January 16, 2026

নতুন বছর কোন পথে!!

 নতুন বছর কোন পথে!!

যারা বিশ্বরাজনীতির খবরাখবর রাখেন, তাদের মধ্যে খুব কম লোকই ২০২৫ সালকে বিদায় জানাতে দুঃখ পেয়েছেন। অত্যন্ত বিশৃঙ্খল, অস্থির ও টালমাটাল ছিল সারা বিশ্ব। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিপুল অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এই সময়ে, এর অধিকাংশের পেছনে একমাত্র না হলেও প্রধান কারণ হয়েছিল আমেরিকা। নতুন বছর শুরু হয়ে গেছে। বছরের শুরুতেই ট্রাম্প সরকারের বর্ষপূর্তির অন্য তোড়জোড় এখন। আর এই তোড়জোড় ব্যবস্থাকে ঘিরে রেখেছে অন্য এক পরিবেশ। একটি রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে আসার পর ট্রাম্প এইবার গ্রিনল্যান্ড দখল করে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।বছরের প্রথম পক্ষে ট্রাম্প যা যা করেছেন এই পর্যন্ত তা যদি বিবরণ আকারে দেখা হয় তাহলে তার তালিকায় আছে, গভীর রাতে ভেনেজুয়েলায় হামলা, দেশটির নেতাকে গ্রেপ্তার করা এবং তাকে ও তার স্ত্রীকে বিচারের জন্য নিউইয়র্কে তুলে নিয়ে যাওয়া। ট্রাম্প ও তার শীর্ষ সহযোগীরা ন্যাটো সদস্য ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে চাপ প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করার হুমকি দেন। অত:পর ৭ জানুয়ারী ট্রাম্প ঘোষণা দেন, আমেরিকা ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে সরে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্ত:সরকার প্যানেল (আইপিসিসি) এবং পার্টনারশিপ ফর আটলান্টিক কো-অপারেশন, যা আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার একটি উদ্ভাবনী বহুপক্ষীয় কাঠামো। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে অবশিষ্ট অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিটির মেয়াদ (কৌশলগত পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা সীমিত করে) আগামী মাসেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এখনও আলোচনা করেননি, এর জায়গায় কী আসবে।
যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বেশ কয়েকটি বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান থেকে সরে গেছে গত বছরে। আর যা যা করেছেন তার তালিকায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও প্যারিস শান্তিচুক্তি থেকে সরে গেছেন। ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ইউএসএইড) বন্ধ করে দিয়েছেন এবং জাতিসংঘের বহু সংস্থার টাকা কমিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তিগুলোকে সরাসরি আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়। মার্কিন প্রশাসন তাদের গুরুত্বপূর্ণ জোটগুলো পুরোপুরি পরিত্যাগ না করলেও কোনো যৌথ অ্যাজেন্ডার দিকে এগোনোর স্পষ্ট ইঙ্গিতও দিচ্ছে না। ট্রাম্প এ ধরনের পদক্ষেপগুলি গ্রহণের ক্ষেত্রে ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্রদের ভূমিকা ও প্রতিক্রিয়ার দিকেও তাকাচ্ছেন না। ট্রাম্পের বক্তব্য, আচরণ কেবল তার দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; তা সরাসরি মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা ভাবনা, কূটনৈতিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তিকেও নড়বড়ে করে দিচ্ছে।এতে স্পষ্ট হচ্ছে যে, প্রথমত ট্রাম্প কোনো নজির, কোনো নিয়ম বা আইনের তোয়াক্কা করছেন না এবং তাকে নিরুৎসাহিত করার জন্য আশেপাশে কেউ নেই। তার মিত্র রাষ্ট্রপ্রধানেরা, কংগ্রেস কিংবা আদালত-কোনো দিক থেকেই এখন পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বছর আগে তার অভিষেক ভাষণে বড় বড় যুদ্ধের অবসান ঘটানো ও শান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছিলেন। বাস্তবে তা করা কঠিনই প্রমাণিত হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রাষ্ট্রভিত্তিক সশস্ত্র সংঘাতের সংখ্যা ছিল গত সাত দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। সেই রেকর্ড ২০২৫ সালেও বজায় থাকে। বছর কেটে গেলেও ইউক্রেন ও সুদানে শান্তিচুক্তি অধরাই থেকে গেছে। আর এ সময়ে গাজায় তিন ধাপের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনাও কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে।২০২৬ কেমন যাবে? শুরুটা দেখার পর যে কেউ বলবেন-লক্ষণ মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সংঘাত পূর্বাভাস ব্যবস্থা বলছে, এ বছর যুদ্ধজনিত মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে ইউক্রেন, সুদান, ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইনে। অথচ এসব সংঘাত ট্রাম্প শেষ করতে চান বলে বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন। নতুন সংযোজন ভেনেজুয়েলা। ট্রাম্প যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা মোটেও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য নয়। তেল নিরাপত্তার চেয়ে অন্য শক্তিগুলোকে তেল থেকে দূরে রাখাই সম্ভবত ট্রাম্পের উদ্দেশ্য। মাদুরোর শাসনামলে চিন, কিউবা, ইরান ও রাশিয়া- সবাই লাভবান হয়েছে। শুধু গত বছরই ভেনেজুয়েলার রপ্তানিকৃত মোট অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশ নিয়েছে চিন। এই বছর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে নজর রাখার একটি বিষয় হবে কংগ্রেস। মার্কিন সিনেট একটি “ওয়ার পাওয়ারস” ধারা এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার ভেতরে বা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে কংগ্রেসকে আগাম জানাতে হবে। এতে ট্রাম্প প্রশাসন প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। কিন্তু এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না যা বাস্তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর কার্যকর করা বা তার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যাবে।ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো কাণ্ডে ইউরোপীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়া ছিল তুলনামূলক সংযত। অনেকেই প্রকাশ্যে তীব্র ভাষা ব্যবহার করেননি, যেন ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়াতে হয়। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় যখন ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেন। তখন ইউরোপীয় নেতারা আর নীরব থাকতে পারেননি। কারণ গ্রিনল্যান্ড কেবল একটি দ্বীপ নয়; এটি ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামো, আর্কটিক অঞ্চলের ভারসাম্য এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ভূমিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *