January 13, 2026

বঙ্গ-মঞ্চে

 বঙ্গ-মঞ্চে

শোমাস্ট গো অন!মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত রাজনীতিক হার্ভে মিল্ক, ১৯৭৮ সালে আততায়ীর গুলীতে যার অকাল প্রয়াণ ঘটেছিল, আজ সম্ভবত পরলোক থেকে সমকালীন বাংলার রাজনৈতিক দৃশ্যপট দেখে মৃদু হাসছেন।মিল্ক তার সংক্ষিপ্ত কিন্তু বর্ণময় রাজনৈতিক জীবনে একটি বিশেষ তত্ত্বের অবতারণা করেছিলেন, রাজনীতির 'থিয়েট্রিক্যালিটি' বা নাটকীয়তা।মিল্কের মতে, রাজনীতির মঞ্চে দৃশ্যপট বা 'অপটিক্স' অত্যন্ত জরুরি। রাজনীতির সঙ্গে অভিনয়ের এই নিবিড় বুনন কেবল জনমতকে সংহত করে না, বরং একজন ঝানু রাজনীতিককে তার লক্ষ্য অর্জনে প্রভূত সহায়তা করে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক মঞ্চে অভিনয়ের ক্যারিশমা বা নাটুকেপনা অনেক সময় বাস্তব উন্নয়নের চেয়েও বেশি সুফল দেয়। আর এই 'পলিটিক্যাল থিয়েটার' বা রাজনৈতিক নাটকের এক উর্বর প্রসেনিয়াম আজকের পশ্চিমবঙ্গ। সম্প্রতি এই বঙ্গ-মঞ্চেই সেই বিশেষ ঘরানার এক নতুন চিত্রনাট্য অভিনীত হতে দেখা গেল।ঘটনার সূত্রপাত গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার। কয়লা পাচার কাণ্ডের যোগসূত্র খুঁজতে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি-র আধিকারিকরা হানা দিয়েছিলেন 'ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি' তথা আই-প্যাকের দপ্তরে। আই-প্যাক একটি পেশাদার সংস্থা, যারা তৃণমূল কংগ্রেস সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণ এবং ডেটা বা তথ্য ব্যবস্থাপনার কাজ করে। ঘটনাবলি ইতিমধ্যে সর্বজ্ঞাতা। কেন্দ্রীয় সংস্থা কয়লা পাচার মামলার সূত্রে তল্লাশি চালাতে এসে আচমকাই এমন এক ঘটনার মুখোমুখি হল, যা তদন্তের পরিসর ছাড়িয়ে সরাসরি রাজৈৈনতিক নাটকে পরিণত হল, যাকে বলা যায় 'রেড অন দ্য রেইডার্স। দেখা গেল, কেন্দ্রীয় আধিকারিকরা যখন তথ্য সংগ্রহে ব্যস্ত, তখন স্বয়ং বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সেখানে উপস্থিত হয়ে সেই অভিযানে কার্যত ইতি টেনে দিলেন দিলেন। ইডি-র তদন্ত প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগ উঠল যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেখান থেকে কিছু নথি উদ্ধার করে নিয়ে গেলেন। তার দাবি ছিল, ওই নথিগুলি তার দলের নির্বাচন সংক্রান্ত অত্যন্ত গোপনীয় এবং স্পর্শকাতর, যা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল কেন্দ্রীয় সংস্থা।বাংলার রাজনীতি বরাবরই আবেগনির্ভর, আর নাটকীয়তা সেখানে বাড়তি অক্সিজেন জোগায়। ইডি-র তরফে অভিযোগ আনা হয়, একজন সাংবিধানিক প্রধান স্বয়ং কেন্দ্রীয় এজেন্সির আইনি তদন্তে বাধা দিচ্ছেন। তারা কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়ে দ্রুত প্রতিকার দাবি করে। পাল্টা চালে মমতা সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কাঠগড়ায় তুলে অভিযোগ করেন যে, বিজেপি সরকার ইডি-র মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। গত সপ্তাহান্তে বিষয়টি নিয়ে আদালত কক্ষে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তাও এক প্রহসনতুল্য। ভিড়ের কারণে বিচারপতি মামলার শুনানি করতে পারেননি এবং তা ১৪ জানুয়ারী পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়। ইডি এরপর প্রধান বিচারপতির দ্বারস্থ হলেও তাদের আবেদন গ্রাহ্য হয়নি। কিন্তু রাজনীতির ময়দান তো কেবল চার দেওয়ালের আদালতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাই লড়াই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রাজপথে।
বাংলার বুকে এই রাজনৈতিক নাটক, তা সে উদ্ভট হোক কিংবা সুপরিকল্পিত, চিরকালই এক অদ্ভুত প্রাণচঞ্চলতায় ভরা। আই-প্যাক সংক্রান্ত এই টানাপোড়েন আসলে রাজনীতির সেই ধ্রুপদী অভিনয়েরই এক আধুনিক সংস্করণ। রাজনীতি যদি মঞ্চ হয়, তবে এই মুহূর্তে বাংলা এক দীর্ঘ নাটকের মধ্যবর্তী বিরতিতে রয়েছে। দুই অঙ্কের মাঝখানের যে 'বিরতি' বা ইন্টারমিশন চলছে, সেখানে রাজনৈতিক পণ্ডিতরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন লাভ-ক্ষতির খতিয়ান মেলাতে। বিবদমান দুই শিবিরের কে কতখানি 'ব্রাউনি পয়েন্ট' বা ডিভিডেন্ড পকেটে পুরল, তা নিয়েই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিজেপির লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট- তারা বাংলার আমজনতার কাছে মমতাকে এক 'বিঘ্নসৃষ্টিকারী' নেত্রী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, যিনি দুর্নীতির তদন্তে ক্রমাগত বাধা দিচ্ছেন। অন্যদিকে, মমতার রণকৌশল হলো 'ভিক্টিম কার্ড' খেলা। নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি প্রমাণ করতে চাইছেন যে, একটি স্বৈরাচারী কেন্দ্রীয় শাসনের রক্তচক্ষু ও দমনপীড়নের শিকার হচ্ছে তার দল। এই কৌশলের পিছনে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণও রয়েছে যা ইঙ্গিত দেয় যে, বিজেপি জমানায় কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি বিরোধীদের দিকেই বেশি করে নজর ঘোরাচ্ছে।সুতরাং, এই জনসমক্ষে প্রদর্শিত নাটকীয়তা যে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে ভোটারদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, এটিই নাটকের শেষ দৃশ্য নয়। নির্বাচনি ডঙ্কা বাজলে বঙ্গ-মঞ্চে আরও এমন অনেক রোমহর্ষক ও নাটকীয় ঘটনা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। পর্দার আড়ালে নতুন স্ক্রিপ্ট তৈরি হচ্ছে এবং দর্শক হিসেবে বঙ্গবাসী কেবল সময়ের অপেক্ষায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *