January 7, 2026

রাজনৈতিক আত্মপ্রচার

 রাজনৈতিক আত্মপ্রচার

ভারত এখনও বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে ওঠেনি- এই সরল সত্যকে আড়াল করতেই ফের পরিসংখ্যানের কারসাজিতে নেমেছে মোদি সরকার। আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (আইএমএফ) ভবিষ্যতের জন্য যে পূর্বাভাস দিয়েছে, তাকেই বর্তমান সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে বছরের শেষে আত্মপ্রশংসার ঢাক পেটানো হচ্ছে। অথচ বাস্তব হল, আইএমএফ কোথাও বলেনি যে ভারত ইতিমধ্যেই জাপানকে টপকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে গিয়েছে।
মোদি সরকারের বছরের শেষের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ভারত জাপানকে পিছনে ফেলে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের একাংশ এবং বিরোধীরা এই দাবিকে কার্যত 'ভুয়ো সাফল্যের প্রচার' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, জিডিপির ক্রমতালিকায় এক ধাপ এদিক-ওদিক হওয়া কোনও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মানদণ্ড হতে পারে না, বিশেষত যখন দেশের মাথাপিছু আয় জাপানের মাত্র এক দ্বাদশাংশ এবং জার্মানির এক-বিংশাংশ।
এই বিভ্রান্তির সূচনা হয় গত মে মাসে, যখন নীতি আয়োগের সিইও বি ভি আর সুব্রহ্মণ্যম দাবি করেন, আইএমএফ এর তথ্য অনুযায়ী ভারত ইতিমধ্যেই বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্ত অর্থনীতি। পরে দেখা যায়, আইএমএফ এপ্রিল মাসে 'ওয়ার্ল্ড ইকনমিক আউটলুক'-এ যা বলেছিল, তা আদৌ বর্তমান বাস্তব নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। আইএমএফের পূর্বাভাস ছিল- ২০২৫ সালে ভারত খুব সামান্য ব্যবধানে জাপানকে ছাপিয়ে যেতে পারে।এপ্রিলের সেই রিপোর্টে আইএমএফ অনুমান করেছিল, ২০২৫ সালে ভারতের জিডিপি হবে প্রায় ৪.১৯৭ লক্ষ কোটি ডলার এবং জাপানের হবে ৪.১৯৬ লক্ষ কোটি ডলার- অর্থাৎ পার্থক্য নামমাত্র। কিন্তু বাস্তবে অর্থনৈতিক প্রবণতা বদলাতেই আইএমএফ অক্টোবর মাসে সংশোধিত পূর্বাভাস দেয়।
সেখানে বলা হয়, ২০২৫ সালে ভারতের জিডিপি পৌছতে পারে ৪.১২৫ লক্ষ কোটি ডলারে, কিন্তু জাপানের জিডিপি বেড়ে হতে পারে ৪.২৮০ লক্ষ কোটি ডলার। অর্থাৎ নতুন হিসেব অনুযায়ী ভারত জাপানের পিছনে থেকে যাচ্ছে।
এই সংশোধিত পূর্বাভাস উপেক্ষা করেই মোদি সরকার এপ্রিলের পুরনো হিসেব সামনে এনে দাবি করছে, ভারত জাপানকে টপকে গিয়েছে এবং খুব শিগগিরই জার্মানিকেও ছাপিয়ে আমেরিকা ও চিনের পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে উঠবে। সরকারের যুক্তি, আইএমএফের ২০২৬সালের পূর্বাভাসে ভারতকে জাপানের চেয়ে এগিয়ে রাখা হয়েছে।কিন্তু অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন-পূর্বাভাসকে বর্তমান সাফল্য হিসেবে দেখানো কি ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি নয়।এই প্রচারে? আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে আসল প্রশ্নগুলি-বেকারত্ব, আয় বৈষম্য, গ্রামীণ চাহিদার সংকট, মূল্যবৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান। বিশ্বের 'চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি' হওয়ার ঢাক বাজলেও বাস্তবে হল, ভারতের সাধারণ নাগরিকের আয় ও জীবনমান উন্নত হয়নি সেই অনুপাতে। জিডিপি-র আকার বড় হলেই যে সাধারণ মানুষের জীবন বদেল যায় না, এই সত্যকে অস্বীকার করতেই পরিসংখ্যানের ঝলকানি ব্যবহার করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃত সাফল্য মাপা উচিত মাথাপিছু আয়, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জীবনমানের সূচকে! সেখানে ভারত এখনও জাপান বা জার্মানির ধারে-কাছেও নেই। ফলে পূর্বাভাসকে বাস্তব সাফল্য হিসেবে প্রচার করা আসলে অর্থনৈতিক আত্মতুষ্টির রাজনীতি-যা সমস্যার সমাধান তো করেই না, বরং জনআলোচনাকে ভ্রান্ত পথে চালিত করে।প্রশ্নটা তাই স্পষ্ট- ভারত ভবিষ্যতে বড় অর্থনীতি হতে পারে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে বর্তমান অর্জন হিসেবে তুলে ধরে আত্মপ্রচার চালানো কি শাসনের সাফল্যের প্রমাণ, নাকি বাস্তব ব্যর্থতা ঢাকার কৌশল? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে, 'চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি' আদৌ উন্নয়নের গল্প, না কি কেবল পরিসংখ্যানের রাজনীতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *