January 12, 2026

সুই-সুতোর নীরব গান,হাতে বোনা স্বপ্নের নকশি কাঁথা…

 সুই-সুতোর নীরব গান,হাতে বোনা স্বপ্নের নকশি কাঁথা…

অনলাইন প্রতিনিধি :-সুঁই আর সুতো-সেদুটোই নীরব, নিরীহ আপাত দৃষ্টিতে উপেক্ষিত। অথচ এই দুই সামান্য উপকরণ দিয়েই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্রামবাংলার নারীরা বুনে চলেছেন জীবনের গল্প, সুখ-দুঃখের স্মৃতি আর স্বপ্নের নকশা।কাপড়ের ওপর ফোঁড় ফোঁড় সেলাইয়ের টানে ফুটে উঠেছে ফুল, পাখি, লতাপাতা, কলকা, মানুষের মুখ, কখনও প্রকৃতি, কখনও সংসার, কখনও নিঃশব্দ আর্তি,আরো কত কি! সেই হারিয়ে যেতে বসা লোকশিল্পকে আঁকড়ে ধরেই স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে চলেছেন সোনামুড়ার গোমতীর কূলঘেঁষা দুর্গাপুর গ্রামের একদল সাহসী নারী। 'রাজর্ষি নকশি' এন.এফ.সি দল।
দুর্গাপুর মূলত মুসলিম সংখ্যালঘু অধ্যুষিত একটি ছোট্ট গ্রাম। অনেকের চোখে হয়তো সাধারণই। কিন্তু এই গ্রামের অন্দরমহলে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ধরে সুইয়ের খোঁচায় খোঁচায় তৈরি হচ্ছে অসাধারণ সব নকশি কাঁথা। সংসারের কাজ সামলে, সন্তানদের দেখভাল করে, অবসর সময়টুকুতে তারা বসে পড়েন কাপড়ের পাশে। নিঃশব্দে চলে সেলাই, আর সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে আত্মবিশ্বাস। এই গ্রামের ২০ জন গৃহিণীরা আজ আর শুধু ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন। তারা এখন উপার্জনকারী, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহসী অংশীদার। বর্তমান যান্ত্রিক শহুরে জীবনে নকশি কাঁথা যেন শুধুই স্মৃতি। এর জন্য সময় নেই,ধৈর্য নেই, হয়তো আবেগও নেই আমাদের। অথচ সেই নস্টালজিয়া আজও কোথাও গোপনে বেঁচে থাকে আমাদের মনে। পড়ন্ত দুপুরে বড় উঠোনে একসঙ্গে বসে মা, মাসি, কাকি, জেঠিদের কাঁথা সেলাইয়ের দৃশ্য আজও মনে পড়লে মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে আসে। মনে পড়ে জসীম উদ্দিনের 'নকশি কাঁথার মাঠ' কবিতাটি। যেখানে একটি কাঁথা হয়ে ওঠে প্রেম, বেদনা আর অপেক্ষার প্রতীক। সেই অনুভূতিকে আবার নতুন করে জাগিয়ে তুলতেই গত প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করে চলেছেন দুর্গাপুর গ্রামের 'রাজর্ষি নকশি' এনএফসি দলের ২০ জন, মহিলা।এই দলের সঙ্গে যুক্ত মল্লিকা বেগম, শিল্পী দাস, হাসিনা খাতুন, হাবিবা বেগম, নাসরিন আক্তারের মতো নারীরা শুধু কাঁথা বানাচ্ছেন না, তারা ফিরিয়ে আনছেন একটি সংস্কৃতি। মল্লিকা বেগম জানান, সংসারে বাড়তি রোজগারের আশায় প্রায় ১০-১২ বছর আগে থেকেই তারা স্ব-সহায়ক দলের সঙ্গে যুক্ত হন। শুরুতে অন্য নানা সাংগ্রী তৈরি হলেও গ্রামবাংলার পুরনো কাপড় দিয়ে কাঁথা সেলাই ছিলো তাদের চেনা কাজ। ২০২৩ সালের শুরুতে তারা ভাবলেন, এই ঐতিহ্যকেই যদি বাণিজ্যিকভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়। আজ তাদের নতুন কাপড়ে তৈরি একটি নকশি কাঁথার দাম আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। কিন্তু এই দামের চেয়েও বড় তার মূল্য। কারণ প্রতিটি কাঁথার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাদের শ্রম, স্মৃতি আর আত্মসম্মান। 
শিল্পী দাস জানান, শুধু শীত নিবারণের কাঁথাই নয়, তারা তৈরি করছেন ঠাকুরঘরের আসনের কাঁথা, টেবিল ক্লথ, শিশুদের কাঁথা, কাপড়ের তৈরি নানা ব্যবহার্য সামগ্রী। আশ্চর্যের বিষয়, হিন্দু-মুসলিম উভয় অংশের নারীদের হাতে তৈরি স্বস্তিক চিহ্ন খচিত আসনের কাপড় আজ শোভা পাচ্ছে হিন্দুদের ঠাকুর ঘরে। নীরবে, অনাড়ম্বরভাবে, এভাবেই দুর্গাপুর গ্রাম হয়ে উঠেছে সম্প্রীতির এক জীবন্ত উদাহরণ।এই শিল্প রপ্ত করতে তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নিতে হয়নি। অঙ্কনের কোনো পাঠ নেই, কোনো ডিগ্রি নেই এই মহিলাদের।হাবিবা বেগম বলেন, 'মা, মাসি, পিসি, কাকি, জেঠিদের কাজ দেখেই শিখেছি। ছোটবেলা থেকে চোখে দেখা, হাতের স্মৃতিই আমাদের শিক্ষক।'সেই স্মৃতিই আজ এই মহিলাদের পুঁজি। জন্মদিন, বিবাহ, অন্নপ্রাশন সহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে মানুষ সানন্দে তাদের বাড়ি থেকেই নকশি কাঁথা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় বাজার ছাড়াও সরস মেলা ও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সরকারী উদ্যোগে আয়োজিত বিভিন্ন মেলাতেও জায়গা করে নিচ্ছে তাদের কাজ।এই নারীরা কেউ বড় কথা বলেন না। তারা জানেন, সুইয়ের এক একটি ফোঁড় যেমন সময় নেয়, তেমনই স্বপ্নের পথও দীর্ঘ। কিন্তু তাঁরা থামেননি। গোমতীর তীরের এই ছোট্ট গ্রাম থেকেই আজ তাদের হাতের কাজে ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামবাংলার গন্ধ, মাটির টান আর নারীর আত্মশক্তির গল্প।নকশি কাঁথার প্রতিটি সেলাইয়ে যেন লুকিয়ে আছে এক একটি উচ্চারণ।আমরাও পারি, আমরাও এগোতে চাই। তাই দুর্গাপুরের এই নারীদের গল্প শুধু একটি স্ব-সহায়ক দলের সাফল্য নয়। এটি হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের পুনর্জন্ম। সুঁই-সুতোর নীরব গানে বোনা সেই কাঁথাগুলোর মতোই, তাদের জীবনেও আজ ফুটে উঠছে স্বপ্ন,সম্মান আর স্বনির্ভরতার নকশা।তবু আত্মবিশ্বাস আর সাফল্যের মাঝেও তাদের কণ্ঠে রয়েছে নীরব এক আর্জি। এই মহিলারা চান, এই শিল্পকে আরও সুসংহত ও টেকসই করে তুলতে সরকারী উদ্যোগে তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। নকশার বৈচিত্র, রঙের ব্যবহার, আধুনিক চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নকশি কাঁথা তৈরির জন্য যদি নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দিশানির্দেশ পাওয়া যায়, তবে এই গ্রামীণ শিল্প আরও বহুদূর এগিয়ে যেতে পারে বলে বিশ্বাস তাদের। পাশাপাশি তারা চান, সরকারী বা সমবায়ভিত্তিক আউটলেটের মাধ্যমে এই মহিলাদের উৎপাদিত নকশি কাঁথা বিক্রির স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে উঠুক। গোমতীর তীরঘেঁষা এই ছোট্ট গ্রাম থেকে সুই-সুতোর টানে যে স্বপ্নের নকশা আজ তৈরি হচ্ছে, তা শুধু কয়েকজন নারীর জীবন বদলের গল্প নয়।একটু সহায়তা, একটু পরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই নকশি কাঁথাই হয়ে উঠতে পারে গ্রামবাংলার অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *