেনার বিমানের অবতরণকে তিনি ‘নতুন অসমের প্রতীক’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, উন্নত সড়ক মানে শুধু যাতায়াত নয়, বরং কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের নতুন সুযোগ। উন্নত সংযোগ ব্যবস্থার ফলে পর্যটনের প্রসার ঘটছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ব্রহ্মপুত্রের উপর ভিত্তি করে নদীপথ পর্যটনের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত ‘পরীক্ষা পে চর্চা’ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা স্মরন করে তিনি বলেন, উত্তর-পূর্বের সংস্কৃতি ও প্রকৃতির আকর্ষণ গোটা দেশের কাছে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক আক্রমণে কংগ্রেসকে কাঠগড়ায় তুলে নরেন্দ্র মোদি বলেন, যারা ‘মা ভারতী’-কে সম্মান করে না, তারা দেশের মঙ্গল সাধন করতে পারে না। তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে উত্তর-পূর্বকে ভোটের রাজনীতির বাইরে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিজেপি সেই মানসিকতার পরিবর্তন এনেছে বলেও দাবি করেন তিনি। সমাবেশে দলীয় কর্মীদের ভূমিকাও বিশেষভাবে তুলে ধরেন নরেন্দ্র মোদি। নিজেকে প্রথমে একজন বিজেপি কর্মী হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় একজন দলীয় কর্মী হওয়া। দলের বর্তমান উচ্চতায় পৌছানোর সমস্ত কৃতিত্ব তিনি তৃণমূল স্তরের কর্মীদের উৎসর্গ করেন। তার কথায়, সংগঠনের শক্তিই পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি। বুথ স্তরের কর্মীদের সতর্ক ও সক্রিয় থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনে সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে সংগঠনের মাটির কাছকাছি কাজের মধ্যে।
অসমের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথাও এ দিন উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। মা কামাখ্যার আশীর্বাদের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, উত্তর-পূর্বের শক্তিই ভারতের শক্তি। ২০১৪ সালের পর থেকে উত্তর-পূর্বের ১২৫ জনেরও বেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে পদ্ম সম্মানে সম্মানিত করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি, যা এই অঞ্চলের জাতীয় গুরুত্বের স্বীকৃতি।
সমাবেশের দিনটি ছিল পুলওয়ামা হামলার বর্ষপূর্তি। ২০১৯ সালে ওই জঙ্গি হামলায় শহিদ নিরাপত্তাকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের জবাব বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে। দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সরকার আপসহীন- এই বার্তাও দেন তিনি। এ বছর প্রথমার্ধেই অসমে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে নরেন্দ্র মোদির ভাষণকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। উন্নয়ন, জাতীয় গর্ব, আঞ্চলিক পরিচয় এবং সাংগঠনিক শক্তির বার্তা মিলয়েই তিনি কর্মীদের উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করেছেন। উত্তর-পূর্বকে ‘অষ্টলক্ষ্মী’ হিসেবে তুলে ধরে তিনি যে রাজনৈতিক বার্তা দিলেন, তা নির্বাচনের আগে কতটা প্রভাব ফেলবে, এখন সেদিকেই নজর।