January 8, 2026

ইউনুসের বিপজ্জনক খেলা

 ইউনুসের বিপজ্জনক খেলা
বাংলাদেশে চলমান হিংসা আর নৈরাজ্যের শেষ কোথায়? 'ঘৃণার রাজনীতিতে দেশ চালানো এবং বাংলাদেশে ভারতবিদ্বেষ ও মৌলবাদের জোট গড়ে ইউনুস যে ভেলকি দেখাতে চাইছেন মনে হয় এবার তাতে ফুলস্টপ দেওয়ার সময় এসেছে।ইতিমধ্যেই এই হিংসার আগুনে পুড়েছে একাধিক প্রাণ।ময়মনসিংহে বস্ত্র শ্রমিক দীপু দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে দেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তোলাবাজির অভিযোগ তুলে সংখ্যালঘু হিন্দু যুবক অমৃত মণ্ডলকে দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।একই জেলায় ভালুকায় একটি বস্ত্র কারখানায় নিরাপত্তারক্ষীর গুলীতে প্রাণ হারান শ্রমিক বজেন্দ্র বিশ্বাস। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতিই আরও সাহস জুগিয়েছে অপরাধীদের। বর্ষবিদায়ের দিন ৩১ ডিসেম্বর, ফের সেই বর্বরতার পুনরাবৃত্তি। শরীয়ত পুর জেলার ডামুড্যা থানার কনেশ্বর ইউনিয়নের কেউরভাঙ্গা বাজার সংলগ্ন এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওষুধ নি ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে কুপিয়ে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশে আজ যে হিংসার আগুন জ্বলছে, তা শুধু সংখ্যালঘু নিধন বা মৌলবাদী উন্মত্ততার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়-এই আগুনের ভিতরেই ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক গভীর ও পরিকল্পিত ভারতবিদ্বেষ।অন্তর্বর্তী সরকারের ছত্রছায়ায় মৌলবাদী ও অতি-দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলি শুধু দেশের ভেতরের ভিন্নমত, নি সংখ্যালঘু ও লোকসংস্কৃতিকে নিশানা করছে না, একই সঙ্গে ভারতকে শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে জনমানসে বিষ ঢালছে। এই ভারতবিদ্বেষ আর আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি রাজনৈতিক কৌশল, রাষ্ট্রীয় নিষ্ক্রিয়তায় লালিত এক বিপজ্জনক প্রবণতা।বাংলাদেশের ইতিহাস সাক্ষী- ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে ভারতের ভূমিকা অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু আজ সেই ইতিহাসকে বিকৃত করার প্রতিযোগিতা চলছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে 'ভারতের আধিপত্যের কাহিনি' হিসেবে চিত্রিত করে মৌলবাদী শক্তিগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ভারতবিরোধী ঘৃণায় দীক্ষিত করছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে ওয়াজ-মাহফিল, সামাজিক মাধ্যম থেকে রাস্তাঘাট-সর্বত্র ভারতকে 'শত্রু রাষ্ট্র' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা চলছে।সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, সুফি দরগা ভাঙচুর, বাউল-ফকির সংস্কৃতির ওপর আঘাত- এই সব হিংসা কেবল ধর্মীয় উন্মত্ততার ফল নয়, এগুলি ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগসূত্র ছিন্ন করার প্রয়াসও বটে।কারণ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সমাজ, বাউল ও সুফি ধারা ঐতিহাসিকভাবে উপমহাদেশীয় সংস্কৃতির সেতুবন্ধন। সেই সেতু ভাঙলেই ভারতবিদ্বেষের রাজনীতি আরও সহজে বিস্তার লাভ করে-এই অঙ্ক মৌলবাদীরা ভালোই জানে।অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা প্রশ্নাতীতভাবে উদ্বেগজনক। একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, জীবন্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা, দলবদ্ধ পিটিয়ে হত্যা- সবকিছুর পরেও কার্যকর বিচার নেই, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নেই। প্রশাসনের এই নীরবতা মৌলবাদীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে- হিংসা করলে শাস্তি নয়, বরং প্রশ্রয় মিলবে। এই প্রশ্রয়ের বিনিময়ে মৌলবাদীরা সরকারের রাজনৈতিক সংকট ঢাকতে ভারতবিদ্বেষকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।আরও বিপজ্জনক হল, এই ভারতবিদ্বেষকে 'জাতীয়তাবাদ'-এর মোড়কে পরিবেশন করা হচ্ছে। রাজনৈতিক সংকট, কর্মসংস্থানের অভাব, মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমিক অসন্তোষ-এই বাস্তব প্রশ্নগুলি থেকে নজর ঘোরাতে ভারতের বিরুদ্ধে কৃত্রিম শত্রুতা তৈরি করা হচ্ছে। সীমান্ত, জলবন্টন, অভিবাসন-সব জটিল সমস্যাকে একপাক্ষিকভাবে ভারতের ঘাড়ে চাপিয়ে জনরোষকে অন্যদিকে প্রবাহিত করা হচ্ছে। ফলত, জনআলোচনা থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে সরকারে ব্যর্থতা।
এই ভারতবিদ্বেষের সবচেয়ে বড় খেসারত দিচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষই। প্রতিবেশী রাষ্ট্রে সঙ্গে শত্রুতার রাজনীতি বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানকে বিপন্ন করছে। অথচ বাস্তবে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিকের জীবন ও জীবিকা ভারতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করে ভারতবিদ্বেষ ছড়ানো মানে নিজের দেশের স্বার্থেই কুঠারাঘাত।বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলি আজ চরম চাপে। যারা মৌলবাদ ও ভারতবিদ্বেষের বিরুদ্ধে কথা বলছে, তাদের 'ভারতের দালাল' তকমা লাগিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই রাজনীতি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গলা টিপে ধরছে, গণতন্ত্রকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারের দিকে। ইতিহাস বলে, এমন অন্ধকার শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই গ্রাস করে।
আজ প্রশ্ন উঠছে- বাংলাদেশ কি তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে চূড়ান্ত বিচ্ছেদের পথে? ভারত বিদ্বেষের বিষ ছড়িয়ে কি সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করা যাবে? হয়তো যাবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই পথ বাংলাদেশের সামাজিক ঐক্য, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধ্বংস করবে। ভারতবিদ্বেষ দিয়ে রাষ্ট্র গড়া যায় না, ঘৃণা দিয়ে ভবিষ্যৎ লেখা যায় না।
সময় এখনও পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। কিন্তু মৌলবাদ ও ভারতবিদ্বেষের বিরুদ্ধে এখনই স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান না নিলে ইতিহাস অন্তবর্তী সরকারকে ক্ষমা করবে না। নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়-নীরবতা অপরাধের সহযোগিতা। বাংলাদেশ কোন পথে যাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর আজই দিতে হবে- ধর্মনিরপেক্ষ সহাবস্থানের পথে, নাকি ভারতবিদ্বেষ ও মৌলবাদী অন্ধকারের দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *