এই কথা ঠিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইহুদিরা এই প্রথম প্রচণ্ড মার খেলো। মার খেয়েছে ইরানের হাতে।এই বিষয়টি ইজরায়েল যেমন মেনে নিতে পারছে না তেমনি ইজরায়েলের মার খাওয়া সহ্য করতে পারেনি ইসরায়েলের সহোদর বা বৃহৎ ছায়া আমেরিকা। ফলে ইরান যে বিশ্বশক্তির চরম শত্রু হিসাবে যুদ্ধের ময়দানেই থাকবে তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু ইরানকে আজ শুধু বাইরের শত্রুর মোকাবিলারই নয়, ঘরের অশান্তিও সামলাতে হচ্ছে। শাসক ইসলামিক রিপাবলিক দশকের পর দশক ধরে ইরানের ভেতরের বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করে রেখেছে, এমনকি প্রাক্তন প্রেসিডেন্টদেরও কারাগারে পাঠিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খোমেইনি নির্বাচিত সরকারের ব্যক্তিবর্গের ক্ষমতা সীমিত করে রেখেছেন এবং নিজেকে এই শাসনের অভিভাবক মনে করেন। তিনি এই ভাবেই- রানের সামনে আসা যেকোনো চ্যালেঞ্জ কঠোরভাবে দমন করে থাকেন। কিন্তু আজ ইরানের পরিস্থিতি যে গতিপথে বাঁক নিচ্ছে তাতে কথা শুরু হয়েছে-ইরান কি রাজতন্ত্রে ফিরে যাচ্ছে?
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ইরানে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ৪০ বছরের শাসনের পতন ঘটে। তার বড় ছেলে রেজা পাহলভির বয়স ছিল মাত্র ১৬বছর। তেলসমৃদ্ধ হাজার বছরের পুরোনো সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনিই ছিলেন প্রথম সারিতে। নিজের 'জন্মগত অধিকার' হারানোর প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ৬৫ বছর বয়সি পাহলভির অপেক্ষার প্রহর হয়তো শেষ হতে চলেছে- এমনই মনে করা হচ্ছে। 'এই লড়াই শেষ লড়াই। পাহলভি ফিরবেন- গত বৃহস্পতিবার রাতে ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান স্লোগান ছিল এটি। নির্বাসিত যুবরাজ তার স্বদেশবাসীকে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানানোর পর এই স্লোগান ধ্বনিত হয়। বৃহস্পতিবারের এই বিক্ষোভ ছিল মূলত কয়েক দিনের লাগাতর আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার এলাকায় অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হলেও দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনের দিকে মোড় নেয়। আমেরিকা বসে পাহলভি নিজেকে এই আন্দোলনের ডিফেক্টো নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন।ইরানে ক্ষমতাচ্যুত, পতিত রাজতন্ত্রের প্রতি সমর্থন জানানো দেশের প্রচলিত আইনে একটি ফৌজদারি অপরাধ। তাছাড়া যে সমাজ একসময় শাহের একনায়কতন্ত্র হঠাতে গণ-অভ্যুত্থান করেছিল, সেখানে এ ধরনের রাজকীয় নোভাবকে দীর্ঘকাল ধরেই বাঁকা চোখে দেখা হতো। তা হলে এই সময়ে কেমন কী হলো যে ইরানের মানুষ নির্বাসিত এই রাজপরিবার এবং এর ধানকে ঘিরে নতুন করে এক উদ্দীপনায় ভেসে চলেছেন!তা এখনও স্পষ্ট।ইরানিরা কি আসলেই রাজতন্ত্রের পুনর্বহাল চায়, নাকি তারা কেবল মান দমনমূলক ধর্মতন্ত্র থেকে মুক্তি পেতে চায়?দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন অবরোধের শিকার দেশটি ইদানীং যুদ্ধ অর্থনীতিতে ব্যতিব্যস্ত।দেশের আর্থিক অবস্থা জরাজীর্ণ।মানুষের এই অসন্তোষের পর্যায়ে রেজা পাহলভি নিঃসন্দেহে তার প্রভাব বৃদ্ধি করছেন এবং নিজেকে বিরোধী রাজনীতির সামনের সারিতে নিয়ে এসেছেন।তবে তার অনেক সমস্যাও রয়েছে।তিনি সমাজে বিভাজন সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার মতো নেতা নন।এমনই মূল্যায়ন তার সম্পর্কে।ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খোমেইনি নির্বাচিত সরকারের ব্যক্তিবর্গের ক্ষমতা সীমিত করে রেখেছেন এবং নিজেকে সর্বোচ্চ অভিভাবক মনে করেন, যা দেশের ভেতরের বিরোধীদের ও বাইরের বিরোধীদের শক্তিশালী করেছে, বিশেষ করে বিশাল ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে পাহলভির মতো ব্যক্তিত্বরা আড়াল থেকে সামনে উঠে এসেছেন। পাহলভি সরাসরি লড়াইয়ে নামার বিষয়ে এখনও অস্পষ্ট। তিনি জানিয়েছেন, যদি এই বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসনকে হটাতে সফল হয়, তবে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে নেতৃত্ব দিতে ইচ্ছুক। গত এক দশকে এটি পঞ্চম বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ।তবে তার পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যের অভাব রয়েছে এবং সমালোচকেরা বলছেন,তার অভিজ্ঞতাহীনতা দ্রুতই গোটা পরিস্থিতিকে তার বিরুদ্ধে নিয়ে যেতে পারে। ২০২০ সালে তেহরান থেকে ইউক্রেনগামী একটি যাত্রীবাহী বিমান ভুলবশত ইরাণ গুলী করে ভূপাতিত করার পর পাহলভি প্রথম আলোচনায় আসেন। সেই ঘটনা দেশের বাইরের বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ করে একটি কাউন্সিল গঠনে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যেখানে পাহলভি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সদস্য। বিরোধীদের সেই জোড়াতালির কাউন্সিলটি অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দ্রুতই ভেঙে যায়। তবে পাহলভি বিরোধী শিবিরের সবচেয়ে পরিচিত মুখ হিসেবে টিকে থাকেন। ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তার অন্যতম প্রভাবশালী সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এই জোট ইরানিদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। বিশেষ করে গত জুনে দুই দেশের ১২ দিনের যুদ্ধে ইজরায়েলি হামলায় ইরানের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ইরানের মানুষ নিশ্চয়ই নেতানিয়াহুকে পছন্দ করবেন না।অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যেভাবে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন, তা হয়তো ইরানের বিরোধীদেরও আশাবাদী করেছে যে খুব দ্রুত বর্তমান শাসনের পতন ঘটবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে, এক বিক্ষোভকারী একটি রাস্তার নাম বদলে ট্রাম্প স্ট্রিট রেখেছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই আশা হয়তো বাড়াবাড়ি। পাহলভির ব্যক্তিগত গুণাবলি ট্রাম্পেরও পছন্দ হওয়ার মতো নয়। তিনি বইপত্র নিয়ে থাকা মানুষ, ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিত্বকে আকর্ষণ করার মতো সহজাত ক্যারিশমা তার নেই। ট্রাম্পকে তুষ্ট করা তার জন্য কঠিন হবে। আবার পাহলভি সরাসরি লড়াইয়ে নামার বিষয়ে এখনও অস্পষ্ট অবস্থানে রয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, যদি এই বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসনকে হঠাতে সফল হয়, তবে তিনি অন্তর্বতীকালিন সময়ে নেতৃত্ব দিতে ইচ্ছুক।