January 19, 2026

আত্মতুষ্টির রাজনীতি

 আত্মতুষ্টির রাজনীতি

অনলাইন প্রতিনিধি :- কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান মন্ত্রকের সর্বশেষ কর্মী সমীক্ষা রিপোর্ট (পিএলএফএস) একদিকে যেমন দেশের শ্রমবাজার নিয়ে সরকারের জন্য সামান্য স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনই কয়েকটি উদ্বেগজনক ইঙ্গিতও স্পষ্ট করে তুলছে। সামগ্রিকভাবে বেকারত্বের হার সামান্য হলেও বৃদ্ধি পেয়েছে এমন একটি সময়ে, যখন মূল্যবৃদ্ধি ফের মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে। এই যুগপৎ প্রবণতা দেশের কাজের বাজারের অস্বস্তিতে মেঘ ঘন করছে। দেশে বেকারত্ব বাড়ছে- এই সরল সত্যটিকে আড়াল করতেই কি সরকারী পরিসংখ্যানের শব্দচয়ন এত সাবধানী, এত আত্মরক্ষামূলক। কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান মন্ত্রকের সাম্প্রতিক কর্মী সমীক্ষা রিপোর্ট (পিএলএফএস) একদিকে সামান্য স্বস্তির গল্প শোনাতে চাইলেও, গভীরে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক ভয়াবহ বাস্তবতা- ভারতের শ্রমবাজার ফের অস্বস্তিতে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে। ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সিদের মধ্যে বেকারত্বের হার নভেম্বরে ৪.৭ শতাংশ থেকে ডিসেম্বরে বেড়ে ৪.৮ শতাংশে পৌঁছেছে। সরকার ও তার অনুগত ব্যাখ্যাকারীরা একে 'সামান্য বৃদ্ধি' বলে হাল্কা করতে চাইছেন। কিন্তু অর্থনীতির ইতিহাস জানে- বেকারত্বের গ্রাফ কখনও হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে না, ধীরে ধীরে চেপে ধরে। এই সামান্য বৃদ্ধিই তা আগামী দিনে বড় সংকেত। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র শহরাঞ্চলের। শহরে বেকারত্বের হার ৬.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬.৭ শতাংশ। অথচ শহরই ছিল সরকারের তথাকথিত উন্নয়ন, পরিকাঠামো বিস্তার এবং 'ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস'এর প্রদর্শনী মঞ্চ। আজ সেই শহরেই কাজ নেই, নিরাপত্তা নেই, ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই। পরিষেবা ক্ষেত্র, ক্ষুদ্র শিল্প, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান-সবখানেই চাপ স্পষ্ট। গ্রামীণ বেকারত্ব ৩.৯ শতাংশে 'স্থির' আছে বলে স্বস্তির ঢাক পেটানো হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- স্থির মানেই কি ভালো? গ্রামে কর্মসংস্থানের সুযোগ যেখানে বহু বছর ধরেই সংকুচিত, সেখানে এই স্থবিরতা আসলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতারই নামান্তর। কাজ না বাড়লে, আয় না বাড়লে, সেই স্থিতিশীলতা দারিদ্র্যের স্থায়ী বন্দোবস্ত ছাড়া আর কিছু। নয়।
এ অবস্থায় সরকার দাবি করছে, ভারতের কাজের বাজার নাকি আগের তুলনায় স্থিতিশীল। পুরুষ ও মহিলাদের কর্মসংস্থানের হার নলে বাড়ছে, কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষের অনুপাত উন্নতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু এই দাবির ভিত কতটা শক্ত? অর্থনীতিবিদদের একাংশ ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন সরকারী পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। সরকারী তথ্য আর বেসরকারী সমীক্ষার ফারাকই বলে দিচ্ছে-চিত্রটা যতটা উজ্জ্বল দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে ততটা নয়। কাজ পাওয়া মানেই কি মর্যাদাপূর্ণ কাজ? কাজ পাওয়া মানেই কি পর্যাপ্ত মজুরি? কাজ পাওয়া মানেই কি স্থায়ী নিরাপত্তা? এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোনও উত্তর সরকারী রিপোর্ট দেয় না। বরং কাজের গুণগতমান, মজুরির স্থবিরতা এবং অনানুষ্ঠানিক শ্রমের বিস্তার- এই কঠিন বাস্তবসতাগুলোকে পরিসংখ্যানের আড়ালে চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আরও আশঙ্কার বিষয়, মূল্যবৃদ্ধি ফের মাথাচাড়া দিচ্ছে। খুচরো ও পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়োগে রাশ টানছে শিল্প ও ব্যবসা ক্ষেত্র। ইতিহাস বলছে, মূল্যবৃদ্ধি আর বেকারত্ব একসঙ্গে বাড়লে তা সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পথ প্রশস্ত করে। নতুন বছরের জানুয়ারীর পরিসংখ্যান তাই আরও অস্বস্তিকর ছবি তুলে ধরতে পারে-এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো- এই পরিস্থিতিতে সরকারের আত্মসমালোচনার সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। কর্মসংস্থান নিয়ে দায় স্বীকার নেই, নীতি সংশোধনের ইঙ্গিত নেই। বরং পরিসংখ্যানের কৌশলী ভাষায় পরিস্থিতিকে 'ম্যানেজ' করার প্রবণতাই চোখে পড়েছে। এই আত্মতুষ্টির রাজনীতি চলতে থাকলে, পরিসংখ্যান আর বাস্তব জীবনের ফারাক আরও বাড়বে। দেশের যুব সমাজ আজ কাজের সন্ধানে দিশাহারা। শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে, শহরের মধ্যবিত্ত ক্রমশ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে যাচ্ছে। এই অবস্থায় উন্নয়নের গল্প শোনানো শুধু অসংবেদনশীলই নয়, বিপজ্জনকও। সোজা কথা- বেকারত্ব বাড়ছে, কাজের বাজার চাপের মুখে, আর সরকার বাস্তব সমস্যার মোকাবিলা না করে সংখ্যার কারসাজিতে ব্যস্ত। এই রাজনীতি যদি বদল না হয়, তবে পরিসংখ্যান যতই সাজানো হোক, দেশের কর্মহীন মানুষের ক্ষোভ একদিন তার হিসাব ঠিকই নিয়ে নেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *