অনলাইন প্রতিনিধি :-'আমি ফুলকে যেদিন ধরে বেঁধে আমার সাজি ভরেছি। আমি সেদিন থেকেই জেতা বাজি হেরেছি'।কিন্তু না,কল্যাণপুরের শংকর শীল জেতা বাজি তো হারেন- নিই, বরং হারা বাজিকে জেতা বাজিতে রূপান্তর করে আজ স্বনির্ভর এক ফুলচাষি। আজ থেকে ঠিক আট বছর আগের কথা।তখন বছর ত্রিশের কোঠায় দাঁড়িয়ে থাকা স্বপ্নিল চোখের এক যুবক শংকর শীল। চোখে স্বপ্ন থাকলেও মনে ছিল এক ভয়ানক অনিশ্চয়তার ভয়। না, তিনি সরকারী কাজের আশায় বসে না থেকে শুরু করেন ফুল দিয়ে বিয়ে উৎসব বাড়ি সাজানোর কাজ। শুরু হয় তার যাবতীয় দৌড়ঝাঁপ। সেই দৌড়ঝাঁপই আজ তাকে এনে দাঁড় করিয়েছে খোয়াই জেলার অন্যতম সফল ও দৃষ্টান্তমূলক প্রান্তিক ফুলচাষির তালিকায়।শংকরের কর্মজীবনের শুরুটা হয়েছিল সামাজিক অনুষ্ঠান ও বিয়ে বাড়িতে ফুলের সাজসজ্জার ক্ষুদ্র ব্যবসা দিয়ে। জীবিকার তাগিদে আগরতলা শহরের বিশিষ্ট ফুল ব্যবসায়ী নারায়ণ সাহার সঙ্গে গড়ে ওঠে তার যোগাযোগ। নারায়ণ সাহার অনুপ্রেরণা, অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতাই যেন শংকরের জীবনে আশার আলো জ্বালিয়ে দেয়। প্রথমদিকে আগরতলা থেকে ফুল কিনে এনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাজসজ্জার কাজ করলেও তাতে তেমন লাভ হচ্ছিল না।পরিবহণ খরচ ও বাজার নির্ভরতার কারণে লাভের অঙ্ক ছিল সীমিত।তখনই নিজের উৎপাদনের দিকে মনোনিবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। নিজস্ব জমি না থাকায় ২০১৭ সালে কুঞ্জবন গ্রামের বাসিন্দা মাখন দাসের কাছ থেকে জমি নিয়ে শুরু করেন ফুল চাষ। প্রথমদিকে তাকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় অর্থাভাব, প্রযুক্তিগত অজ্ঞতা, বাজার ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং সরকারী সহায়তার অভাব। অনেক সময় হতাশাও গ্রাস করেছিল তাকে। তবুও অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর একরোখা জেদে পিছিয়ে পড়েননি শংকর। পরিশ্রম ও ধৈর্যকেই তিনি হাতিয়ার করে এগিয়ে চলেন। সময়ের সঙ্গে রাজ্যেও সরকার পরিবর্তন হয় এবং এর প্রভাব পড়ে শংকরের উদ্যোগে।সরকারী উদ্যোগে বাগানের জমিতে বসানো হয় সোলার সিস্টেম, যা সেচ ব্যবস্থাকে আরও সহজ করে তোলে। কৃষি দপ্তর, দিব্যোদয় কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র ও নাবার্ড-এর সহযোগিতায় আধুনিক ফুল চাষের প্রযুক্তি ও কলাকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ লাভ করেন তিনি। এমনকী সরকারী সহায়তায় দিল্লী ও কলকাতায় বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের দক্ষতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন শংকর।শংকর শীল প্রতিবেদককে জানান, শুধু ফুল চাষের মধ্যেই তার ব্যবসা এখন সীমাবদ্ধ নেই।তিনি এ বছর সবজিও চাষ করেছেন।এর মধ্যে রয়েছে ব্রকোলি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, আলু, টমেটো, সরিষা, ভুট্টা,তরমুজ ইত্যাদি। আর ফুলের মধ্যে প্রধানত চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, হলুদ ও অন্য রঙের গাঁদা, কাশি গাঁদা, চেরি ফুল ইত্যাদি। নিছক বাগান সাজানোর জন্য বাগান চাষ করেন না তিনি। যে ফুল বাজারজাত করা যায় সেই ফুলই লাগান তিনি। আগামীদিনে অর্কিড ফুল চাষের পরিকল্পনাও রয়েছে তার। সুপরিকল্পিত চাষ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও রঙিন ফুলের সমাহারে তার ফুলের বাগান যেন এক জীবন্ত সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি। শংকরের উৎপাদিত ফুল বর্তমানে কল্যাণপুর, খোয়াই, তেলিয়ামুড়া ও আগরতলার বাজারে বিক্রি হচ্ছে। নিজস্ব দোকান না থাকলেও বিয়েবাড়ি, পুজোপার্বণ, সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাজসজ্জায় তার ফুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।বর্তমানে তার বাগানে নিয়মিত তিন থেকে চারজন শ্রমিক কাজ করে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছেন।বিভিন্ন সময়ে সরকারের আধিকারিকরাও ছুটে যাচ্ছেন তার বাগান পরিদর্শনে।নিষ্ঠা,একাগ্রতা এবং কিছু করে দেখানোর মানসিকতা থাকলে যে সরকারী চাকরির পিছনে না ছুটেও স্বনির্ভর হওয়া যায় -কল্যাণপুরের শংকর শীল এর জ্বলন্ত
উদাহরণ।বলতে গেলে তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বেকারদের নতুন এক বার্তা দিয়েছেন। তার এই সাফল্য নিঃসন্দেহে আগামী দিনে বহু বেকার যুবক-যুবতীর কাছে হয়ে উঠবে আত্মনির্ভরতার অনুপ্রেরণামূলক পথনির্দেশ।