হিংসায় ‘জিরো টলারেন্স’, কড়া বার্তা দিলেন জ্ঞানেশ কুমার
দৈনিক সংবাদ অনলাইন ডেস্ক, ১০ মার্চঃ পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে হিংসা, এমনকী হিংসায় সামান্যতম উসকানি, হুমকি-ধমকি, প্ররোচনা কোনও কিছুই বরদাস্ত করবে না নির্বাচন কমিশন। ভোট হবে উৎসবের মেজাজে, মানুষ অবাধে হিংসামুক্ত এবং ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোট দেবেন। আর সে কাজে যারা বাধা দেবেন, দেওয়ার চেষ্টা করবেন, এমনকী যদি কোনও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার অসহযোগিতা করেন, তবে তাকেও কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তির মুখে পড়তে হবে। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের দুই দিনের পশ্চিমবঙ্গ সফর শেষে মঙ্গলবার দুপুরে কলকাতায় সাংবাদিক সম্মেলনে একেবারে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এ কথা বলে গেলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। এ রাজ্যের ভোটারদের উদ্দেশে বরাভয়ের সুরে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের রক্তাক্ত স্মৃতির পুনরাবৃত্তি রুখতে প্রশাসনিকভাবে যা যা পদক্ষেপ নেওয়ার, সবই নেবে কমিশন।’ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কাজে জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপার-স্তরের কোনও আমলার কাজে ‘সামান্যতম’ গাফিলতি ধরা পড়লে তাঁদের কেবল ‘বদলি’-ই নয়, প্রয়োজনে বিভাগীয় তদন্তেরও সম্মুখীন হতে হবে বলে জানিয়ে দেন সাম্প্রতিক অতীতে দেশের সবচেয়ে চর্চিত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। তিনি বলেন, ‘ভোটারদের উপর চাপ সৃষ্টি বা ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগ উঠলে কাউকে রেয়াত করা হবে না। এদিন নিউ টাউনের একটি পাঁচতারা হোটেলে সাংবাদিক সম্মেলনে জ্ঞানেশ কুমার মূলত তিনটি বার্তা দেন। এ রাজ্যে অবাধে এবং শান্তিপূর্ণ ভোট করানো, সংবিধান মেনে ন্যায়সঙ্গতভাবে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন তথা এসআইআরের কাজ শেষ করা, এবং এই সূত্রে উপযুক্ত একজনও ভোটারের নাম বাদ না যাওয়া, পাশাপাশি একজনও বেআইনি ভোটার তালিকায় থাকলে তাকে বাদ
দেওয়া। এসআইআর-পর্ব শেষে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন, তাতে ৭ কোটি ৮ লাখ ভোটারের নাম রয়েছে। চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনের সময় যে ভোটার তালিকা ছিল, তা থেকে মৃত, স্থানান্তরিত, ভুয়ো ইত্যাদি কারণে সরাসরি বাদ গেছে ৫৮ লক্ষের নাম। কমিশন জানিয়েছে, কোনও যোগ্য ভোটার এই সূত্রে বাদ পড়লে ৬ নম্বর ফর্ম পূরণ করে তিনি আবার নতুন করে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য আবেদন করতে পারেন। কিন্তু এর বাইরে রয়েছে ৬০ লক্ষ ৬ হাজার নাম, যারা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ‘বিচারকদের বিবেচনাধীন’ (পরিভাষায়, আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন) পর্যায়ে রয়েছেন। এদের কাছে নতুন করে নাম তোলার সুযোগও নেই। অর্থাৎ এই মুহূর্তে যে তালিকা কমিশনের সামনে রয়েছে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে ‘বৈধ’ ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৪৪ লক্ষ। বিশেষত সংখ্যালঘু মুসলিম অধ্যুষিত তিন জেলা মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং উত্তর দিনাজপুর, তার সঙ্গে দুই পরগনা মিলিয়ে যে ভোটারদের ২০০২ সালের সর্বশেষ এসআইআর তালিকার সঙ্গে তথ্যগ্রাহ্য সঙ্গতি পাওয়া যায়নি, সেই ষাট লক্ষাধিক মানুষকে ‘অ্যাডজুডিকেশন’ তালিকায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। এই ভোটারদের ভবিষ্যৎ কী, এদের বাদ দিয়েই কি পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন নির্বাচন হবে কি না- এই মুহূর্তে রাজনৈতিক মহলে এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে কমিশনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেছেন, বিচারাধীন থাকা সমস্ত ভোটারদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট স্থগিত করার পরিকল্পনা আছে নির্বাচন কমিশনের। এদিন স্বাভাবিকভাবেই জ্ঞানেশ কুমারকে এই প্রশ্নটি সামলাতে হয়। যদিও তিনি সরাসরি এ প্রশ্নের উত্তর দেননি। কোনও রাজনৈতিক নেতার নামও উল্লেখ করেননি। তিনি শুধু বলেন, ‘ভারত গণতান্ত্রিক দেশ। সকলের বাকস্বাধীনতা আছে। রাজনৈতিক দল কিছু বলতেই পারে। তা নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। আমরা রাজনৈতিক মন্তব্যের উত্তর দিই না, কারণ কমিশন সংবিধান মেনে কাজ করে।’ তিনি বলেন, ‘এসআইআরের মূল লক্ষ্য ত্রুটিমুক্ত, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা।’ পশ্চিমবঙ্গে কত দফায় ভোট হবে, কবে নাগাদ ভোটের দিনক্ষণ ঘোষিত হতে পারে, রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হতে পারে এমন জল্পনার কারণ কী, এসআইআর ‘আতঙ্কে’ রাজ্যে বহু মানুষের মৃত্যুর অভিযোগ, এসআইআরের ‘চাপে’ একাধিক বুথস্তরের অফিসার (বিএলও)-এর মৃত্যু, রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল তাকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ কেন আখ্যা দিয়েছে ইত্যাদি বিতর্কিত প্রশ্নেরও উত্তর দেননি তিনি। শুনেছেন, কিন্তু কৌশলে এড়িয়ে গেছেন।
বিচারাধীন অবস্থায় থাকা ষাট লক্ষাধিক ভোটারকে বাইরে রেখেই ৬ কোটি ৪০ লক্ষ নামের তালিকাকে চূড়ান্ত ধরে নিয়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কি না, সে প্রশ্নের উত্তরে জ্ঞানেশ কুমার বলেন, কলকাতা হাইকোর্টের মাননীয় প্রধান বিচারপতির নির্দেশমতো নিযুক্ত জেলা আদালত স্তরের বিচারকেরা বিচারাধীন ভোটারদের পেশ করা নথি খতিয়ে দেখার কাজ করছেন। সংবিধানের ৩৫৬ ধারা মেনে এই কাজ হচ্ছে। বিচারকরাই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তারা যেমন যেমন ভোটারদের নথিপত্র নিষ্পত্তি করবেন, তদনুযায়ী ‘সাপ্লিমেন্টারি’ (অতিরিক্ত) ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে। একদিকে যখন কলকাতায় জ্ঞানেশ কুমার সাংবাদিক বৈঠক করছেন, তখন অন্যদিকে দিল্লিতে সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর-সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে জানায়, ভোটার তালিকা সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালই নেবেন। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। গতকালই রাজ্য সরকারের হয়ে শীর্ষ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন আইনজীবী তথা তৃণমূলের রাজ্যসভার হবু সাংসদ মেনকা গুরুস্বামী। সেই আবেদনের ভিত্তিতে শুনানিতে এদিন সুপ্রিম কোর্টে প্রশ্নের মুখে পড়ে রাজ্য। কেন এ ধরনের আবেদন করা হলো, তা নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। রাজ্যের আইনজীবী মেনকার উদ্দেশে তিনি মন্তব্য করেন, ‘বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা কাজ করছেন। এসআইআরের তদারকিতে নিযুক্ত বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না!’ এই নির্দেশের অন্যথা হলে জরিমানা হতে পারে বলেও জানায় শীর্ষ আদালত। এদিনের শুনানিতে রাজ্যের তরফে মেনকা জানান, পশ্চিমবঙ্গে এখনও প্রায় ৫৭ লক্ষ ভোটারের তথ্য নিষ্পত্তি বাকি। প্রধান বিচারপতি উত্তরে জানান, কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল জানিয়েছেন ১০ লক্ষ ১৬ হাজার ভোটারের মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পাঁচশোর বেশি এবং ওড়িশা-ঝাড়খণ্ড থেকে দুইশো জন বিচারবিভাগীয় আধিকারিক এসআইআরের তদারকির কাজ করছেন। এদিন রাজ্যের আবেদনই ফিরিয়ে দেয় সুপ্রিম কোর্ট।