January 8, 2026

ঘৃণার চাষবাস

 ঘৃণার চাষবাস

উত্তর পূর্বাঞ্চলের মানুষকে মূল ভূখণ্ডের লোকজনরা চাইনিজ, চিনা, চিঙ্কি বলে ব্যঙ্গ করে থাকে। এঞ্জেল হত্যায় সর্বশেষ এই বিষয়টি উঠে এসেছে। এঞ্জেলের বাবাও এই অভিযোগ এনেছেন, যদিও উত্তরাখণ্ড সরকার বলেছে জাতিগত কোনও ঘৃণা এই হত্যার সঙ্গে যুক্ত নয়। যুক্ত কী যুক্ত নয় সেই বিতর্ক আলোচ্য নয়। তবে উত্তরপূর্বের লোকদের মূল ভূখণ্ডে চিনা বলে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করার ইতিহাস অনেক পুরানো। মানে কী? ভারতের মূল ভূখণ্ডের মানুষ - তাদের সংখ্যা ছোট কিংবা বড় যাই-ই হোক, তারা কি চিনাদের ঘৃণ্য মনে করে? চিনকে ঘৃণার চোখে দেখে থাকেন? নিকট প্রতিবেশী চিনকে শক্তি ও সামর্থ্যের দিক থেকে প্রতিটি ভারতবাসী ঈর্ষার চোখে দেখে থাকলে সেটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ঘৃণার মানে কী? ঘৃণা তখনই আসে যদি এর মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদী বিষয় জড়িয়ে থাকে।
রাজনৈতিক বা প্রতিবেশীমূলক কোনও অর্থেই চিনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোনওকালেই মধুর নয়। মাঝে মাঝে সম্পর্কে মধুর প্রলেপ পড়লেও কয়েক বছর যেতে না যেতেই আমাদের সম্পর্কের তিক্ততা বেরিয়ে আসে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা টানাপোড়েনের পর চিন ও ভারতের সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হয়েছে। ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে বেড়েছে যোগাযোগ ও লেনদেন। সদিচ্ছার ইঙ্গিত হিসাবে চিনা সরকার মার্চ মাসে ভারতীয় নাগরিকদের উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ভিসা নীতিও শিথিল করা হয়। এর ফলে ভারতীয়দের চিনে ভ্রমণ সহজ হয়েছে। তবে এতে চিনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বড় ধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কিছু ভিডিওতে ভারতীয় পর্যটকদের নেতিবাচকভাবে দেখানো হয়েছে। যেমন সাবওয়েতে হাত দিয়ে খাবার খাওয়া বা পর্যটনস্থলে স্নান করার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে তুলে ধরার ঘটনায় সেই দেশে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
চিনারা অনেক মন্তব্যে ভারতীয়দের লক্ষ্য করে বর্ণবাদী ভাষাও ব্যবহার করেছে। কেউ কেউ দাবি করে, চিনে ভারতীয় পর্যটকের প্রবেশ বন্ধ করা উচিত। এমনকী চিনে থাকা সব ভারতীয়কে বহিষ্কারের কথাও বলা হয়। চিনের সামাজিকমাধ্যমে ভারতবিরোধী মনোভাব দ্রুত চরম আকার নেয়। প্রশ্ন আসে এই মনোভাবের পেছনে কী কারণ। বস্তুত এই মনোভাবের পেছনে ভারতীয়দের নিয়ে প্রচলিত নানা ধ্যানধারণা কাজ করছে। ডৌইন সহ সেই দেশের বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ভারতীয়দের প্রায়ই অপরিচ্ছন্ন ও নৈতিকভাবে দুর্বল হিসাবে দেখানো হয়। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে ভারতীয় বাসিন্দারা নাকি জমি দখল করে নিচ্ছে, এমন খবরও ছড়ানো হয়েছে। যদিও সবই অসত্য তবু অনেক চিনা নেটিজেন মনে করছেন, চিনেও ভারতীয় বাসিন্দারা জমি দখল নিতে পারে।
অথচ ভারতের বিদেশমন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, চিনের মূল ভূখণ্ডে ভারতীয়দের বসবাস করার কোনও বিশাল আগ্রহ কোনওকালেই নেই। সেই দেশে প্রবাসী ভারতীয়ের সংখ্যা মাত্র ৮ হাজার ৪৬০। এই সংখ্যা হংকংয়ের তুলনায়ও অনেক কম।হংকং-এ ভারতীয় রয়েছেন ৪৪ হাজার ১৪০ জন, জাপানে ৪৭ হাজার ৮১০ জন এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৭ হাজার ১ জন। সেই তুলনায় চিনে নামমাত্র।চিনা সামাজিকমাধ্যমে গুজব বা ঘৃণা যা ছড়ানো হয়েছে তাতে বলা হচ্ছে, বিপুল সংখ্যক ভারতীয় ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে চিনে থেকে যাচ্ছেন, এর পক্ষে কোনও প্রমাণ নেই। বাস্তবে চিন আন্তর্জাতিক অভিবাসীদের জন্য বড় কোন গন্তব্যই নয়। দেশটি বিদেশি নাগরিকদের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। চিনা সামাজিক মাধ্যমের বদ্ধ গণ্ডিবদ্ধতার কারণে প্রচলিত ধ্যানধারণা ও ভুল তথ্য ভাঙাও কঠিন। এর পেছনে আরও গভীর একটি কারণ আছে। চিন ও ভারতের সম্পর্ক যখন উত্তপ্ত ছিল, তখন ভারতীয়দের উপহাস ও বৈষম্যের লক্ষ্য হিসেবে দেখা হয়েছে সেই দেশে। সেইভাবে দেদতে গেলে পশ্চিমি বর্ণবাদের শিকার চিন। তারা নিজেকে এই ভাবেই দেখে থাকে। আবার তাদের দেশের চরম জাতীয়তাবাদীরা একইভাবে ভারতকে ব্যর্থ ও মূল্যহীন রাষ্ট্র হিসাবে মন্তব্য করে থাকে। ভারতকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় চিনের তুলনায় দুর্বল দেশ হিসেবে দেখে থাকে। পাশাপাশি চিনা সমাজের মূল ধারার আলোচনায় বর্ণবাদবিরোধী শক্তিশালী কোনও ভাষ্য নেই। ফলে সামাজিকমাধ্যমে এসব বক্তব্য নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং জনমত প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিকমাধ্যমের তীব্র ভারতবিরোধী মনোভাবকে চিনা সরকার সমর্থন করে বলে প্রমাণ মিলছে না। অতীতে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনার সময় সরকার জাতীয়তাবাদী ভাষ্য ব্যবহার করে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কোভিড পরবর্তী সময়ে দুর্বল অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দিয়েছে। সেই লক্ষ্যেই বিদেশিদের জন্য ভিসা নীতি শিথিল সহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চিন ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ২ লাখ ৬৫ হাজার ভিসা ইস্যু করেছে। এসব কূটনৈতিক উদ্যোগ ইঙ্গিত দেয় যে, ভারত এখনও চিনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। বিশেষ করে চিনা পণ্যের বড় ক্রেতা হিসেবে ভারতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই মুহূর্তে চিনই ইচ্ছাকৃতভাবে ভারতবিরোধী মনোভাব উস্কে দিচ্ছে, এমন ভাবার কারণ নেই। বরং এই মনোভাব অনেক ক্ষেত্রে ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী ধারণার গণ্ডি ছাড়িয়ে চিনা সরকারের বিদেশনীতিকেই প্রশ্নের মুখে এনে দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *