শনিবার | ৩১ জানুয়ারি ২০২৬

বাংলা সিনেমাপ্রেমীদের কাছে এ আনন্দ সীমাহীন, বড় খুশীর দিন…

 বাংলা সিনেমাপ্রেমীদের কাছে এ আনন্দ সীমাহীন, বড় খুশীর দিন…

ভাষা বা ইন্ডাস্ট্রির সীমা তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতাকে কখনও আটকাতে পারেনি।

বাবা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের প্রযোজিত ছবি ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’-র হাত ধরেই ক্যামেরার সামনে প্রথম দাঁড়িয়ে ছিলেন খুদে শিল্পী প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শিশু শিল্পীই বড় হয়ে উঠেছেন রোম্যান্টিক হিরো হিসেবে, দখল করেছেন বাংলা সিনেমার মূল স্রোত। একের পর এক হিট ছবি, বৈচিত্র্যময় চরিত্র আর দর্শকের সঙ্গে গভীর সংযোগ তাকে ধীরে ধীরে পরিণত করেছে টলিপাড়ার সবচেয়ে আপনজন— সবার প্রিয় ‘বুম্বাদা’-তে। শুধু বাংলা ইন্ডাস্ট্রির মধ্যেই নিজেকে আটকে না রেখে, সম্প্রতি টলিপাড়ার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি পা রেখেছেন বি-টাউনেও। আর সেখানেও নিজের অভিনয় দিয়ে প্রমাণ করেছেন— ভাষা বা ইন্ডাস্ট্রির সীমা তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতাকে কখনও আটকাতে পারেনি। লিখছেন আনন্দিতা সরকার।

বছর শুরুর প্রারম্ভেই টলিউড পেল এক বিরাট সুখবর। শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান পদ্মশ্রী পাচ্ছেন অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। রবিবার, প্রজাতন্ত্র দিবসের আগের দিন কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৬ সালের পদ্মসম্মান প্রাপকদের তালিকা প্রকাশ করতেই বাংলা জুড়ে আনন্দের আবহ। দীর্ঘ ছয় দশকের অভিনয় জীবনে যিনি নিজেকে বারবার ভেঙেছেন, গড়েছেন, আজ সেই ‘বুম্বাদা’র রাজমুকুটে যোগ হলো নতুন পালক। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় যাত্রা শুরু হয়েছিল খুব অল্প বয়সে। বয়স তখন মাত্র ছয়। ষাটের দশকে হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’ ছবিতে শিশু শিল্পী হিসেবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান তিনি। আশির দশকে পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবিতে কাজ শুরু হলেও, ১৯৮৭ সালের ‘অমর সঙ্গী’র হাত ধরে তার প্রকৃত অর্থে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা। তারপর টানা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলা সিনেমার অবিচ্ছেদ্য মুখ।
একটা সময় যখন বাংলা বাণিজ্যিক ছবি গভীর সংকটে, তখন প্রায় একাই ইন্ডাস্ট্রির হাল ধরেছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। অঞ্জন চৌধুরী, স্বপন সাহা, হরনাথ চক্রবর্তীর মতো পরিচালকদের সঙ্গে একের পর এক সুপারহিট ছবি তাকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়। আবার অন্য দিকে ঋতুপর্ণ ঘোষ, গৌতম ঘোষের ছবিতে নিজেকে ভেঙে এক নতুন অভিনেতার জন্ম দেন। ‘দোসর’, ‘অটোগ্রাফ’, ‘মনের মানুষ’, ‘শঙ্খচিল’-এর মতো ছবিতে তার অভিনয় আজও দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। ‘দোসর’ ছবির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন আগেই, এবার পদ্মশ্রী সম্মান।প্রসেনজিৎ অনুরাগীরা এই সম্মান প্রাপ্তিতে যারপরনাই খুশি। এতে দায়িত্ব আরও বাড়ল বলেই মনে করেন স্বয়ং প্রসেনজিৎ। প্রায় ৩৫০ টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করা এই শিল্পীর কাজের ব্যাপ্তি আজও দর্শককে অবাক করে।


জানা গেছে, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় তখন নিজের সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘বিজয়নগরের হীরে’-র প্রদর্শনী দেখতে প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত ছিলেন। বহু বছর পরে আবার তিনি কাকাবাবু চরিত্রে বড়পর্দায় ফিরেছেন ‘বিজয়নগরের হীরে’ ছবির মাধ্যমে। আর সেই সময়ই তিনি জানতে পারেন তার পদ্মশ্রী প্রাপ্তির খবর। এই খবর শোনার পর প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পাওয়া পদ্মশ্রী সম্মানের যোগ্য মনে করা হয়েছে তাকে, এই পুরো বিষয়টাই তার কাছে ভীষণ গর্বের। তবে তিনি এও জানিয়েছেন, এই সম্মান তার একার নয়। নিজের প্রাপ্তিকে তিনি উৎসর্গ করেছেন পরিচালক, সহ-অভিনেতা, টেকনিশিয়ান, প্রযোজক এবং দর্শকদের। ‘জাতিস্মর’ নায়কের কথায়, গত ৪০ বছর ধরে যারা তার পাশে থেকেছেন, তাদের ছাড়া তিনি কখনওই প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় হতে পারতেন না। বিশেষ করে তিনি স্মরণ করেছেন প্রয়াত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষকে— একজন অভিনেতার নিজেকে কীভাবে কখন ভাঙা উচিত সেটা ঋতুপর্ণ ঘোষই তাকে শিখিয়েছিলেন। ‘প্রাক্তন’ নায়ক প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের জীবনে মা রত্না চট্টোপাধ্যায়ের অবদান অনেকখানি। প্রায় অনেক সাক্ষাৎকারেই তিনি এই কথা বলে থাকেন। তাই পুরস্কার পাওয়ার পরে মা-য়ের কথা বারবার উঠে এসেছে তার আপ্লুত কণ্ঠে।


সুপারস্টার প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হওয়ায় বাংলার অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালক দর্শক-সহ ক্যামেরার পেছনে থাকা প্রত্যেকে আনন্দে আত্মহারা। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী জানিয়েছেন, তিনি খুব খুশি। একসময় ইন্ডাস্ট্রির খুব খারাপ অবস্থায় প্রায় একার কাঁধে ভর করে বাংলা সিনেমাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। তবে বাংলা ছবি হয়তো সেই স্তরে পৌঁছতে অনেক দেরি করে ফেলেছে। আর সেই কারণেই প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতার এই সম্মানে ভূষিত হতে এতটা সময় লেগে গেল। পাশাপাশি প্রসেনজিতের বোন পল্লবী চট্টোপাধ্যায় দাদার এই প্রাপ্তিতে খুশি। তার কথায়, দেরিতে হলেও যোগ্য মানুষ যোগ্য সম্মান পেয়েছেন। এতেই তিনি আপ্লুত।


প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এমন একজন অভিনেতা যিনি বাণিজ্যিক ও সমান্তরাল— দুই ধারার ছবিতেই একটানা অভিনয় করে গেছেন। ষাট পেরিয়েও তার মধ্যে কাজের খিদে এতটুকু কমেনি। সিনেমা, ওয়েব সিরিজ, বাংলা-হিন্দি মাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি। ‘জুবিলি’, ‘স্কুপ’, ‘খাকি: দ্য বেঙ্গল চ্যাপ্টার’-এর মতো সিরিজ তাকে পৌঁছে দিয়েছে সর্বভারতীয় দর্শকের কাছে। এরকম একজন শিল্পীর মুকুটে এরকম একটা সম্মান মানানসই। বাংলা ইন্ডাস্ট্রিকে তিনি কতটা ভালোবেসেছেন এবং ভালোবাসেন তা বোঝা যায় বাবা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের এক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে। কোনও এক সময় এই বর্ষীয়ন অভিনেতা তার একমাত্র ছেলে প্রসেনজিতকে বলেছিলেন মুম্বাইতে গিয়ে কাজ করতে। বাবার বিশ্বাস ছিল, তার ছেলে যে মাপের অভিনেতা তাতে খুব সহজেই বলিউডে প্রসেনজিৎ নিজের জায়গা করে নিতে পারবেন। কিন্তু প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় তা করেননি এবং অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা সামলেও থেকে গেছেন এই বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতেই। হয়তো সেই জন্যই তিনি আজ টলিউডের অভিভাবক হয়ে উঠতে পেরেছেন।


আরও একটা বিষয় যার জন্য প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ইন্ডাস্ট্রিতে অনেকের কাছেই আইকন— তিনি ষাটে পোঁছেও নিজেকে যেভাবে ফিট রেখেছেন শারীরিক এবং মানসিক ভাবে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কোনও এক সাক্ষাৎকারে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ওরফে বাঙালির বুম্বাদা জানিয়েছিলেন, আই ইট সিনেমা, ড্রিঙ্ক সিনেমা, স্লিপ সিনেমা। আজ এই পর্যায়ে এসে তার এই কথা প্রমাণিত হলো সারা দেশের সামনে। কোনও কিছুকে মানুষ মন থেকে ভালো না বাসলে, মন থেকে পুরোপুরি গ্রহণ না করলে তার মধ্যে কখনওই যাপন করতে পারেন না। ঠিক তেমনই প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় সিনেমার মধ্যেই বিরাজ করেন। ‘জুলফিকর’-এর গানের সেই লাইন— ‘রাজার মুকুট… রাজার সাজ…’ আজ সত্যি হলো টলিউডের অভিভাবক প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের জীবনে। বাঙালির গর্বে আরও এক উজ্জ্বল অধ্যায় যোগ হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *