আধুনিক যুগে মোবাইল ফোন ছাড়া দুনিয়া ভাবা প্রায় অসম্ভব। সেই মোবাইল বিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হলেও বর্তমান সময়ে তা কি মানবসভ্যতার কাছে অভিশাপস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে? এই প্রশ্ন এখন চারিদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে। যেভাবে বিশেষ করে যুবসমাজ, ছাত্রছাত্রীরা মোবাইলের আসক্তিতে মজেছে তাতে চিন্তিত বর্তমান সমাজ। ভবিষ্যৎ বিপন্ন ভেবে ত্রাহি ত্রাহি রব ডাকছে সর্বত্র মোবাইলের এই বাড়বাড়ন্তে। মাত্র এক দশকের কিছু বেশি সময় মোবাইলের এই বিপ্লব গোটা পৃথিবীকে যেন খাদের কিনারায় নিয়ে দাঁড় করাবে তা ভবিষ্যতের গর্ভে প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া যায়। বিজ্ঞানের আশীর্বাদ না অভিশাপ- এই নিয়ে তর্ক বিতর্ক বহুকালের। যতদিন যাচ্ছে প্রযুক্তির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এবং প্রযুক্তি নির্ভর গোটা ব্যবস্থা মানুষকে রীতিমতো যন্ত্রদানবে পরিণত করে ফেলেছে। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় বিজ্ঞানের এই শতকের অন্যতম আবিষ্কার মোবাইল ফোন এই একদশকে কত জীবন কেড়ে নিয়েছে তার ইয়তা নেই। সেজন্যই কি বিজ্ঞানের এই আবিষ্কার ছিল? একলহমায় গোটা বিশ্ব এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। যা দুই দশক আগেও কল্পনা করা যেত না। মোবাইলের দৌলতে অনেক ব্যবসার গঙ্গাপ্রাপ্তি হয়েছে যা কিনা আগে বাজারে বসে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতেন।
যেমন ফটোতোলার স্টুডিও, রেল, প্লেনের টিকিট কাটার এজেন্সি। এখন ঘরে বসেই টিকিট কাটা যায়। ফটো তোলা যায় মোবাইলেই। এককথায় দামি ক্যামেরার ভাত কেড়ে নিয়েছে এই মোবাইল বিপ্লব। আরও কতকিছু এই মোবাইল কেড়ে নিয়েছে। পরিবর্তে নয়া প্রজন্মের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে মোবাইল। নয়া প্রজন্ম এখন মজেছে মোবাইলের রিলে। নয়া প্রজন্ম মজেছে মোবাইলে গেম খেলতে, চ্যাট করতে। সোশ্যাল মিডিয়া এখন মোবাইল বিপ্লবের এক জলজ্যান্ত উপমা যেখানে প্রত্যেকেই এখন স্বাধীন চেতা হয়ে উঠেছেন একেকজন। এতে বিপদ বাড়ছে বৈ কমছে না।অতি সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে এক মর্মান্তিক ঘটনা সকলকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একই সাথে তিন বোন নতলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মঘাতী হয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে মোবাইলের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি। মোবাইল ছাড়া তাদের চলতই না। পড়াশোনাও তারা ছেড়ে দেয় কেবলমাত্র মোবাইল আসক্তির জন্য। তাদের কোরিয়ান গেমের প্রতি এত নেশা ছিল যে তা-ই তাদের ধ্যান জ্ঞান ছিল। তিন বোন একসঙ্গে সময় কাটাত, একসঙ্গে একঘরে থাকত। সারাদিন মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকত। সম্প্রতি তাদের বাবা তাদের মোবাইলগুলি কেড়ে নেয় এবং তা বিক্রি করে দেয়। এতেই তারা এতটা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে যে নিজেরা আত্মহননের সিদ্ধান্ত নেয়।এই ঘটনা আজকালকার সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে বর্তমান প্রজণাকে খাদের কিনারায় নিয়ে দাঁড় করাতে মোবাইলই যথেষ্ট।শুধু এই ঘটনাটিই নয়, প্রতিদিন এই দেশে, বিশ্বের নানা প্রান্তে এই মোবাইলকে ঘিরে যে কত অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে তার ইয়তা নেই।
আর এতে জড়িয়ে পড়ছে ছাত্রছাত্রী থেকে কিশোর, কিশোরী,যুবসমাজ। মোবাইল এখন পুরোপুরি ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশু, কিশোরদের মনে মোবাইল এমন প্রতিক্রিয়া কাজ করেছে কোনো নেশাদ্রব্য গ্রহণ করলে যেমনটা হয়। মনোবিদরা শিশু, কিশোরদের এত মোবাইল আসক্তিতে রীতিমতো চিন্তিত। তারা উদ্বিগ্ন। তারাও ভেবে পাচ্ছেন না এর শেষ কোথায়। এর সমাধান কি। শিশু কিশোরদের এই অতিরিক্ত মোবাইল আসক্তি, প্রীতিতে লাগাম টানতে হলে একদিকে নজরদারি বাড়ানো দরকার। শুধু পড়াশোনা বা উদ্ভাবনী কাজে মোবাইল বাচ্চারা ব্যবহার করছে কিনা তাতে নজরদারি রাখতে হবে অভিভাবকদের। একই সাথে নিয়মিত বাচ্চাদের কাউন্সিলিং দরকার। শিশুদের আবেগ অনুভূতি, চাহিদা বোঝতে হবে।একই সাথে তাদেরও বোঝাতে হবে। সুতরাং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।এটি শুধু কোনো পরিবারের বিষয় নয়। এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব।